সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়লেও ভোট প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ রাখার বার্তা দিল ভারতের নির্বাচন কমিশন। মঙ্গলবার কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠকে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) জানিয়ে দেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে অবাধ, শান্তিপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করাই নির্বাচন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য। ভোট প্রক্রিয়ায় কোনও ধরনের হিংসা বা ভয় দেখানো বরদাস্ত করা হবে না।’ কলকাতায় আয়োজিত এই সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী (Vivek Joshi) এবং সুখবীর সিংহ সান্ধু (Sukhbir Singh Sandhu)। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল (Manoj Agarwal)। আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ (West Bengal Assembly Election 2026) ঘিরে বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রস্তুতি, ভোটার তালিকার সংশোধন, বুথ ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন তাঁরা।
সাংবাদিক বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) বলেন, ‘ভোটের সঙ্গে যুক্ত কোনও কর্মী বা আধিকারিককে ভয় দেখানো বা হুমকি দেওয়া হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ ছাড়া অন্য কারও নির্দেশে কাজ করলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের সময় ভোটারদের প্রভাবিত করা বা আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেলে তৎক্ষণাৎ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ উল্লেখ্য যে, এবারের নির্বাচনে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে একাধিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) জানান, পশ্চিমবঙ্গে এবার ৮০ হাজারেরও বেশি ভোটগ্রহণ কেন্দ্র বা বুথ তৈরি করা হবে। প্রতিটি বুথে সর্বোচ্চ ১২০০ জন ভোটার রাখা হবে যাতে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সহজ এবং নিয়ন্ত্রিত থাকে। তিনি বলেন, ‘স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি বুথে ওয়েব কাস্টিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি ভোটারদের সুবিধার জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটার সহায়তা কেন্দ্র, পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং মোবাইল ফোন রাখার আলাদা জায়গা থাকবে।’
ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া বা এসআইআর (Special Intensive Revision বা SIR) চালু করেছে বলেও জানান তিনি। এই প্রসঙ্গে জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) বলেন, ‘ভোটার তালিকা স্বচ্ছ এবং নির্ভুল রাখতে এই সংশোধন প্রক্রিয়া করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল বৈধ ভোটারদের নাম তালিকায় রাখা এবং অবৈধ নামগুলি বাদ দেওয়া।’ ভোটার তালিকার তথ্যগত অসঙ্গতি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি ব্যাখ্যা দেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানান, এই সমস্যা শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, যে ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই সংশোধন প্রক্রিয়া হয়েছে, সেখানে একই ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। তিনি জানান, ‘এনুমারেশন ফর্ম জমা দেওয়ার পর দেখা গিয়েছে প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ ভোটার নিজেদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেননি। আমরা তাঁদের আনম্যাপড হিসেবে চিহ্নিত করেছি। এছাড়া প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশ ভোটার নিজেদের তথ্য মিলিয়ে নিলেও কিছু ত্রুটি থেকে গিয়েছে।’ এই ধরনের তথ্যগত সমস্যার কারণে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের শুনানির জন্য ডাকা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ভোটার তালিকা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিবেচনাধীন ভোটারদের প্রশ্ন। প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটার এই মুহূর্তে বিবেচনাধীন অবস্থায় রয়েছেন। তাঁরা ভোট দিতে পারবেন কি না, সেই বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি নির্বাচন কমিশন। জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) বলেন, ‘এই ভোটারদের নথি আদালত নিযুক্ত বিচারক ও বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা পরীক্ষা করে দেখছেন।’ তিনি জানান, ইতিমধ্যেই কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court) -এর প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টকে (Supreme Court of India) জানিয়েছেন যে ১০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। তবে বাকি প্রায় ৫০ লক্ষ ভোটারের বিষয়টি এখনও বিচারাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনে কত দফায় ভোট হবে, সেই প্রশ্নও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এ বিষয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভোটের দফা নিয়ে তাদের মতামত জানিয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। দিল্লিতে ফিরে কমিশন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’ প্রসঙ্গত, রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস (All India Trinamool Congress) -এর পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে যে রাজনৈতিক মন্তব্য করা হয়েছে, সেই প্রসঙ্গেও প্রশ্ন ওঠে সাংবাদিক বৈঠকে। তবে সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar)। তিনি বলেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে সকলের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলি তাদের বক্তব্য রাখতেই পারে। নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক মন্তব্যের উত্তর দেয় না।’
নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইভিএম ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও কিছু নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, ‘যদি ভিভিপ্যাট এবং ইভিএমের তথ্যের মধ্যে কোনও গরমিল দেখা যায়, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি পুনরায় পরীক্ষা করা হবে এবং তা কাউন্টিং এজেন্টদের সামনেই করা হবে।’ ভোটের দিন ভোটের হার সম্পর্কেও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কমিশনের অ্যাপ এবং ওয়েবসাইটে প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর ভোটদানের হার প্রকাশ করা হবে বলেও তিনি জানান। এছাড়াও নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সাত দিনের মধ্যে কোনও প্রার্থী চাইলে ইভিএম পরীক্ষা করার আবেদন করতে পারবেন। এদিন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) স্পষ্টভাবে জানান, ‘অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করাতে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কোনও ধরনের কারচুপি, ভয় দেখানো বা প্রশাসনিক অপব্যবহার বরদাস্ত করা হবে না।’ এই ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে, কারণ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে ২০২৬ (West Bengal Assembly Election 2026) ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। নির্বাচন কমিশনের এই কঠোর অবস্থান আগামী দিনে ভোট প্রক্রিয়াকে কতটা প্রভাবিত করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Gyanesh Kumar election commission | পশ্চিমবঙ্গে ভোট এক বা দুই দফায় করার দাবি সব দলের, নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে তৃণমূলের তোপ




