সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : মেধা থাকলেও আর্থিক সঙ্কটে বহু ছাত্রছাত্রীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন মাঝপথে থেমে যায়, বিশেষত চিকিৎসা ও প্রকৌশল শিক্ষার প্রস্তুতিতে কোচিং-খরচ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে রাজ্য সরকার চালু করেছে ‘যোগ্যশ্রী’ (Yogyashree Scheme) প্রকল্প। লক্ষ্য, আর্থিকভাবে দুর্বল অথচ মেধাবী পড়ুয়াদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করা। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে ১০ মাসে স্টাইপেন হিসেবে মোট ৩০০০ টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হবে। পাশাপাশি সপ্তাহান্তে নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ মিলবে, যা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নপূরণে বড় সহায়ক বলে মনে করছেন শিক্ষামহল। সরকারি সূত্রের দাবি, ‘যোগ্যশ্রী’ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৭ সালে জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসতে ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীদের সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে NEET (NEET), JEE (JEE) এবং WBJEE (WBJEE)। প্রতি শনি ও রবিবার চার ঘণ্টা করে ক্লাস নেওয়া হবে। উপস্থিতির ভিত্তিতে প্রতিটি ক্লাসে ৩০০ টাকা হারে ১০ মাসে মোট ৩০০০ টাকা স্টাইপেন দেওয়া হবে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট এক আধিকারিকের কথায়, ‘মেধা যাতে অর্থাভাবে থেমে না যায়, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
আবেদন প্রক্রিয়া অনলাইন ও অফলাইন, দুই পথেই খোলা। অনলাইনে নির্দিষ্ট পোর্টালে গিয়ে আবেদনপত্র পূরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র, আয়সনদ প্রভৃতি নথি আপলোড করে ফর্ম জমা দিলেই প্রাথমিক যাচাই শুরু হবে। অফলাইন পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্প বা নির্ধারিত কেন্দ্র থেকে ফর্ম সংগ্রহ করে জমা দেওয়া যাবে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ‘আবেদনকারীর পরিবারের বার্ষিক আয় তিন লক্ষ টাকার কম হতে হবে।’ আয়সীমা পূরণ না হলে প্রকল্পের সুবিধা মিলবে না। বর্তমানে এই প্রকল্পের সুবিধা আপাতত পূর্ব মেদিনীপুর (Purba Medinipur) জেলার পড়ুয়ারা পাচ্ছেন। জেলার সাতটি স্থানে বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ শিক্ষকরা প্রবেশিকা পরীক্ষার সিলেবাস অনুযায়ী পাঠদান করবেন। প্রশাসনের বক্তব্য, ‘পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলাতেও প্রকল্প বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।’ ফলে ভবিষ্যতে রাজ্যের আরও বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী এই সুযোগের আওতায় আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রবেশিকা পরীক্ষায় সাফল্যের জন্য ধারাবাহিক অনুশীলন, মক টেস্ট ও বিশেষজ্ঞ গাইডেন্স অত্যন্ত জরুরি। বেসরকারি কোচিংয়ে মাসিক ফি অনেক সময় হাজার হাজার টাকা; সেখানে সরকারি উদ্যোগে সপ্তাহান্তের নিয়মিত ক্লাস ও স্টাইপেন আর্থিক চাপ কমাতে পারে। এক শিক্ষক বলেন, ‘যোগ্যশ্রী প্রকল্প শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, মানসম্মত প্রশিক্ষণের সুযোগও দিচ্ছে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার ছাত্রছাত্রীরা বিশেষভাবে উপকৃত হবে।’ অভিভাবকদের একাংশও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করেও কোচিংয়ের খরচ জোগাতে না পেরে অনেকেই পিছিয়ে পড়ে। সরকার যদি নিয়মিত ক্লাস ও সামান্য আর্থিক সহায়তা দেয়, তবে সন্তানদের প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে।’ তবে তাঁরা দ্রুত জেলা-ভিত্তিক বিস্তারের দাবি জানিয়েছেন, যাতে রাজ্যের সব প্রান্তের পড়ুয়ারা সমান সুযোগ পান।
প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত পড়ুয়াদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। নির্দিষ্ট শতাংশ উপস্থিতি না থাকলে স্টাইপেন প্রাপ্তিতে সমস্যা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। ফলে শুধু নাম নথিভুক্ত করলেই হবে না; নিয়মিত ক্লাসে অংশ নেওয়াও জরুরি। প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, ‘এই প্রকল্পকে আমরা ফলপ্রসূ করতে চাই। তাই উপস্থিতি ও পারফরম্যান্স—দুটিই নজরে রাখা হবে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৭ সালের প্রবেশিকা পরীক্ষাকে লক্ষ্য রেখে এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করলে সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ে। সিলেবাসভিত্তিক পরিকল্পনা, সময় ব্যবস্থাপনা ও ধারাবাহিক অনুশীলন, এই তিন স্তম্ভে ভর করেই এগোবে ‘যোগ্যশ্রী’-র প্রশিক্ষণ মডিউল। পাশাপাশি সন্দেহ নিরসনের জন্য ডাউট-ক্লিয়ারিং সেশন, মডেল প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়নও থাকবে। উল্লেখ্য, ‘যোগ্যশ্রী’ প্রকল্প আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য এক বড় সুযোগ। ৩০০০ টাকার স্টাইপেন হয়ত বিশাল অঙ্ক নয়, কিন্তু নিয়মিত প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। এখন দেখার, কবে রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও এই উদ্যোগ পৌঁছয় এবং কতজন পড়ুয়া এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নপূরণে একধাপ এগিয়ে যেতে পারেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : লোক ভবনে বৈঠক ও যৌথ বিবৃতি শেষে ইন্ডিয়া-ফ্রান্স ইনোভেশন ফোরামে রওনা মোদী-ম্যাক্রোঁ




