সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতিতে দুগ্ধ শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে গ্রামীণ পরিবারের আয় বৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। এখন সেই ক্ষেত্রেই নতুন লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। সমবায় ব্যবস্থাকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে ‘হোয়াইট রেভলিউশন ২.০ (White Revolution 2.0)’ উদ্যোগ, যার অন্যতম বড় লক্ষ্য হল দুগ্ধ সমবায় ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং এই খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি করা। সম্প্রতি সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় লিখিত উত্তরে এই প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সমবায় মন্ত্রী ‘অমিত শাহ (Amit Shah)’। তিনি জানিয়েছেন, ‘সমবায়-নেতৃত্বাধীন হোয়াইট রেভলিউশন ২.০ উদ্যোগের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দুগ্ধ সমবায়গুলির মাধ্যমে দুধ সংগ্রহের পরিমাণ ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করা।’ সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে যে পরিমাণ দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০৭ লক্ষ কিলোগ্রামে পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য পূরণের জন্য দু’টি প্রধান কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। প্রথমত, দুগ্ধ সমবায়ের আওতা নতুন নতুন এলাকায় সম্প্রসারণ করা হবে। দ্বিতীয়ত, যেখানে ইতিমধ্যেই সমবায় রয়েছে, সেখানে তাদের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করে পৌঁছনোর পরিধি বাড়ানো হবে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের এমন বহু গ্রাম ও পঞ্চায়েতকে দুগ্ধ সমবায় ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা হবে, যেখানে এখনও পর্যন্ত এই ধরনের সংগঠিত ব্যবস্থা পৌঁছয়নি। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার নতুন ও বিদ্যমান দুগ্ধ সমবায় সমিতি গঠন বা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার নতুন ‘ডেইরি কোঅপারেটিভ সোসাইটি (Dairy Cooperative Society বা DCS)’ গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে এমন সব এলাকায়, যেখানে এখনও সমবায় কাঠামো তৈরি হয়নি। পাশাপাশি প্রায় ৪৬,৪২২টি বিদ্যমান সমবায়কে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, যাতে কৃষকরা সহজে বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন এবং তাদের আয় বাড়ে।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দুধ সংগ্রহ এবং বিপণনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন অঞ্চলে ‘অটোমেটিক মিল্ক কালেকশন ইউনিট (Automatic Milk Collection Unit)’, ‘ডেটা প্রসেসিং মিল্ক কালেকশন ইউনিট (Data Processing Milk Collection Unit)’, দুধের গুণমান পরীক্ষা করার আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং ‘বাল্ক মিল্ক কুলার (Bulk Milk Cooler)’ স্থাপন করা হবে। এর ফলে গ্রামীণ অঞ্চলে দুধ সংগ্রহের প্রক্রিয়া আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ হবে। এছাড়াও নতুন ও বিদ্যমান দুধ পরিবহন রুট বা ‘মিল্ক রুট’ সম্প্রসারণ করা হবে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে নতুন রুট তৈরি করা হবে এবং যেখানে ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে সেই নেটওয়ার্ককে আরও বিস্তৃত করা হবে। সরকারের মতে, এর ফলে দূরবর্তী গ্রামগুলির দুগ্ধ উৎপাদকরাও সহজে সমবায় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন।
এই পুরো কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে ‘ন্যাশনাল ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম ২.০ (National Dairy Development Programme 2.0 বা NPDD 2.0)’ এর মাধ্যমে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ‘পশুপালন ও দুগ্ধ উন্নয়ন বিভাগ (Department of Animal Husbandry & Dairying)’। সরকার জানিয়েছে, নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুযায়ী এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে এবং ধাপে ধাপে সমবায় কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা হবে। সমালোচকদের মতে, এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নারীদের ভূমিকা। ভারতের দুগ্ধ খাতে নারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দুধ দোয়ানো, পশুকে খাওয়ানো, গরু বা মহিষের যত্ন নেওয়া এবং পশুর স্বাস্থ্য রক্ষা, এই সমস্ত কাজে গ্রামীণ নারীরা প্রতিদিন সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের দুগ্ধ খাতে মোট কর্মশক্তির প্রায় ৭০ শতাংশই নারী। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই অবদান যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি, কারণ দুগ্ধ খাতের বড় অংশই এখনও অসংগঠিত। এই পরিস্থিতি বদলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে নারী নেতৃত্বাধীন দুগ্ধ সমবায়। সরকার মনে করছে, যখন গ্রামীণ নারীরা সরাসরি সমবায় সমিতির সদস্য বা নেতৃত্বে থাকবেন, তখন তারা শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, সামাজিকভাবেও শক্তিশালী হবেন। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘হোয়াইট রেভলিউশন ২.০’ প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি অনাবৃত গ্রাম বা পঞ্চায়েতে ডেইরি কোঅপারেটিভ সোসাইটি গঠন করা হলে বিপুল সংখ্যক নারী দুগ্ধ উৎপাদক সংগঠিত খাতের সঙ্গে যুক্ত হবেন।
কৃষি অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। একদিকে যেমন দুগ্ধ উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে নারীদের হাতে সরাসরি আয় পৌঁছবে। পাশাপাশি দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সংসদে ‘অমিত শাহ (Amit Shah)’ বলেন, ‘সমবায় আন্দোলনের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দুগ্ধ খাতকে আরও শক্তিশালী করা এবং গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।’ তাঁর মতে, সমবায়ের মাধ্যমে কৃষক ও দুগ্ধ উৎপাদকদের বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা গেলে দেশের দুগ্ধ অর্থনীতি আরও মজবুত হবে। অভিজ্ঞ মহলের মতে, ‘হোয়াইট রেভলিউশন ২.০’ শুধু একটি কৃষি বা দুগ্ধ উন্নয়ন কর্মসূচি নয়, বরং এটি গ্রামীণ উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন এবং পুষ্টি নিরাপত্তার একটি বড় সামাজিক উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত



