সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: পশ্চিম এশিয়ায় সংঘর্ষ তীব্রতর হওয়ার পর হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) তেলবাহী জাহাজ চলাচলে ইরানের বিধিনিষেধ ঘিরে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ বাড়লেও ভারতের বাজারে আপাতত জ্বালানি সরবরাহে কোনও ঘাটতি হবে না বলে জানাল কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর নেতৃত্বাধীন সরকার মঙ্গলবার দাবি করেছে, দেশে পর্যাপ্ত পেট্রোল ও ডিজেলের মজুত রয়েছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন প্রস্তুত। দেশের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী (Hardeep Singh Puri) বলেন, ‘পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে। পরিস্থিতির মোকাবিলায় ভারত পুরোপুরি প্রস্তুত।’ তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জ্বালানি সরবরাহ ও মজুতের অবস্থার উপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ‘দেশ জুড়ে পেট্রোলিয়াম পণ্যের সরবরাহ ও মজুতের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য ২৪ ঘণ্টার সক্রিয় কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে। ভারতীয় উপভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা আমাদের অগ্রাধিকার,’ বলেন মন্ত্রী।
সম্প্রতি ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States) ও ইজরায়েল (Israel)-এর হামলা এবং তেহরানের পাল্টা আক্রমণে পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সংঘর্ষের চতুর্থ দিনে ইরান ঘোষণা করে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে। যদিও রাশিয়া (Russia) ও চিন (China) -এর জাহাজকে ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর। এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দেয়। উল্লেখ্য, ভারতের মোট পেট্রোলিয়াম আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ পরিস্থিতি তৈরি হলে চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে প্রায় ২৫ দিনের পেট্রোল ও ডিজেলের মজুত রয়েছে। প্রয়োজন হলে বিকল্প উৎস ও রুট ব্যবহার করে আমদানি চালু রাখা হবে। হরদীপ জানান, ‘ক্রমাগত পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ভারত বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক, চতুর্থ বৃহত্তম রিফাইনার এবং পঞ্চম বৃহত্তম পেট্রোপণ্য রফতানিকারক দেশ। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক সূত্রে খবর, ভারতীয় জ্বালানি সংস্থাগুলি এখন এমন উৎস থেকে আমদানিতে জোর দিচ্ছে, যা হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরশীল নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও আফ্রিকা, আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনে ঘুরপথে জাহাজ পাঠানোর প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। যদিও এতে পরিবহণ ব্যয় বাড়তে পারে, তবু বাজারে ঘাটতি রোধ করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। প্রসঙ্গত, হরমুজ প্রণালী ও বাব এল-মানদেব (Bab-el-Mandeb) প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। পশ্চিম এশিয়া ছাড়াও আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গে ভারতের পণ্যবাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই রুট দিয়ে সম্পন্ন হয়। এই পথ আংশিকভাবে বন্ধ বা সীমিত হলে পরিবহণ সময় ও খরচ দুই-ই বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও কৃষি রফতানির ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে। ইরান ভারতীয় বাসমতী চালের অন্যতম বড় ক্রেতা; সৌদি আরব (Saudi Arabia) প্রথম স্থানে। হরমুজ প্রণালীতে বিধিনিষেধের জেরে জাহাজ চলাচলে জটিলতা তৈরি হলে চাল রফতানিতে বিলম্ব বা ব্যয় বৃদ্ধি ঘটতে পারে বলে রফতানিকারক মহলে আলোচনা চলছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে ওঠানামা শুরু হলেও ভারত সরকার আপাতত অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যবৃদ্ধি রোধে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সরকারি তেল বিপণন সংস্থাগুলির সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক চলছে। প্রয়োজনে কৌশলগত তেল ভাণ্ডার ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলির উপর চাপ বাড়তে পারে। তবে ভারত গত কয়েক বছরে আমদানি উৎস বৈচিত্র্যকরণে জোর দিয়েছে। রাশিয়া-সহ একাধিক দেশের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বৃদ্ধির ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা স্থিতিস্থাপকতা এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্র। পাম্পে জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখতে রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গেও সমন্বয় রাখা হচ্ছে। পরিবহণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পক্ষেত্রে যাতে প্রভাব না পড়ে, সে দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, পশ্চিম এশিয়ার এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। তার প্রভাব জ্বালানি বাজারে পড়লেও ভারত আপাতত নিজেদের প্রস্তুতি ও মজুতের উপর ভরসা রাখছে। সরকারের দাবি, পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দেশের বাজারে পেট্রোল ও ডিজেলের সরবরাহ অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই প্রস্তুত রয়েছে।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : Narendra Modi, AI Conference Delhi, Bharat Mandapam | ‘দেশের সাফল্য সহ্য হচ্ছে না’ : এআই সামিট বিতর্কে কংগ্রেসকে কটাক্ষ মোদীর




