সাশ্রয় নিউজ ★ শিলিগুড়ি: একজন আদিবাসী অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে মারধরের অভিযোগ ঘিরে তীব্র উত্তেজনা ছড়াল শিলিগুড়িতে। অভিযোগ, এক সিভিক ভলান্টিয়রের আঘাতে গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার উত্তরকন্যা অভিযানে নামেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। পরিস্থিতি ক্রমে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। পুলিশ ব্যারিকেড টপকে এগোনোর চেষ্টা হলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়, পরে টিয়ার গ্যাসের সেল ফাটানো ও জলকামান ব্যবহার করতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। মাইকিং করে বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়।।পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, জমি দখল সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। গত ২৩ ডিসেম্বর ফাঁসিদেওয়া এলাকায় একটি জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বচসা ও অশান্তি হয়। সেই সময় এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। পরিবারের দাবি, ওই হামলার পরই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং পরবর্তীতে গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু হয়। ঘটনায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়।
অভিযুক্ত হিসেবে নাম উঠে আসে মহম্মদ কাদের (Mohammad Kader) নামে এক সিভিক ভলান্টিয়রের। গত ৯ জানুয়ারি তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে এখনও চারজন অভিযুক্ত অধরা বলে জানা গিয়েছে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই। দোষীদের কঠোর শাস্তি হোক।’ এই দাবিতেই উত্তরকন্যা অভিযানের ডাক দেওয়া হয়।বৃহস্পতিবার দুপুরে শিলিগুড়ির তিনবাত্তি মোড় সংলগ্ন এলাকায় জমায়েত হতে থাকেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের দাবি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। বিজেপিও এই আন্দোলনে সমর্থন জানায় বলে স্থানীয় সূত্রের খবর। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি হওয়ায় পুলিশও আগাম প্রস্তুতি নেয়। বিশাল পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়, একাধিক ব্যারিকেড বসানো হয় এবং জলকামান-টিয়ার গ্যাস প্রস্তুত রাখা হয়।
বিক্ষোভকারীরা মিছিল করে উত্তরকন্যার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। অভিযোগ, কিছু অংশগ্রহণকারী রাস্তায় আগুন জ্বালান। ব্যারিকেডের কাছে পৌঁছলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার গ্যাসের সেল ফাটানো হয় এবং জলকামান ব্যবহার করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘হঠাৎই ঠেলাঠেলি শুরু হয়, তারপর ধোঁয়া আর জলকামান, এ নিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়।’ পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, অনুমতি ছাড়া ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা হওয়ায় বাধ্য হয়ে শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছে। এক কর্তা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা আমাদের দায়িত্ব। পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সে জন্যই পদক্ষেপ।’ ঘটনায় কয়েকজন বিক্ষোভকারী ও পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। তাঁদের স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, উত্তরকন্যা, যা উত্তরবঙ্গের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, সেখানে এভাবে বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বিরল নয়। তবে অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে মারধরের অভিযোগ এবং গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যুর দাবি বিষয়টিকে সংবেদনশীল করে তুলেছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানাতে এসেছিলাম। বাধা দেওয়ায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।’
এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটির তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে মূল অভিযুক্ত গ্রেফতার হয়েছে এবং বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। বিরোধী শিবিরের এক নেতা বলেন, ‘ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চাই। দোষীদের শাস্তি না হলে আন্দোলন চলবে।’ শাসকদলের পক্ষ থেকে শান্ত থাকার আবেদন জানানো হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, আইন নিজের গতিতে চলবে। শিলিগুড়ির পরিস্থিতি সন্ধ্যার পর কিছুটা স্বাভাবিক হলেও এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। উত্তেজনা প্রশমিত করতে প্রশাসনের তরফে স্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া ছড়িয়েছে। অনেকেই দ্রুত বিচার ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তুলেছেন। আবার কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সামগ্রিকভাবে শিলিগুড়ির এই অশান্তি রাজ্য রাজনীতিতেও আলোড়ন ফেলেছে। পরিস্থিতি এখন কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করছে তদন্তের অগ্রগতি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের উপর। উত্তরকন্যা অভিযানের এই সংঘর্ষ যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ছবি : প্রতীকী।
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi Israel Visit, Netanyahu Hexagon Alliance | মোদীর ইজরায়েল সফরে ‘ষড়ভুজ’ জোটের প্রস্তাব : নেতানিয়াহুর আহ্বানে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন সমীকরণ?




