পার্বতী কাশ্যপ, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : আধুনিক ব্যস্ত জীবনে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার এবং মানসিক চাপের কারণে গ্যাস-অম্বল, বদহজম, ক্লান্তি ও কমে যাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মতো সমস্যা এখন প্রায় ঘরে ঘরে। একের পর এক নিমন্ত্রণবাড়ি, পছন্দের খাবার সামনে থাকলেও অনেকেই খেতে ভয় পান হজমের সমস্যার আশঙ্কায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘শরীর ভাল রাখতে সবসময় জটিল ওষুধ বা দামি সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হয় না, বরং রান্নাঘরের সাধারণ কিছু উপাদানই হতে পারে সুস্থতার সহজ চাবিকাঠি।’ তেমনই একটি পরিচিত খাদ্য উপাদান হল কিশমিশ (Raisin)। পায়েস, পোলাও বা মিষ্টান্নে স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি এই শুকনো ফলটির রয়েছে একাধিক স্বাস্থ্যগুণ। পুষ্টিবিদদের মতে, ‘রাতভর জলে ভিজিয়ে রাখা কিশমিশ সকালে খেলে শরীরের নানা উপকার পাওয়া যায়।’ নিয়মিত এই অভ্যাস বদলে দিতে পারে আপনার হজম, শক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার চেহারা।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, কিশমিশে থাকা ডায়েটারি ফাইবার অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। গুরুপাক বা তেল-ঝাল খাবার খাওয়ার পর যে অস্বস্তি তৈরি হয়, তা কমাতে সাহায্য করে এই ফাইবার। এটি অন্ত্রের গতি স্বাভাবিক রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা নেয়। ফলে গ্যাস, অম্বল ও পেটফাঁপার মতো সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, ‘অন্ত্র সুস্থ থাকলে শরীরের সামগ্রিক সুস্থতাও অনেকাংশে বজায় থাকে।’ শুধু হজম নয়, সারাদিন চাঙা থাকতে কিশমিশ হতে পারে সহজ সমাধান। এতে প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ দ্রুত শক্তি জোগাতে সক্ষম। অনেকেই সকালে উঠে কফির উপর নির্ভর করেন কর্মশক্তি বাড়ানোর জন্য। কিন্তু পুষ্টিবিদরা বলছেন, ‘ভেজানো কিশমিশ শরীরে ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে, ফলে রক্তে শর্করার হঠাৎ ওঠানামা কম হয় এবং দীর্ঘক্ষণ এনার্জি বজায় থাকে।’ মিষ্টি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে এই শুকনো ফল।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি বৃদ্ধিতেও কিশমিশের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এতে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি, যা শরীরের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘নিয়মিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার খেলে প্রদাহ কমে এবং শরীর সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম হয়।’ ঋতু পরিবর্তনের সময় ঘন ঘন ঠান্ডা লাগা বা সর্দি-কাশির প্রবণতা কমাতেও সহায়ক হতে পারে ভেজানো কিশমিশ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। কোমর ব্যথা, হাঁটুর ব্যথা অনেকের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। পুষ্টিবিদদের দাবি, কিশমিশে থাকা ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম হাড় মজবুত রাখতে সাহায্য করে। ‘নিয়মিত সুষম মাত্রায় কিশমিশ খেলে হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার হৃদ্স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও কিশমিশ উপকারী বলে মনে করা হয়। এতে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হৃদ্যন্ত্রকে সুস্থ রাখতে ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞদের কথায়, ‘স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে কিশমিশ যুক্ত করলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর প্রচেষ্টায় সহায়ক হতে পারে।’
তবে সবকিছুর মতোই পরিমাণের দিকেও নজর রাখা জরুরি। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত কিশমিশ খেলে ক্যালোরি ও প্রাকৃতিক শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তাই প্রতিদিন এক মুঠো বা ৮-১০টি কিশমিশই যথেষ্ট। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ‘রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একটি বাটিতে পরিষ্কার জলে কিশমিশ ভিজিয়ে রাখুন। সকালে উঠে সেই ফুলে ওঠা কিশমিশ ভাল করে চিবিয়ে খান। চাইলে ভেজানো জলটুকুও পান করতে পারেন।’ স্বাস্থ্য সচেতকদের মতে, বড় কোনও ‘ডিটক্স’ বা হঠাৎ কঠোর ডায়েট নয়, বরং ছোট ছোট নিয়মিত অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বড় ফল দেয়। ভেজানো কিশমিশ সেই রকমই একটি সহজ ও কার্যকর খাদ্যাভ্যাস, যা দৈনন্দিন জীবনে সহজেই যুক্ত করা যায়। উল্লেখ যে, বিশেষজ্ঞদের সাফ বার্তা যে, ‘কোনও একক খাবারই জাদুকাঠির মতো সব সমস্যা দূর করতে পারে না। সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত জলপান, নিয়মিত ব্যায়াম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এই সবকিছুর সমন্বয়েই গড়ে ওঠে সুস্থ জীবনযাপন।’ তবুও, সকালের শুরুটা যদি এক মুঠো ভেজানো কিশমিশ দিয়ে করা যায়, তাহলে তা হতে পারে সুস্থতার পথে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : Soft Patisapta Recipe Without Rice Flour, Easy Winter Pitha | চালের গুঁড়ো ছাড়াই পাটিসাপটা রেসিপি, ময়দা-সুজির সহজ পিঠে




