শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : কারও বাড়ি থেকে আদর-আপ্যায়ন সেরে ফিরলেন, রাতেই শিশুর জ্বর। নতুন গাড়ি কেনার দু’দিনের মাথায় অদ্ভুত আঁচড়। জমজমাট ব্যবসায় আচমকা মন্দা। আর তখনই চারপাশে ফিসফাস ‘নজর লেগেছে!’ শব্দবন্ধটি এতটাই পরিচিত যে অঘটনের দ্রুততম ব্যাখ্যা যেন এটাই। কিন্তু সত্যিই কি কারও ঈর্ষাপূর্ণ দৃষ্টি অন্যের জীবনে ক্ষতি ডেকে আনতে পারে? নাকি ‘নজর দোষ’ আসলে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া, অনিশ্চয়তা আর ভয়ের সহজ ব্যাখ্যা? লোকবিশ্বাস বলছে, ঈর্ষা বা হিংসার দৃষ্টি থেকে একটি ধরনের নেতিবাচক শক্তি নির্গত হয়, যা অন্যের সুখ-সমৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে। ভারতে একে বলা হয় ‘নজর’, পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের নানা দেশে পরিচিত ‘ইভিল আই’ নামে। তুরস্কে নীল পুঁতির তাবিজ ‘নাজার বনজুক’ জনপ্রিয়, আর আমাদের দেশে শিশুর কপালে কালো টিপ, হাতে কালো সুতো, দরজায় লেবু-লঙ্কা এসবই কু-দৃষ্টি কাটানোর চিহ্ন। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার নথিতেও ‘ইভিল আই’-এর উল্লেখ রয়েছে বলে ঐতিহাসিকদের মত। অর্থাৎ, এই বিশ্বাস কেবল ভারতীয় উপমহাদেশে সীমাবদ্ধ নয়; বহু সংস্কৃতিতে এর ছাপ স্পষ্ট।
কিন্তু, আধুনিক মনস্তত্ত্ব ভিন্ন কথা বলছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ অনিশ্চয়তাকে স্বভাবতই ভয় পায়। যখন হঠাৎ খারাপ কিছু ঘটে, তখন আমরা দ্রুত একটি কারণ খুঁজে নিতে চাই। ‘নজর লেগেছে’ বলা অনেক সময় নিজের উদ্বেগকে বাইরের শক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এক সহজ উপায়। এতে সাময়িক স্বস্তি মেলে, কারণ সমস্যার দায় নিজের বা বাস্তব পরিস্থিতির ওপর পড়ে না। এটিকে মনোবিজ্ঞানে ‘এক্সটার্নাল অ্যাট্রিবিউশন’ বলা হয় অর্থাৎ ব্যর্থতার কারণ বাইরের শক্তির ওপর আরোপ করা। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ছোট শিশুর হঠাৎ জ্বর, অকারণ কান্না বা খাওয়ায় অনীহা এসবের পেছনে থাকতে পারে ভাইরাল সংক্রমণ, ঘুমের ঘাটতি বা পরিবেশগত পরিবর্তন। ব্যবসায় মন্দা আসতে পারে বাজারের ওঠানামা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে। নতুন গাড়িতে আঁচড় পড়া নিছক দুর্ঘটনা। তবু ‘নজর’ শব্দটি যেন সব ব্যাখ্যার শর্টকাট। কারণ অদৃশ্য শক্তিকে দায়ী করা অনেক সহজ।

গ্রাম থেকে শহর সব জায়গাতেই নজর কাটানোর নানা রীতি প্রচলিত। কেউ নুন-জল দিয়ে স্নান করেন, কেউ সন্ধ্যায় ধুনো জ্বালান, কেউ বা লাল মরিচ পুড়িয়ে বাড়ির চারদিকে ঘোরান। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পরিষ্কার নয়, তবু এই আচারগুলো মানুষকে মানসিক স্বস্তি দেয়। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘প্লাসিবো প্রভাব’। অর্থাৎ, বিশ্বাস থেকেই শরীর ও মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আপনি যদি মনে করেন যে একটি বিশেষ আচার আপনাকে সুরক্ষা দিচ্ছে, তবে আপনার উদ্বেগ কমে যায়, মন শান্ত হয় আর সেই শান্ত মন শরীরকেও প্রভাবিত করে। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও নজর দোষের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে ঈর্ষা একটি বড় মানসিক উপাদান। কারও সাফল্য অন্যের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। এই অস্বস্তিকেই সাংস্কৃতিক ভাষায় ‘নজর’ বলা হয়েছে বলে মনে করেন সমাজতত্ত্ববিদেরা। ফলে, নজর দোষের গল্প আসলে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, প্রতিযোগিতা আর নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন।
কিন্তু, সমস্যার জায়গা হল, যখন সব কিছুর কারণ হিসেবে ‘কু-দৃষ্টি’কে দায়ী করা হয়। দীর্ঘদিন অসুস্থতা, মানসিক অবসাদ বা পারিবারিক অশান্তি যদি শুধুই নজরের ফল বলে ধরে নেওয়া হয়, তবে প্রকৃত চিকিৎসা বা সমাধান পিছিয়ে যায়। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন জ্বর, দুর্বলতা বা উদ্বেগ দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ অনেক সময় যে সমস্যাকে আমরা ‘নজর’ ভাবছি, তা হতে পারে হরমোনের অসাম্য, পুষ্টির ঘাটতি বা মানসিক চাপের ফল। একই সঙ্গে এটাও সত্য, সংস্কৃতি ও বিশ্বাস মানুষের পরিচয়ের অংশ। নজর দোষে বিশ্বাস করবেন কি না, তা ব্যক্তিগত বিষয়। তবে অন্ধবিশ্বাস যেন যুক্তিবোধকে আচ্ছন্ন না করে এটাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ। শিশুর কপালে কালো টিপ পরানো ক্ষতিকর নয়, কিন্তু অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া অপরিহার্য। ব্যবসায় ক্ষতি হলে বাজার বিশ্লেষণ জরুরি, কেবল লেবু-লঙ্কা ঝোলানো নয়।
আসলে নজর দোষ এক জটিল সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধারণা। এতে ইতিহাস আছে, সমাজ আছে, বিশ্বাস আছে আবার ভয়ও আছে। ‘নজর লেগেছে’ বলা সহজ, কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, আমাদের নিজের চাপ, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার সঙ্গেই এই ধারণার নিবিড় সম্পর্ক। তাই অঘটন ঘটলে আতঙ্কিত না হয়ে যুক্তিবোধে ভরসা রাখুন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। বিশ্বাস থাকুক, কিন্তু সচেতনতার আলো নিভে না যাক, এই ভারসাম্যই হয়ত নজর দোষ নিয়ে সঠিক পথ দেখাতে পারে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত।
আরও পড়ুন : MENSTRUAL PAIN : ঋতুস্রাবের ব্যথা হলে কী করবেন?




