Ladakh soldier death, Murshidabad jawan Monirul Islam | লাদাখের হিমশীতল প্রহরে প্রাণ দিলেন মুর্শিদাবাদের জওয়ান মনিরুল ইসলাম, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানাতে উপচে পড়ল জনস্রোত

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুর্শিদাবাদ : লাদাখের তীব্র শৈত্যপ্রবাহে সীমান্তে কর্তব্যরত অবস্থায় প্রয়াত হলেন মুর্শিদাবাদের (Murshidabad) রানিনগরের (Raninagar) বাসিন্দা জওয়ান মনিরুল ইসলাম (Monirul Islam)। দেশের সুরক্ষায় প্রহর গুনতে গুনতেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। রবিবার সকালে ভারতীয় সেনার বিশেষ কনভয়ে তাঁর মরদেহ গ্রামে পৌঁছতেই আবেগে ভেঙে পড়ে গোটা এলাকা। শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় নেমে আসে হাজারো মানুষ। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গান স্যালুটের মাধ্যমে তাঁকে শেষ বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নেয় প্রশাসন। সেনা সূত্রে খবর, গত শুক্রবার বিকেলে লাদাখে দায়িত্ব পালনকালে আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েন মনিরুল ইসলাম। তীব্র ঠাণ্ডা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। সহকর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিকটবর্তী সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো যায়নি। সেনা কর্তৃপক্ষের তরফে পরিবারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে মৃত্যুসংবাদ জানানো হয়।

আরও পড়ুন : India EU Free Trade Agreement, Narendra Modi Spain Finland Meeting : দিল্লিতে ইউরোপের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মোদীর বৈঠক

শুক্রবার সন্ধ্যায় রানিনগরের বাড়িতে যখন খবর পৌঁছয়, তখনই শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা পরিবারে। নিম্নবিত্ত পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন মনিরুল। তাঁর অকালপ্রয়াণে কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে স্ত্রী ও দুই নাবালক সন্তান। পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় চোখের জল সামলে বলেন, ‘ছোট ছোট ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ কী হবে? ওদের বাবা তো আর নেই, এখন কে দেখবে পরিবারটাকে?’ কথার মাঝেই যেন থেমে যায় গলা। রবিবার সকালে সেনাবাহিনীর বিশেষ গাড়িতে করে যখন মনিরুলের মরদেহ গ্রামে পৌঁছয়, তখন রাস্তার দু’ধারে কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। হাতে জাতীয় পতাকা, চোখে জল এই দৃশ্য যেন একসঙ্গে গর্ব ও বেদনার প্রতিচ্ছবি। সেনার জওয়ানরা শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে মরদেহ নামিয়ে জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিনটি পরিবারের হাতে তুলে দেন। চারদিকে তখন শোনা যাচ্ছিল ‘ভারত মাতা কি জয়’ ধ্বনি।

স্থানীয় প্রশাসনের আধিকারিকরা উপস্থিত থেকে পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। একজন প্রশাসনিক কর্তা বলেন, ‘দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া এই বীর সন্তানের পরিবার যাতে কোনওভাবে অসুবিধায় না পড়ে, সে বিষয়ে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’ পাশাপাশি জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও শেষযাত্রায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, মনিরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় সেনায় কর্মরত ছিলেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন দায়িত্বনিষ্ঠ ও সদালাপী মানুষ হিসেবে পরিচিত। সীমান্তে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ করা তাঁর কাছে ছিল গর্বের বিষয়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছুটিতে বাড়ি এলে গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খোঁজখবর নিতেন তিনি। দেশের সেবা করা তাঁর কাছে ছিল শুধু পেশা নয়, এক গভীর অঙ্গীকার।

লাদাখের আবহাওয়া বছরের অধিকাংশ সময়ই চরম প্রতিকূল থাকে। শূন্যের বহু নিচে নেমে যাওয়া তাপমাত্রা, অক্সিজেনের স্বল্পতা এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, সেখানে দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে কাজ করলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। সেনা সূত্রে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, মনিরুল হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েই প্রয়াত হয়েছেন।গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, ‘ও ছোটবেলা থেকেই সাহসী ছিল। দেশরক্ষার স্বপ্ন দেখত। আজ সে নেই, কিন্তু আমাদের কাছে সে চিরকাল বীর।’ তাঁর কথায় ধরা পড়ে একদিকে শোক, অন্যদিকে গর্বের সুর। উল্লেখ্য, শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ রানিনগরে ভিড় করেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত হয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গান স্যালুট দিয়ে মনিরুল ইসলামকে শেষ বিদায় জানানো হবে। জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন, আর উপস্থিত জনতা নীরবে শ্রদ্ধা জানান।

এই ঘটনার পর এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হলেও, একই সঙ্গে জেগে উঠেছে দেশপ্রেমের আবেগ। স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের ছাত্রছাত্রীরা আজ কাছ থেকে দেখল দেশের জন্য আত্মত্যাগ কাকে বলে। মনিরুল আমাদের প্রেরণা হয়ে থাকবে।’ মনিরুল ইসলামের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, গোটা জেলার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। দেশের সীমান্তে দাঁড়িয়ে যারা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তাঁদের ত্যাগের কথা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। কিন্তু এমন ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়, শান্তিতে ঘুমোনোর পেছনে কত অজানা সংগ্রাম লুকিয়ে থাকে। রানিনগরের আকাশে রবিবার বিকেলে যখন গান স্যালুটের শব্দ প্রতিধ্বনিত হবে, তখন তা শুধু এক বীর সন্তানের বিদায় নয়, বরং দেশের প্রতি তাঁর অমলিন অঙ্গীকারের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে। মনিরুল ইসলাম (Monirul Islam) আজ ইতিহাসের পাতায় না থাকলেও, মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন, এক সাহসী সৈনিক, এক দায়িত্ববান পিতা, এক গর্বিত ভারতীয়।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Colonel Sofia Qureshi President Medal, Indian Army Woman Officer Achievement | সাহস, নেতৃত্ব আর সাফল্যের স্বীকৃতি: রাষ্ট্রপতির বিশিষ্ট সেবা পদকে ভূষিত কর্নেল সোফিয়া কুরেশি, ভারতীয় সেনায় নারীশক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন