সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কাঠমাণ্ডু : নেপালের সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত মিলল। ভোটগণনা শেষ হওয়ার পর পরিষ্কার হয়েছে যে তরুণ প্রজন্মের সমর্থনে দ্রুত উত্থান ঘটানো দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (Rastriya Swatantra Party বা RSP) বিপুল সাফল্যের মুখ দেখেছে। প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ১৬৫টির মধ্যে ১২৫টিতেই জয় পেয়েছে এই দল। ফলে নেপালের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে চলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। নেপালের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস (House of Representatives) -এর মোট ২৭৫টি আসনের জন্য এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ১৬৫টি আসনে প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়েছে, আর বাকি ১১০টি আসন নির্ধারিত হয় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতি (Proportional Representation বা PR System) অনুযায়ী।
নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে বলেন্দ্র শাহ (Balen Shah) -এর নেতৃত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। এই ১২৫টি আসনে জয়ের পাশাপাশি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থাতেও উল্লেখযোগ্য সাফল্যের সম্ভাবনা রয়েছে তাদের। ভোটের শতাংশের ভিত্তিতে অনুমান করা হচ্ছে যে পিআর পদ্ধতিতে আরও প্রায় ৫২টি আসন পেতে পারে দলটি। যদি সেই হিসাব বাস্তবে রূপ পায়, তাহলে সংসদে তাদের মোট আসনসংখ্যা ১৭৫-এর কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। কিন্তু, নেপালের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে আনুষ্ঠানিক এবং চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হতে এখনও কয়েক দিন সময় লাগবে। কারণ নেপালে এখনও ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ হয়, ফলে ভোট গণনার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ হয়। অন্যদিকে, ভোটের পরিসংখ্যান বলছে, রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি প্রায় ৫০ লক্ষের বেশি ভোট পেয়েছে। মোট প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে তাদের ভোটের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। নেপালের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দলগুলির তুলনায় এই ভোটের ব্যবধান অত্যন্ত বড়।
এই নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেস (Nepali Congress)। তারা প্রায় ১৭ লক্ষের বেশি ভোট পেয়েছে, যা মোট ভোটের প্রায় ১৬.২ শতাংশ। অন্যদিকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি (K. P. Sharma Oli) -এর দল সিপিএন-ইউএমএল (CPN-UML) পেয়েছে প্রায় ১৪ লক্ষের কিছু বেশি ভোট, যা প্রায় ১৩.৫ শতাংশ। আরেক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দহাল (Pushpa Kamal Dahal), যিনি ‘প্রচণ্ড’ নামেও পরিচিত, তাঁর দল নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি (Nepal Communist Party) পেয়েছে প্রায় ৭ লক্ষ ৭৭ হাজার ভোট। তাদের ভোটের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭.৪ শতাংশ। রাজতন্ত্রপন্থী রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি (Rastriya Prajatantra Party) এই নির্বাচনে খুব একটা ভাল ফল করতে পারেনি। প্রত্যক্ষ ভোটে তারা মাত্র একটি আসনে জয় পেয়েছে এবং তাদের ভোটের হার প্রায় ৩.১ শতাংশ। অন্যদিকে, নির্বাচনের শুরু থেকেই রাজনৈতিক মহলে জোরালো আলোচনা চলছিল যে নেপালের তরুণ ভোটারদের বড় অংশ রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির দিকে ঝুঁকছেন। গণনার প্রথম দিকের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সেই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা ঐতিহ্যবাহী দলগুলির প্রতি মানুষের অসন্তোষ এবং নতুন নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ এই নির্বাচনের ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে।বিশেষ করে বলেন্দ্র শাহ (Balen Shah) -এর জনপ্রিয়তা এই নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র হিসেবে তাঁর প্রশাসনিক কাজ এবং তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির পক্ষে বড় সমর্থন তৈরি করেছে।
নেপালের নির্বাচনের ফলাফলের সম্ভাব্য এই পরিবর্তন শুধু সে দেশের রাজনীতিতেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরিমণ্ডলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এদিকে ভোট গণনার প্রাথমিক ফল সামনে আসার পরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানান। সোমবার টেলিফোনে তিনি কথা বলেন দলের চেয়ারম্যান রবি লামিছানে (Rabi Lamichhane) এবং প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী বলেন্দ্র শাহ (Balen Shah) -এর সঙ্গে। সমাজমাধ্যমে এই বিষয়ে বার্তা দিয়ে নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) লেখেন, ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির রবি লামিছানে এবং দলের নেতা বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে টেলিফোনে উষ্ণ কথোপকথন হয়েছে। নেপালের নির্বাচনে তাঁদের সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নেপালের নতুন সরকারের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে জানিয়েছি যে ভারত পারস্পরিক উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং মানুষের কল্যাণের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ পাশাপাশি তিনি আশা প্রকাশ করেন যে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে আগামী দিনে ভারত ও নেপালের সম্পর্ক আরও মজবুত হবে। উল্লেখ্য, ভারত ও নেপালের মধ্যে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তাই নেপালের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভবিষ্যতে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন দিক খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। নেপালের এই নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রভাব যে ক্রমশ বাড়ছে, সেটিও এই ফলাফলের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ‘জেন জ়ি’ ভোটারদের সমর্থনই রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ। ফলে নেপালের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এখন চূড়ান্ত ফল ঘোষণার অপেক্ষা, যার উপর নির্ভর করবে নতুন সরকার গঠনের সমীকরণ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Social Media Ban | সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ: নেপাল থেকে শুরু করে ইরান-চিন, আর কোন দেশ অতীতে ব্যান করেছিল সোশ্যাল মিডিয়া?




