সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কেন্দ্রীয় বাজেট প্রকাশের পরেই রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে। রবিবার দিল্লী যাওয়ার আগে কলকাতা বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় বাজেটকে একহাত নিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তাঁর কণ্ঠে ছিল তীব্র ক্ষোভ ও কটাক্ষ। বাজেটকে তিনি আখ্যা দিলেন ‘মিথ্যার জঞ্জাল’ বলে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, এই বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু নেই, নেই সামাজিক সুরক্ষার কোনও স্পষ্ট রূপরেখা। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ‘ওরা জানে বাংলায় ভোট পাবে না। সেই কারণেই পরিকল্পিত ভাবে পশ্চিমবঙ্গকে বঞ্চনা করা হচ্ছে।’ উল্লেখ্য, মমতার সমালোচনার সুরে সুর মিলিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। তিনি কেন্দ্রীয় বাজেটকে ‘বিমাতৃসুলভ’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। অভিষেকের মতে, দীর্ঘ বাজেট ভাষণে পশ্চিমবঙ্গের জন্য কোনও উল্লেখযোগ্য ঘোষণা না থাকাই প্রমাণ করে দেয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই এই আর্থিক অবহেলা। রবিবার বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই বাজেট গারবেজ অফ লাই। গোটা দেশে এখন একটাই কর কাঠামো, জিএসটি। রাজ্যগুলির কাছ থেকে সব টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্র। বাংলার পাওনা টাকা আটকে রাখা হয়েছে। বাজেটে যেসব বরাদ্দের কথা বলা হচ্ছে, তার বেশির ভাগই আমাদের নিজেদের টাকা।’ তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের প্রায় দু’লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া রেখে দিয়েছে কেন্দ্র।বাজেটে ডানকুনি (Dankuni) থেকে গুজরাতের সুরত (Surat) পর্যন্ত নতুন ফ্রেট করিডর তৈরির ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, এই পরিকল্পনা নতুন নয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন ডানকুনি পণ্য করিডরের প্রস্তাব তিনিই দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই কাজ থমকে যায়। তাঁর প্রশ্ন, ‘যে কাজ আমরা শুরু করেছিলাম, সেটাকেই নতুন করে সাজিয়ে বাজেটে দেখানো হচ্ছে কেন?’ মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই একাধিক পণ্য করিডরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে। ডানকুনি-রঘুনাথপুর, রঘুনাথপুর-তাজপুর, ডানকুনি-ঝাড়গ্রাম, ডানকুনি-কোচবিহার, পুরুলিয়ার গুরুডি থেকে জোকা এবং খড়্গপুর-মোরগ্রাম এই করিডরগুলির মাধ্যমে শিল্প ও বাণিজ্যের পরিকাঠামো মজবুত করা হচ্ছে। মমতার দাবি, জঙ্গলমহল এবং পুরুলিয়ার মতো এলাকাগুলিতে ইতিমধ্যেই প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে।
কেন্দ্রীয় বাজেটে শিলিগুড়ি (Siliguri) থেকে বারাণসী (Varanasi) পর্যন্ত হাইস্পিড রেল করিডরের ঘোষণাকেও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি মুখ্যমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) নির্বাচনী কেন্দ্র বারাণসীকে ‘ডিজনিল্যান্ড’ বানানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর প্রশ্ন, ‘বাংলার জন্য কী আছে? সব কিছুই কি শুধু ভোটের অঙ্ক কষে?’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় বাজেটকে ‘হাম্পটি ডাম্পটি বাজেট’ বলেও ব্যঙ্গ করেন। তাঁর মতে, বাজেটে শুধু কথার ফুলঝুরি রয়েছে, বাস্তব আর্থিক সহায়তার কোনও প্রতিফলন নেই। বাজারের পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বাজেটের পরেই শেয়ারবাজারে বড় ধস নেমেছে। সেনসেক্স প্রায় হাজার পয়েন্ট পড়ে গিয়েছে। বণিকমহল হতাশ।’
অন্য দিকে, বাজেট পেশের পরপরই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, ‘৮৫ মিনিটের বাজেট ভাষণে পশ্চিমবঙ্গের জন্য একটি ঘোষণাও নেই।’ অভিষেক এই বাজেটকে ‘দিশাহীন, ভিত্তিহীন এবং লক্ষ্যহীন’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর অভিযোগ, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই বিজেপি (BJP) কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বাংলার প্রাপ্য টাকা বন্ধ করে দিয়েছে। ১০০ দিনের কাজ প্রকল্প প্রসঙ্গে অভিষেক আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ‘২০২১ সালের পর বাংলার এক জন মানুষও যদি কেন্দ্রের টাকা পেয়ে থাকেন, তা প্রমাণ করতে পারলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব।’ তাঁর মতে, কেন্দ্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে রাজ্যের গরিব মানুষের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। অভিষেকের কটাক্ষ, ‘বাংলায় বিজেপি হারছে। তাই বিমাতৃসুলভ মনোভাব নিয়ে বাংলার মানুষকে শাস্তি দিতে চাইছে।’
পাশাপাশি তৃণমূল শিবিরের ধারণা, কেন্দ্রীয় বাজেটে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিশেষ কোনও ঘোষণা না থাকাই আগামী বিধানসভা ভোটের আগে রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠবে। ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’কে সামনে রেখে জনমত গঠনের সুযোগ পাচ্ছে রাজ্যের শাসকদল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মমতা ও অভিষেক দু’জনেই এ দিন সেই ইস্যুকে আরও শানিয়ে নিলেন। উল্লেখ্য যে, কেন্দ্রীয় বাজেট প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গ-কেন্দ্র সম্পর্কের টানাপড়েন আরও প্রকাশ্যে চলে এল। যেখানে কেন্দ্র বাজেটকে উন্নয়নমুখী বলে ব্যাখ্যা করছে, সেখানে রাজ্য সরকারের অভিযোগ, এই উন্নয়ন নির্বাচিত কিছু রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাংলাকে বারবার বঞ্চিত করার অভিযোগে সরব তৃণমূল নেতৃত্ব, আর সেই লড়াই আগামী দিনে আরও তীব্র হবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee statement | ‘ভোটের জন্য অশান্তি নয়, বাংলা শান্তি চায়’ | ৩০ শতাংশ প্রসঙ্গে কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের, শুরু রাজনৈতিক তরজা




