সাশ্রয় নিউজ ★ উত্তর চব্বিশ পরগণা : উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহর শ্মশানে সোমবার সন্ধ্যায় সম্পন্ন হল রাজনীতিক মুকুল রায় (Mukul Roy) -এর শেষকৃত্য। কাঠের চুল্লিতে শেষ বিদায় জানানো হল একদা ‘বঙ্গ রাজনীতির চাণক্য’কে। বিকেল থেকে সন্ধ্যা প্রায় আট কিলোমিটার পথজুড়ে অগণিত মানুষের ভিড়ে মুখর ছিল কাঁচরাপাড়া থেকে হালিশহর পর্যন্ত রাস্তা। পদযাত্রায় শ্মশান পর্যন্ত হেঁটে যান তৃণমূল কংগ্রেসের (All India Trinamool Congress) সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। পাশে ছিলেন মুকুল-পুত্র শুভ্রাংশু রায় (Subhrangshu Roy)। সন্ধ্যা সওয়া সাতটা নাগাদ সম্পূর্ণ হয় শেষকৃত্য বলে উল্লেখ।

উল্লেখ্য, রবিবার গভীর রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুকুল রায়। দীর্ঘ দিন ধরেই একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন ৭১ বছর বয়সী এই নেতা। মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই কাঁচরাপাড়ার বাসভবন ‘যুগল ভবন’ -এর সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন দলীয় কর্মী-সমর্থক থেকে সাধারণ মানুষ। সোমবার প্রথমে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। উপস্থিত ছিলেন বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় (Biman Banerjee), মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim), শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় (Shovandeb Chattopadhyay), সুজিত বসু (Sujit Bose) প্রমুখ। বিজেপির (Bharatiya Janata Party) বিধায়কেরাও শ্রদ্ধা জানান। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) শোকবার্তা পাঠান। রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে একই ছাদের তলায় দাঁড়িয়ে প্রবীণ এই নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান সকলেই।
বিধানসভা থেকে তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় কাঁচরাপাড়ার ‘যুগল ভবন’-এ। বাড়ির বাইরে কিছুক্ষণ শায়িত ছিল দেহ। স্থানীয় বাসিন্দা, পুরনো সহকর্মী এবং অনুগামীরা একে একে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তিনি সমবেদনা জানান। রাজনৈতিক সূত্রে খবর, শেষযাত্রার সময়ও পরিবারের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেন তৃণমূলের এই শীর্ষ নেতা। ‘যুগল ভবন’ থেকে শুরু হয় পদযাত্রা। প্রায় আট কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে দেহ নিয়ে যাওয়া হয় হালিশহর শ্মশানে। রাস্তাজুড়ে ছিল নীরব শোকমিছিল। কেউ ফুল ছুঁড়েছেন, কেউ হাত জোড় করে প্রণাম জানিয়েছেন। ছিলেন শুভ্রাংশু রায়, তাঁর পাশে ছিলেন অভিষেক। রাজনৈতিক কর্মী থেকে সাধারণ মানুষ, শেষযাত্রায় অংশ নেন বহু মানুষ। শেষকৃত্যের সময় উপস্থিত ছিলেন পানিহাটির বিধায়ক তথা বিধানসভার মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষ (Nirmal Ghosh), নৈহাটির বিধায়ক সনৎ দে (Sanat Dey), চিকিৎসক-নেতা নির্মল মাঝি (Nirmal Maji), কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা (Shiuli Saha), ব্যারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিক (Partha Bhowmick) সহ অনেকেই। শ্মশান প্রাঙ্গণে ছিল কড়া নিরাপত্তা। সন্ধ্যা সওয়া সাতটার কিছু পরে কাঠের চুল্লিতে দাহক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
মুকুল রায়ের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তিনি লিখেছেন, ‘ওঁর সহসা প্রয়াণের সংবাদে বিচলিত ও মর্মাহত বোধ করছি। তিনি আমার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহকর্মী এবং বহু সংগ্রামের সহযোদ্ধা ছিলেন।’ একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করেছেন তৃণমূলের প্রতিষ্ঠালগ্নে তাঁর অবদান। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘দলের জন্মলগ্ন থেকে সংগঠন গঠনে তিনি প্রাণপাত করেছেন। পরে ভিন্ন পথে গেলেও আবার ফিরে এসেছিলেন।’ উল্লেখ্য, তৃণমূলের শুরুর দিন থেকে মমতার অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন মুকুল। ১৯৯৭ সালে তৃণমূল গঠনের সময় তিনি ছিলেন প্রথম সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। সংগঠন বিস্তারে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক মতভেদের জেরে ২০১৭ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। সেই সিদ্ধান্তকে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর শোকবার্তায় ‘ভিন্ন পথে’ যাওয়া বলে উল্লেখ করেছেন।
বিজেপিতে যোগ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সংগঠন মজবুত করতে কাজ করেন মুকুল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির উত্থানের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। তবে ফল ঘোষণার পরের মাসেই আবার তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন করেন। তৃণমূল ভবনে দলীয় পতাকা হাতে তাঁকে ‘ঘরের ছেলে’ বলে স্বাগত জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই অনুষ্ঠানে অভিষেকও উপস্থিত ছিলেন। তবে শেষ কয়েক বছরে শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে দেয়। বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। এক সময় কোমায়ও চলে যান। শেষ জীবনে ঘরবন্দী অবস্থাতেই অধিকাংশ সময় কাটছিল তাঁর। তবু রাজনৈতিক স্মৃতিতে তিনি থেকে যাবেন সংগঠনের কুশলী রণকৌশলী হিসেবেই। রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও তাঁর প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছে তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেস সহ একাধিক দল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মুকুল রায়ের জীবন ছিল উত্থান-পতন, দলবদল ও প্রত্যাবর্তনের এক নাটকীয় অধ্যায়। তবে শেষযাত্রায় যে ভিড় ও আবেগ দেখা গেল, তা প্রমাণ করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক প্রভাব, দুই-ই গভীর ছিল। হালিশহরের চিতায় শেষ হল এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়। ‘ভিন্ন পথে গিয়ে আবার ফিরেও আসেন’ এই বাক্য যেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সারমর্ম হয়ে রইল। উত্তর ২৪ পরগনার আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে উঠতে বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাসে যুক্ত হল আর একটি নাম, মুকুল রায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mukul Roy Demise Mamata Banerjee Reaction | বঙ্গ রাজনীতির ‘চাণক্য’ মুকুল রায় আর নেই, শোকস্তব্ধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়




