সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই রাজ্যে এসে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করল নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) -এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই একমত হয়ে জানায়, রাজ্যে ভোট এক দফায়, না হলে সর্বোচ্চ দুই দফার মধ্যেই সম্পন্ন করা হোক। পাশাপাশি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতা করার আশ্বাসও দিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তবে বৈঠকের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া, যা নিয়ে সরব হয় তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) ও সিপিএম (Communist Party of India Marxist)। নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিরা রবিবার রাতেই কলকাতায় পৌঁছন। সোমবার সকালে রাজারহাটের একটি হোটেলে রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দলের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরা। বিজেপি (Bharatiya Janata Party) -এর তরফে ছিলেন শিশির বাজোরিয়া (Shishir Bajoria), জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় (Jagannath Chattopadhyay) এবং তাপস রায় (Tapas Roy)। বৈঠকে তাঁরা নির্বাচন সংক্রান্ত মোট ১৬ দফা দাবি কমিশনের কাছে তুলে ধরেন। সেই দাবির অন্যতম ছিল রাজ্যে কম সময়ের ব্যবধানে ভোট আয়োজন করা, যাতে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উত্তেজনা এড়ানো যায়।
বিজেপির প্রতিনিধিরা আরও দাবি করেন, কেন্দ্রীয় বাহিনীর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং ভোটগ্রহণ কেন্দ্রগুলিতে নজরদারির জন্য পর্যাপ্ত ক্যামেরা বসাতে হবে। তাঁদের মতে, এই ধরনের ব্যবস্থাই ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং ভোট প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করবে। বৈঠকের পরে তাপস রায় মন্তব্য করেন, ‘জ্ঞানেশ কুমারের আঙুল কাটার হুমকি মানে আসলে সংবিধানের মর্যাদার উপর আঘাত। আমরা চাই পশ্চিমবঙ্গে হিংসামুক্ত ও ভয়মুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।’ উল্লেখ্য, সম্প্রতি তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee)-এর একটি মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিজেপি দাবি করেছে, ওই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার যেন এফআইআর দায়ের করেন। তবে বিজেপির পক্ষ থেকে এসআইআর প্রসঙ্গটি বৈঠকে তোলা হয়নি। তাঁদের বক্তব্য, বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন। তাই আদালত যা সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়া হবে। বিজেপির প্রতিনিধিরা জানান, সেই কারণেই কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় তাঁরা মূলত ভোট আয়োজনের বিষয়েই গুরুত্ব দিয়েছেন।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা বৈঠকে এসআইআর প্রসঙ্গটি বারবার উত্থাপন করেন। তৃণমূলের তরফে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (Chandrima Bhattacharya), ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim) এবং রাজীব কুমার (Rajib Kumar)। বৈঠক শেষে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন, ‘এসআইআর নিয়ে আমরা যখনই কথা বলতে চাইছি, তখনই বলা হচ্ছে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে রয়েছে। কিন্তু আমাদের ডাকা হয়েছে যখন, তখন আমাদের বক্তব্য তো শুনতেই হবে।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন যে বৈঠকের সময় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের আচরণে তিনি অসন্তুষ্ট। তাঁর কথায়, ‘আমি যখন প্রশ্ন তুলেছি, তখন আমাকে বলা হয়েছে চিৎকার করবেন না। একজন মহিলা হিসেবে এই ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত অসম্মানজনক। মহিলাদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো উচিত।’ ফিরহাদ হাকিমও এসআইআর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই প্রক্রিয়ার ফলে বহু সাধারণ মানুষ সমস্যার মুখে পড়ছেন। তাঁর দাবি, ‘বিজেপি এমন একটা ধারণা তৈরি করেছে যে পশ্চিমবঙ্গ যেন অনুপ্রবেশকারীদের জায়গা। কিন্তু এতদিনের এসআইআর প্রক্রিয়ায় তার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে বহু মানুষকে কাজ ফেলে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের একটাই অনুরোধ, কোনও ভারতীয় নাগরিক যেন বঞ্চিত না হন।’
বৈঠকে কংগ্রেস (Indian National Congress)-এর প্রতিনিধিদলে ছিলেন প্রবীণ নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য (Pradip Bhattacharya) এবং আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় (Ashutosh Chattopadhyay)। তাঁদের বক্তব্য, সম্ভব হলে এক দফাতেই ভোট হলে সবচেয়ে ভালো হয়। তবে ভোটের দফা সংখ্যা তাঁদের কাছে মুখ্য নয়; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা। নির্বাচন কমিশন পরে একটি বিবৃতি দিয়ে জানায়, এই বৈঠকে তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেস ছাড়াও ফরোয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc), আম আদমি পার্টি (Aam Aadmi Party) এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (National People’s Party)-এর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। প্রতিটি দলই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার ব্যাপারে কমিশনকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। কমিশনের তরফেও জানানো হয়েছে, নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের এই ফুল বেঞ্চ দুই দিনের সফরে পশ্চিমবঙ্গে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি প্রশাসনের সঙ্গেও তাঁদের আলোচনায় বসার কথা রয়েছে। মঙ্গলবার রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী (Nandini Chakraborty)-এর সঙ্গে কমিশনের বৈঠক হওয়ার কথা। এর আগে সোমবার সকালে বৈঠক শুরুর আগে কালীঘাট মন্দিরে (Kalighat Temple) পুজো দিতে যান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। সেখানে তাঁকে ঘিরে কিছু বিক্ষোভও দেখা যায়। বিক্ষোভকারীরা কালো পতাকা দেখিয়ে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেন। এমনকি কলকাতা বিমানবন্দর (Netaji Subhas Chandra Bose International Airport) থেকে নিউ টাউনের হোটেলে যাওয়ার পথেও বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। ফলে নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ যে ইতিমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : MS Dhoni Praises Gautam Gambhir After India’s T20 World Cup Win, Rohit Sharma and Virat Kohli Congratulate Team | বিশ্বকাপ জয়ের পর গম্ভীরকে বার্তা ধোনির, অভিনন্দন রোহিত ও কোহলির




