সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: কূটনৈতিক মহলে জোর জল্পনা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) আসন্ন ইজরায়েল সফর ভারত-ইজরায়েল প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় এক নতুন দিক উন্মোচন করতে চলেছে। আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি দু’দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ইজরায়েল যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে ইঙ্গিত, কৌশলগত অংশীদারিত্ব, উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সন্ত্রাসদমন এবং কৃষিক্ষেত্রে উদ্ভাবন এই চার স্তম্ভে ভর করেই দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। সরকারি সূত্রের দাবি, প্রায় ৬৮০ কোটি ইউরো, অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় আনুমানিক ৭২ থেকে ৭৩ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ক্রয় ও যৌথ উৎপাদন সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত-ইজরায়েল প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে। ২০১৯ সালের বালাকোট অভিযানে স্যাটেলাইট-নিয়ন্ত্রিত স্পাইস-২০০০ বোমার ব্যবহার আন্তর্জাতিক মহলে সাড়া ফেলেছিল। ‘স্পাইস-২০০০’ (SPICE-2000) ইলেকট্রো-অপটিক্যাল গাইডেড নির্ভুলতা-নির্ভর অস্ত্র হিসেবে ভারতীয় বায়ুসেনার সক্ষমতা নতুন মাত্রা দেয়। একই ভাবে নজরদারি ক্ষেত্রে ‘হেরন টিপি’ (Heron TP) ড্রোন এবং ‘ফ্যালকন’ (Phalcon AWACS) আকাশভিত্তিক সতর্কীকরণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভারতের প্রতিরক্ষা অবকাঠামোকে শক্তিশালী করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্ভরতা ক্রয়-বিক্রয়ে সীমাবদ্ধ নয়; প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উন্নয়ন এখন মূল লক্ষ্য।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু৷ -এর (Benjamin Netanyahu) উপস্থিতিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী উন্নত লেজার অস্ত্র, দূরপাল্লার ‘স্ট্যান্ড-অফ’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘আত্মঘাতী’ ড্রোনের যৌথ উৎপাদন নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। প্রতিরক্ষা মহলের এক কর্তার কথায়, ‘ভারত এখন কেবল ক্রেতা নয়, প্রযুক্তিগত অংশীদার হতে চাইছে। যৌথ উৎপাদন ও মেক ইন ইন্ডিয়া উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কাঠামো গড়ে তোলাই লক্ষ্য।’ উল্লেখ্য, ইজরায়েলের বহুল আলোচিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ (Iron Dome), ‘ডেভিড্স স্লিং’ (David’s Sling) এবং ‘অ্যারো’ (Arrow Missile Defense System) ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে কার্যকারিতার প্রমাণ দিয়েছে। বিশেষত ‘ডেভিড্স স্লিং’ মাঝারি পাল্লার এবং ‘অ্যারো-২’ ও ‘অ্যারো-৩’ দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম। প্রায় ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পাল্লা এবং স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরে শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার প্রযুক্তি এই ব্যবস্থাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ‘ভারতের নজর এখন বহুপর্দা বিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলায়, যেখানে দেশীয় ও ইজরায়েলি প্রযুক্তির সমন্বয় হতে পারে।’
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ৩০ কিলোওয়াট লেজার-ভিত্তিক ‘আয়রন বিম’ (Iron Beam) ব্যবস্থা। প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় এর ব্যবহার ব্যয় তুলনামূলক কম এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল। ড্রোন, রকেট বা স্বল্পপাল্লার হুমকি মোকাবিলায় এটি কার্যকর বলে মনে করা হয়। এক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের কথায়, ‘লেজার প্রযুক্তি ভবিষ্যতের যুদ্ধের চরিত্র বদলে দেবে। ভারত যদি এই প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার পায়, তা হলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় আমূল পরিবর্তন আসবে।’ এছাড়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সমৃদ্ধ ‘বারাক-৮’ (Barak-8) এমআর-এসএএম/এলআর-এসএএম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার উন্নত সংস্করণ এবং সাইবার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও চূড়ান্ত আলোচনা হতে পারে। ভারতীয় নৌবাহিনী ও বায়ুসেনায় ‘বারাক-৮’ -এর ব্যবহার ইতিমধ্যেই রয়েছে। উন্নত সংস্করণে লক্ষ্যবস্তু সনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা। অতীতে ‘হারপ’ (IAI Harop) কিলার ড্রোন, ‘স্পাইডার’ (SPYDER) কুইক রিঅ্যাকশন বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘পাইথন’ (Python Missile) ও ‘ডার্বি’ (Derby Missile) ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সফল প্রয়োগ ভারতীয় বাহিনী করেছে। এই ধারাবাহিকতায় নতুন প্রজন্মের স্ট্যান্ড-অফ এয়ার-টু-সারফেস মিসাইল যুক্ত হলে শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা বলয়ের বাইরে থেকে নির্ভুল আঘাত হানা সম্ভব হবে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, এই সফর কেবল প্রতিরক্ষা চুক্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষি প্রযুক্তি, জল ব্যবস্থাপনা ও স্টার্ট-আপ উদ্ভাবনে দুই দেশের অংশীদারিত্ব আরও বিস্তৃত হতে পারে। সন্ত্রাসবিরোধী তথ্য আদানপ্রদান ও সাইবার নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও সমন্বয় জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। একজন কূটনীতিকের বক্তব্য, ‘ভারত-ইজরায়েল সম্পর্ক এখন কৌশলগত গভীরতায় পৌঁছেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে এই অংশীদারিত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।’ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা হবে সাম্প্রতিক কালের অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা সমঝোতা। এতে ভারতীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণেও এর প্রভাব পড়বে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইজরায়েল সফর ভারত-ইজরায়েল কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। উন্নত লেজার অস্ত্র, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়নের সম্ভাবনা, এই সমস্ত মিলিয়ে এই সফর দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক বাঁকবদল হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi and PM Benjamin Netanyahu discuss strategic partnership | ভারত-ইসরায়েল কূটনীতিতে নতুন গতি: নরেন্দ্র মোদী–নেতানিয়াহুর আলোচনায় জোর সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ও শান্তিপ্রক্রিয়ায় সমর্থন




