তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে ইরানের রাজপরিবারের নাম উচ্চারিত হলেই যে নারীর কথা অনিবার্যভাবে উঠে আসে, তিনি হলেন ফারাহ পাহলভী (Farah Pahlavi)। আধুনিক ইরানের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র নারী যাঁকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘সম্রাজ্ঞী’ বা ‘শাহবানু’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রায় ছয় দশক আগে তাঁর মাথায় উঠেছিল রাজমুকুট। অথচ আজ তিনি নির্বাসিত জীবনে কাটাচ্ছেন দীর্ঘ সময়। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আলোচনার মধ্যে আবারও সামনে এসেছে ইরানের রাজপরিবারের অতীত, বিশেষ করে শেষ সম্রাজ্ঞী ফারাহ পাহলভীর জীবনকাহিনি। ১৯৬৭ সালে ইরানের শেষ শাহ মহম্মদ রেজা পাহলভী (Mohammad Reza Pahlavi) আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর তৃতীয় স্ত্রী ফারাহ দিবাকে সম্রাজ্ঞীর মর্যাদা দেন। সেই সময় ফরাহর বয়স ছিল মাত্র ২৯ বছর। ইরানের ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম ঘটনা যখন কোনও রাজার স্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজমুকুট পরিয়ে ‘শাহবানু’ ঘোষণা করা হয়। শুধু রাজমর্যাদাই নয়, তাঁকে দেওয়া হয়েছিল একটি বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতাও। রাজপুত্র প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই যদি সিংহাসনের শূন্যতা তৈরি হয়, তাহলে দেশের শাসনভার সামলানোর অধিকার থাকত ফারাহ -এর।

ফারাহ পাহলভীর জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৪ অক্টোবর তেহরানে এক শিক্ষিত ও অভিজাত পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তেহরানের একাধিক খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি দেন ফ্রান্সে। প্যারিসে তিনি স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। সেই সময়ই তাঁর জীবনে ঘটে এক নাটকীয় পরিবর্তন। ১৯৫৯ সালে প্যারিসে ইরানি শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় শাহ মহম্মদ রেজা পাহলভীর। সেই পরিচয় দ্রুতই ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়। একই বছরের ২১ ডিসেম্বর তাঁদের রাজকীয় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। তখন ফারাহর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। এই বিবাহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। বিয়ের পর শাহ তাঁর নববধূকে উপহার দেন একটি বিখ্যাত হিরেখচিত মুকুট, ‘নূর-উল-আইন’ (Noor-ul-Ain)। প্রায় দুই কেজি ওজনের সেই রাজমুকুটে বসানো ছিল গোলকোন্ডা (Golconda) -এর খনি থেকে পাওয়া প্রায় ৬০ ক্যারেটের গোলাপি হিরে। রাজপরিবারের ঐশ্বর্য এবং ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে এই মুকুট। পরে ১৯৬৭ সালে ফরাহর আনুষ্ঠানিক রাজ্যাভিষেকের জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয় আরও একটি সমৃদ্ধ মুকুট, যাতে বসানো হয়েছিল প্রায় ১৪৬৯টি হিরে।
সম্রাজ্ঞী হিসেবে ফারাহ শুধু রাজপ্রাসাদের আড়ম্বরেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি সক্রিয় ভূমিকা নেন ইরানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আধুনিকীকরণে। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় তেহরান মিউজিয়াম অফ কনটেম্পোরারি আর্ট (Tehran Museum of Contemporary Art)। এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রখ্যাত শিল্পীর কাজ সংগ্রহ করেছিলেন। পাবলো পিকাসো (Pablo Picasso) এবং অ্যান্ডি ওয়ারহল (Andy Warhol) -এর মতো শিল্পীদের কাজ সেই সংগ্রহের অংশ ছিল। সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রেও ফরাহ ছিলেন সক্রিয়। নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের মতো বিষয়গুলিকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, তাঁর প্রভাবেই ইরানে নারীরা আরও স্বাধীন ভাবে সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল। সেই সময় ইরানের তরুণীরা তুলনামূলক ভাবে মুক্ত জীবনযাপন করতেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় আলাদা ছিল। ফরাহর সৌন্দর্য এবং ব্যক্তিত্ব আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচিত ছিল। বহু বিদেশি সংবাদমাধ্যম তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি জ্যাকলিন কেনেডি (Jacqueline Kennedy) -এর সঙ্গে তুলনা করত। আধুনিক ফ্যাশন সচেতনতা এবং মার্জিত উপস্থিতির জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সমাজে একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন।
কিন্তু এই রাজকীয় জীবনের ইতি ঘটে ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইরানি বিপ্লবের সময়। সেই সময় ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লাহ খোমেইনি (Ayatollah Khomeini) -এর নেতৃত্বে রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানে পাহলভী রাজবংশের পতন ঘটে এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক রিপাবলিক। এই বিপ্লবের পরে শাহ মহম্মদ রেজা পাহলভী ও তাঁর পরিবার প্রাণ বাঁচাতে ইরান ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। তাঁদের নির্বাসিত জীবনের শুরু হয়। প্রথমে তাঁরা আশ্রয় নেন মিশর, পরে মরক্কো, বাহামা, মেক্সিকো এবং পানামাসহ একাধিক দেশে। ১৯৮০ সালে মিশরে মৃত্যু হয় শাহ রেজা পহলভীর। সেই সময় থেকেই ফারাহ প্রায় নির্বাসিত রাজবিধবার জীবন কাটাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি অধিকাংশ সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। বয়স আশির কোঠা পার করলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখনও নিয়মিত মতামত দেন। ফারাহ ও শাহের চার সন্তানের জীবনও ছিল নাটকীয় উত্থান-পতনে ভরা। তাঁদের জ্যেষ্ঠ পুত্র রেজা পাহলভী (Reza Pahlavi) বর্তমানে পাহলভী পরিবারের প্রধান হিসেবে পরিচিত এবং যুক্তরাষ্ট্রেই বসবাস করছেন। অন্যদিকে তাঁদের কনিষ্ঠ পুত্র আলি রেজা পাহলভী (Ali Reza Pahlavi) ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আত্মহত্যা করেন। কনিষ্ঠ কন্যা লায়লা পাহলভী (Leila Pahlavi) ২০০১ সালে লন্ডনে অকালমৃত্যুর শিকার হন।
এই ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি সত্ত্বেও ফারাহ পাহলভী এখনও ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সক্রিয়ভাবে মত প্রকাশ করেন। তিনি প্রায়ই বলেন, ‘ইরানের মানুষ একদিন স্বাধীন এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়বে।’ বহু আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এখনও তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়। উল্লেখ্য, এক সময় যিনি ছিলেন ইরানের রাজমুকুটধারী সম্রাজ্ঞী, এখন তিনি ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। রাজপ্রাসাদের আভিজাত্য থেকে নির্বাসনের দীর্ঘ পথ ফরাহ পহলভীর জীবন যেন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং পরিবর্তনের একটি জীবন্ত কাহিনি!
ছবি : সংগৃহীত




