Bengali author Shankar death | চৌরঙ্গীর স্রষ্টা শংকরের প্রয়াণ, ৯৩ বছরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বর্ষীয়ান সাহিত্যিক, শোকস্তব্ধ বাংলা সাহিত্যজগৎ

SHARE:

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : বাংলা সাহিত্যভুবন হারাল একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। প্রয়াত হলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়, তিনি পাঠকমহলে ‘শংকর’ (Shankar) নামেই অধিক পরিচিত। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। দীর্ঘ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার পর শুক্রবার বেলা পৌনে ১টা নাগাদ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাহিত্যিক। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবী মহলে। পরিবার সূত্রে জানা জানা যায়, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসক ডা. সুদীপ্ত মিত্র জানান, ‘গত কয়েক দিন ধরে ওঁর শারীরিক পরিস্থিতি জটিল হচ্ছিল। ৪ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালে ভর্তি করার পর নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না।’ চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বর্ষীয়ান সাহিত্যিককে আর ফিরিয়ে আনা গেল না।

বেশ কিছু দিন ধরেই বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন শংকর। গত ডিসেম্বর মাসে বাড়িতে পড়ে গিয়ে তাঁর কোমরের হাড় ভেঙে যায়। সেই সময় অস্ত্রোপচারও হয়। অস্ত্রোপচারের পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও শারীরিক দুর্বলতা কাটেনি। সম্প্রতি খাওয়া-দাওয়াও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলে পরিবার জানিয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর অধুনা বাংলাদেশের যশোহর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। তাঁর পিতা হরিপদ মুখোপাধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই কলকাতায় চলে আসেন এবং পরবর্তী কালে হাওড়ায় বসবাস শুরু করেন। সেখানেই শংকরের শৈশব ও কৈশোর কাটে। ছাত্রাবস্থা থেকেই লেখালিখির প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর। সাহিত্যচর্চার সূচনা হয় হাওড়াতেই। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রন্থ। তবে প্রকৃত জনপ্রিয়তা আসে ‘কত অজানারে’ উপন্যাসের মাধ্যমে। মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, সংগ্রাম এবং নগরজীবনের অন্তরঙ্গ বাস্তবতা তাঁর লেখায় অনন্য স্বাদ এনে দেয়। পরবর্তী কালে ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাস তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন দেয়। মহানগর কলকাতার অভিজাত হোটেল জীবনের অন্তরালের গল্প তিনি যেভাবে তুলে ধরেছিলেন, তা পাঠকমনে গভীর ছাপ ফেলে। ১৯৬৮ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘চৌরঙ্গী’ (Chowringhee) বিশেষ সাড়া ফেলে। ছবিতে উত্তমকুমার (Uttam Kumar) -এর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং শংকরের সাহিত্যকে আরও বিস্তৃত পাঠকসমাজে পৌঁছে দেয়।

শুধু উপন্যাস নয়, শংকরের সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্য ছিল বিস্ময়কর। ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন অরণ্য’ এই দুই উপন্যাস অবলম্বনে কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর কলমে কর্পোরেট দুনিয়ার নৈতিক সংকট, যুবসমাজের হতাশা এবং সমাজব্যবস্থার অসঙ্গতি জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’, ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’ প্রভৃতি গ্রন্থেও তাঁর গবেষণামূলক মনন স্পষ্ট। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর বিস্তৃত অনুসন্ধানভিত্তিক রচনা আজও পাঠকমহলে সমাদৃত। শংকরের প্রয়াণে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, ‘বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় (শংকর) -এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর সৃষ্টিকর্ম প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালিকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা সাহিত্যজগতে তাঁর শূন্যতা অপূরণীয়।’

আরও পড়ুন : Narendra Modi on budget | যুবশক্তির স্বপ্নের বাজেটেই বিকশিত ভারতের রোডম্যাপ, কৃষি-শিক্ষা-নারী উন্নয়নে নতুন পথ দেখালেন নরেন্দ্র মোদী

শুধু রাজনৈতিক মহল নয়, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিজগতের বিশিষ্টজনেরা শোকজ্ঞাপন করেছেন। অনেকেই উল্লেখ করেছেন, শংকর ছিলেন এমন এক কথাশিল্পী যিনি সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামকে অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষা ছিল সহজ, অথচ তীক্ষ্ণ। চরিত্রচিত্রণে ছিল গভীর মানবিকতা। বাংলা উপন্যাসে নগরজীবনের বাস্তবচিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে শংকরকে অগ্রগণ্য মনে করেন সাহিত্যসমালোচকেরা। তাঁর রচনায় মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক চাপে ভাঙনের গল্প বারবার ফিরে এসেছে। সমকালীন সমাজবাস্তবতার সঙ্গে পাঠকের আত্মীয়তা তৈরি করাই ছিল তাঁর লেখার শক্তি। শংকরের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য এক যুগের অবসান দেখল। তবে তাঁর অমর সৃষ্টি বাংলা ভাষার পাঠকমনে চিরকাল বেঁচে থাকবে। ‘চৌরঙ্গী’ থেকে ‘জন অরণ্য’ তাঁর কলমে আঁকা চরিত্রগুলি সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও প্রাসঙ্গিক। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর নাম চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : AI:India set to host Global AI Impact Summit in New Delhi, Launches Kaushal Rath for AI Literacy New Delhi

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন