সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লী : ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র হল। দিল্লীতে কমিশনের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে শেষ পর্যন্ত বৈঠক বয়কট করে বেরিয়ে এলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। নির্বাচন সদন থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, ‘আমাদের অসম্মান, অপমান করা হয়েছে। জীবনে এমন নির্বাচন কমিশন দেখিনি।’ কেন্দ্রীয় কমিশনকে বিজেপির ইশারায় কাজ করা ‘মিথ্যাবাদী’ প্রতিষ্ঠান বলেও তোপ দাগেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে চলছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ। প্রথম থেকেই এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সরব তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)। সেই বিতর্কের মধ্যেই সোমবার বিকেল ৪টেয় তৃণমূলের প্রতিনিধিদলকে আলোচনার জন্য সময় দেয় নির্বাচন কমিশন। সেই বৈঠকে যোগ দিতেই সদলবলে দিল্লিতে পৌঁছন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীতে উত্তেজনার ছবি ধরা পড়ে। আচমকাই বঙ্গভবনের সামনে দিল্লী পুলিশের ব্যাপক তৎপরতাও নজরে আসে। অভিযোগ ওঠে, এলাকা ঘিরে ফেলে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এই খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের আগেই দিল্লিতে রাজনৈতিক চাপানউতোরের আবহ তৈরি হয়।
নির্ধারিত সময়ের কিছু পর, বিকেল ৪টার পরে নির্বাচন সদনে পৌঁছন মমতা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। প্রতিনিধিদলের সকলের পরনেই ছিল কালো পোশাক, প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে। মমতার সঙ্গে ‘এসআইআর-এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত’ বলে দাবি করা কয়েক জন সাধারণ মানুষকেও নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে কেউ কালো চাদর, কেউ কালো সোয়েটার পরে ছিলেন। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও (Kalyan Banerjee) ছিলেন দলে। তৃণমূলের দাবি অনুযায়ী, জীবিত হয়েও নির্বাচন কমিশনের নথিতে ‘মৃত’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন এমন ৫০ জন ভোটারকে দিল্লিতে আনা হয়েছিল। পাশাপাশি আরও ৫০ জনকে আনা হয়, যাঁদের পরিবারের সদস্যরা এসআইআর প্রক্রিয়ার কারণে নানা সমস্যায় পড়েছেন বা মারা গিয়েছেন বলে অভিযোগ। এই ‘এসআইআর ক্ষতিগ্রস্ত’দের মধ্য থেকে ১২ জনকে নিয়ে কমিশনের দফতরে প্রবেশ করেন মমতা ও অভিষেক।

নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) এবং আরও দুই নির্বাচন কমিশনার। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বৈঠক চলে। কিন্তু বৈঠক শেষে পরিস্থিতি যে শান্ত হয়নি, তা বোঝা যায় মমতার বক্তব্যে। নির্বাচন সদন থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বহু বছর দিল্লীর রাজনীতি করেছি। মন্ত্রী ছিলাম। কিন্তু এত অহঙ্কারী নির্বাচন কমিশন কখনও দেখিনি।’ তাঁর অভিযোগ, কমিশন বিজেপির নির্দেশে কাজ করছে এবং ইচ্ছাকৃত ভাবে বাংলাকে নিশানা করা হচ্ছে। মমতার প্রশ্ন, ‘কেন শুধু বাংলাকেই টার্গেট করা হচ্ছে?’ মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি কমিশনকে ‘মিথ্যাবাদী’ আখ্যা দেন। তাঁর কথায়, ‘আমরা ওঁদের বলেছি, আপনাদের কুর্সিকে সম্মান করি। কিন্তু কুর্সি কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়।’ বৈঠক বয়কট করার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমাদের অসম্মান করা হয়েছে, অপমান করা হয়েছে। তাই আমরা বৈঠক বয়কট করে বেরিয়ে এসেছি।’
এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘সীমা খান্না (Seema Khanna) কে? উনি নির্বাচন কমিশনের কেউ নন। বিজেপির আইটি সেলের লোক। এআই ব্যবহার করে ৫৮ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কমিশন কোনও প্রশ্নই করেনি।’ তাঁর আরও অভিযোগ, ‘নির্বাচনের মাত্র তিন মাস আগে কেন এসআইআর করা হল? অসমে কেন করা হল না?’ বৈঠকের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ‘কমিশনের নিজস্ব ক্যামেরাম্যানরা বৈঠকে ছিলেন। কিন্তু বাইরের ক্যামেরাম্যানদের ঢুকতে দেওয়া হল না। মানে, আপনারা যা ইচ্ছা তাই করবেন?’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও জানান, তিনি বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে বলেছেন, ‘আপনার অবস্থা ধনখড়ের মতো হবে।’ বিজেপির চাপে কাজ করার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিহার, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রে প্রভাব খাটিয়ে জিতেছে বিজেপি, কিন্তু বাংলা হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, ‘প্রয়োজনে আমি এক লক্ষ মানুষ নিয়ে দিল্লি আসব।’
এসআইআর প্রক্রিয়ার কারণে মৃত্যুর অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, ‘এত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তার দায় কে নেবে? কমিশনই দায়ী।’ কমিশন বিজেপির ‘তোতাপাখি’ হয়ে কাজ করছে বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি অনেক কমিশনার দেখেছি, কিন্তু কেউ তোতাপাখি ছিলেন না।’ মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দেন, নির্বাচন কখনও বয়কট করবেন না। ‘এই ভুল আমরা করব না। আমরা লড়ে নেব,’ বলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ছ’মাস ধরে রাজ্য সরকারকে কার্যত অচল করে রাখা হয়েছে। ‘বাংলা যেন রাষ্ট্রপতি শাসনের মধ্যে দিয়ে চলছে,’ মন্তব্য করেন মমতা। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা মঙ্গলবার দলীয় বৈঠকের পর জানানো হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তবে একথা স্পষ্ট করে দেন, ‘এই নির্বাচন কমিশনের থেকে আমাদের কোনও আশা নেই।’ দিল্লির বৈঠক বয়কটের মধ্য দিয়ে এসআইআর বিতর্ক যে আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাতে গড়াচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee Supreme Court case, Election Commission vs West Bengal | নির্বাচনী তালিকা সংশোধন ঘিরে দিল্লির দরবারে লড়াই, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়



