সম্পাদকীয় -এর বদলে…
মানুষ কোলাহল ছেড়ে বাঁচতে চায়
নিঃস্তব্ধতায় আরও বেশি কোলাহল
বাঁচার স্বার্থকতা খোঁজে শান্তির পথ

🍁 মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
যাঁহা হতে এই সমস্ত জগৎ উৎপন্ন, যিনি জগৎস্বরূপ, যাঁতে জগৎ অবস্থিত এবং যাঁতে জগৎ লয়প্রাপ্ত হবে,সেই বিষ্ণুই পরম ব্রহ্ম।
এ জ্ঞান কি করে লাভ করা যায়?
কেবল নাম করলে চোখের পরদা সরে যায়,তিনিই সব— ইহা প্রত্যক্ষ করা যায়।
যারা রামনাম অবলম্বন না করে অন্য উপায়ে পাপ ক্ষয় করতে চেষ্টা করে তাদের কি পাপ দূর হয় না?
শ্রীরামনাম-বিমুখ জীবকে শুদ্ধ করতে পারে এমন কোন প্রায়শ্চিত্ত নাই— একথা আমার সত্য।
হে শিবে, অনবধানতা ত্যাগ করে সাবধানে সর্ব্বদা শ্রীরামনাম জপের নিয়ম ধারণ করা কর্ত্তব্য।
নিয়ম ধারণের অর্থ?

সংখ্যা রেখে নিত্য জপ করতে হয়; সংখ্যাটি যাতে রক্ষা হয় তাহা সর্ব্বতোভাবে কর্ত্তব্য।
সংখ্যা রেখে জপ করতে গেলে মন তো সংখ্যার দিকে যায়?
সংখ্যা না রেখে জপ করলে কি মন একেবারে স্থিরভাবে অবস্থান করে?
না, তা করে না।
পূর্ব্বতন ভক্তগণ সংখ্যা রেখে জপ করতেন। ব্রহ্ম হরিদাস তিন লক্ষ ও জগাই মাধাই দুলক্ষ করে হরিনাম জপ করতেন এরূপ শোনা যায়। শাস্ত্রও বলেন—
“ন সংখ্যাত জপেৎ সুধীঃ”।
সংখ্যা রেখে জপে লাভ কি?
মানুষের সব দিন সমান থাকে না; যেদিন ভালো লাগলো দশ হাজার জপ করলাম, যেদিন ভালো লাগলো না ১০৮ জপ করে ছেড়ে দিলুম— এর দ্বারা অভীষ্ট সিদ্ধ হয় না। আমি দশ হাজার জপ করবো নিয়ম করলাম, ভাল না লাগলেও জপ করতে বাধ্য হব;— তাতে শীঘ্র চিত্ত স্থির হয়, সাড়া মেলে। আরও সংখ্যা রেখে জপ করলে জপের সংখ্যা দিন দিন বাড়াতে ইচ্ছা হবে; যত জপ বাড়বে অন্য কাজ অন্য সঙ্গ তত কমে যাবে। এইজন্য জাপকমাত্রেরই যতদিন সংখ্যা রাখবার শক্তি থাকে, ততদিন একটি সংখ্যার নিয়ম রাখা উচিত; তারপর যত বেশী হয় তত উত্তম। যাক, একবার যমরাজ দূতগণকে বলেছিলেন— হে দূতগণ, আমার নিশ্চিত শাসন শ্রবণ কর— কল্যাণকর সুখজনক শ্রীরামচন্দ্রের নির্ম্মল নাম যাঁরা সকল সময়েই স্মরণ করেন, সেখানে তোমাদের গমন সুখদায়ক নয় অর্থাৎ তোমরা সেখানে যেওনা বা— গেলে ফিরে আসতে হবে, তোমাদের প্রবেশ অধিকার তথায় নাই।
হে মহামুনে! যেমন শ্রেষ্ঠতম ঔষধ না জেনে ব্যবহার করলেও তার আত্মগুণ প্রদর্শন করে,তদ্রূপ কলিযুগে রাঘবের নামরূপ মহৌষধ প্রয়োগ করলে অলভ্য দূরস্থিত পরমপদও মানব প্রাপ্ত হয়।
নামের মহিমা তুমি শুনিছ নিয়ত।
গাও দাস সীতারাম হইয়া সংযত॥
শ্রীরাম জয় রাম জয় জয় রাম।
শ্রীরাম জয় রাম জয় জয় রাম॥
—শ্রীশ্রীনামামৃতলহরী | শ্রীশ্রী ঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব
(বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)

ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
১৭.
ধুলো আর জলের মাঝখানে
বিকেল নামছিল ধীরে ধীরে। আলোটা এমন, যেটাকে ভালও বলা যায় না, খারাপও না। মাথার ভেতর ধোঁয়ার মতো ঝাপসা। সোমদত্তা স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। মাথায় বই, হাতে কিছু খাতা। ছাত্রছাত্রীদের যাবার শব্দ মিলিয়ে গিয়েছে, কেবল মাঠে দু-একটা বাচ্চা ছুটছে অলসভাবে। তার চোখে এখন এক ধরনের ক্লান্ত স্থিরতা।
মুখে কোনও রঙ নেই, চুলে সাদা সূক্ষ্ম রেখা পড়েছে, কিন্তু চোখের কোণে একরকম শক্ত অভিজ্ঞতা জমে আছে, যা না আনন্দ, না দুঃখ। সে জানে, এখন তার ভেতরে কিছুই অবশিষ্ট নেই। শুধু জীবন আছে, চলতে থাকা অভ্যাস। ঘরে ফিরে এসে জানালা খুলল। বাইরে গাছের পাতা নড়ছে। গরমের হাওয়া উঠে গা বেয়ে নেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।বিছানার পাশে টেবিলে রাখা খাতাটা খুলে দেখল। বেল্লার কবিতা। তারই হাতে লেখা শিরোনাম, ‘আমার শরীর আমার ভাষা।’
মেয়েটা লিখেছে ভয়ে নয়, একরকম আঘাত নিয়ে। সোমদত্তা পড়ছিল, আর হঠাৎ নিজের কৈশোরের কোনও এক বিকেল মনে পড়ল।
সেই বিকেল। নীলাঞ্জন প্রথম দিন বলেছিল,
‘তোমার চোখে এক অদ্ভুত ক্লান্তি আছে, সোমা। যেন তুমি সব কিছু আগেই জেনে গেছ।’
তখন সোমদত্তা হেসেছিল।
‘তুমি বোকার মতো কথা বলো। আমি তো কেবল মানুষ।’
নীলাঞ্জন তার থেকে অল্প বড়, শান্ত প্রকৃতির ছেলে। কথা কম, কিন্তু চোখে একরকম জেদী নরম কিছু। কলেজের ফাঁকা বারান্দায় বসে ওরা দু’জন তখন চুপচাপ ছিল।
নীলাঞ্জন বলেছিল, ‘ভালবাসা মানে জানি না, কিন্তু তোমার সঙ্গে থাকলে ভয় পাই না।’
সোমদত্তা কিছু বলেনি। সে জানত, ভয় না পাওয়া মানে আসলে একটা ভয়ই, যেটা ভেতরে জমে থাকে, যেটা উচ্চারণ অব্দি পৌঁছাতে পারে না।
বেল্লার কণ্ঠের এই লাইন শুনে সোমদত্তা মাথা নিচু করল। দুই ফোঁটা জল পড়ে গেল টেবিলে।
বৃষ্টি নয়, অশ্রু নয়, কেবল ভেতরের নরম একটা সরে যাওয়া। বাড়ি ফিরে সে ড্রয়ার খুলল। চিঠিটা বের করল আবার।পড়ল না, শুধু দেখল। তারপর খামে ভরে রাখল আগের জায়গায়।বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।জানালার ধারে বসে সে হঠাৎ বুঝল, মানুষ কাউকে হারালে আসলে কাউকেই হারায় না।হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো অন্য কারও ভিতর জন্ম নেয়, যেমন বেল্লার মধ্যে এখন একটু নীলাঞ্জন আছে, আর একটু তার নিজেরও।
তারা দেখা করত অনিয়মিত, বেশিরভাগ সময়েই কথা না বলেই। এক বিকেলে সোমদত্তা বলেছিল, ‘তুমি যদি কখনও চলে যাও, আমি কিছু বলব না।’
নীলাঞ্জন বলেছিল, ‘আমি যাব না।’
কিন্তু মানুষ যা বলে, তা বিশ্বাস করা যায় না। মানুষ যা চুপচাপ করে সেটাই বেশি সত্যি।
সেই দিনের পর সব কিছুর শুরু।
নীলাঞ্জন বলেছিল, ‘চলো, শহরের বাইরে যাই। একটু হাঁটব।’
বৃষ্টির পরের দিন ছিল, রাস্তায় কাদা, বাতাসে এক ধরনের ময়লা গন্ধ। তারা হেঁটেছিল, অনেকক্ষণ, কোনও কথা হয়নি। একসময় নীলাঞ্জন থেমে গিয়ে বলেছিল,
‘তুমি আমার জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছ, সোমা।’ সোমদত্তা মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছিল। তার মুখে তখন কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। শুধু চোখের কোণে একটা জেদ, একটা নীরব অনড় কিছু।সে বলেছিল, ‘অংশ মানে অসম্পূর্ণতা। আমি তো সম্পূর্ণ কিছুই হতে চাই না।’
বছর ঘুরল। সোমদত্তা স্কুলে চাকরি পেল। নীলাঞ্জন তখন অন্য শহরে। চিঠি আসত মাঝে মাঝে, তারপর আসত না। চিঠি না আসা একদিনের বিষয় নয়। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়, যেমন একটি নদীর ধারা শুকিয়ে যায় দিনের পর দিন!প্রথমে সোমদত্তা অপেক্ষা করেছিল। তারপর ভুলে গিয়েছিল। মানুষ যাদের ভুলে যায়, তারা কখনওই পুরোপুরি হারায় না। বরং রয়ে যায় হাড়ের ভেতর কোনও জলের মতো। অদৃশ্য। কিন্তু সেঁধিয়ে থাকা।
রাতে স্কুলের খাতা ঠিক করতে গিয়ে সোমদত্তা এক মুহূর্তে দেখল, বেল্লা ক্লাসে লিখেছে, ‘ভালবাসা মানে ভয়হীনতা নয়, নিজের মধ্যে জায়গা তৈরি করা।’
সে চুপ করে রইল। মেয়েটা হয়ত জানে না, এই বাক্যটাই একদিন তার নিজের জীবনের রক্তের মধ্যে লেখা হয়েছিল। তখন নীলাঞ্জন তাকে বলেছিল, ‘আমি যদি একদিন না থাকি?’
সোমদত্তা বলেছিল, ‘থাকা না থাকাটা তো একই কথা। তুমি থাকলেও আমি একাই থাকব।’
নীলাঞ্জন হেসেছিল, একটা ঠাণ্ডা হাসি, যার ভেতরে ক্লান্তি ছিল। মায়া নয়। একদিন বিকেলে পোস্ট অফিস থেকে একটা চিঠি এল। প্রেরকের কোনও নাম নেই। খামের ভিতরে কেবল একটা ছোট নোট, ‘আমি যাচ্ছি। তুমি ভাল থেকো। তোমার চোখের শান্তি আমি নিতে পারি না।’ চিঠিটা হাতে নিয়ে সোমদত্তা হেসেছিল। যেভাবে মানুষ নিজের মৃত্যুর খবর শুনে হাসে। কারণ কিছুই অবাক করার মতো থাকে না।
আজ সেই চিঠিটা তার ডেস্কের ড্রয়ারে পড়ে আছে। ধুলো জমেছে, কিন্তু কালি এখনো শুকোয়নি। বেল্লার কবিতা পড়তে পড়তে সে মাঝে মাঝে ভাবে, নীলাঞ্জন যদি থাকত, এই মেয়েটাকে দেখে হয়ত সে অবাক হতো। কারণ যে মেয়েটি নিজের শরীর নিয়ে লজ্জায় ডুবে ছিল,সে এখন নিজের ভাষা খুঁজে পেয়েছে।যে সোমদত্তা একসময় ভালবাসার অভাবকে নিজের শিক্ষা ভেবেছিল, সে আজ অন্যের অভাব পূরণ করে বাঁচতে শিখেছে। রাতে একা বসে সে আয়নায় নিজের মুখ দেখে। চোখে ভাঁজ, ঠোঁটে ক্লান্তি, কপালে আলগা চুল। সে জানে, এখন তার আর কেউ নেই, তবু এই একাকীত্বকে সে ভালবেসে ফেলেছে। কারণ নীলাঞ্জনের চলে যাওয়া তাকে শূন্য করেনি, কিন্তু জায়গা দিয়েছে। সেই জায়গাতেই এখন শব্দ জন্ম নেয়, বেল্লার কবিতা জন্ম নেয়,
আর সে নিজে ধীরে ধীরে ফিরে পায় নিজের অচেনা মানবিকতা।
স্কুলে আজ সাহিত্যচর্চার সভা।ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বেল্লা কবিতা পড়ছে, গলায় এক অদ্ভুত শান্ত দৃঢ়তা, যেন সে আর ভয় পায় না, যেন তার শব্দগুলো এখন রক্তের মতো প্রবাহিত হয়।
সোমদত্তা শেষ বেঞ্চে বসে শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি শব্দ যেন তারই ভেতর থেকে আসছে।
‘আমার শরীর ভাঙে না, আমি ভাঙি,
তবু সকাল ফিরে আসে।’
বেল্লার কণ্ঠের এই লাইন শুনে সোমদত্তা মাথা নিচু করল। দুই ফোঁটা জল পড়ে গেল টেবিলে।
বৃষ্টি নয়, অশ্রু নয়, কেবল ভেতরের নরম একটা সরে যাওয়া। বাড়ি ফিরে সে ড্রয়ার খুলল। চিঠিটা বের করল আবার। পড়ল না, শুধু দেখল। তারপর খামে ভরে রাখল আগের জায়গায়।বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।জানালার ধারে বসে সে হঠাৎ বুঝল, মানুষ কাউকে হারালে আসলে কাউকেই হারায় না। হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো অন্য কারও ভিতর জন্ম নেয়, যেমন বেল্লার মধ্যে এখন একটু নীলাঞ্জন আছে, আর একটু তার নিজেরও। রাত নামল। একে একে শহরের বাতি নিভে গেল।সোমদত্তা খাতার ওপর হাত রাখল, বেল্লার লেখা পাতায় এখনও কালি শুকোয়নি।সে ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি ভালো থেকো, নীলাঞ্জন।
তুমি চলে যাওয়ার পর আমি যে মানুষ হয়েছি, সেই মানুষটা তোমারই তৈরি।’
ঘরে কোনও প্রতিধ্বনি ফিরল না। শুধু বাইরে, দূরের আকাশে বজ্রপাতের পর একরকম সাদা নরম আলো।
সেই আলোয় সোমদত্তার মুখ দেখা গেল, একেবারে স্থির, শীতল, কিন্তু আশ্চর্যভাবে জীবন্ত।তার চোখে তখন কোনো স্বপ্ন নেই, কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। শুধু একরকম শান্তি।যে শান্তি আসে অনেক দূর হাঁটার পর,
সব কিছু হারিয়ে ফেলার পর,যখন মানুষ অবশেষে নিজের সঙ্গে একা থাকতে শেখে।এটাই তার বেঁচে থাকা।
এটাই নীলাঞ্জনের উত্তর, দূর থেকে পাঠানো, নিরুত্তর কিন্তু চিরস্থায়ী। আর এই সোমদত্তা,যে একসময় ভালবাসা চেয়েছিল। এখন ভালবাসার উৎস। যে বেল্লাকে শেখায়, ভয় মানেই কবিতা।যে নিজের একাকীত্বে, একটি নতুন পৃথিবীর বীজ রোপণ করে নিঃশব্দে। 🍁 (চলবে)

🍂কবিতা
সুনীল ঘড়াই -এর একটি কবিতা

তোমার নামে
এই যে তোমার নামে চায়ের কাপ
রাতের টেবিলে ঠাণ্ডা হয়ে যায়
সবাই জানে, কিছু অপেক্ষা ধৈর্য মানে না…
রাস্তাগুলি কেমন যেন দীর্ঘ হয়ে উঠল
এখন আমি হাঁটছি নিজের ছায়ার ভেতর দিয়েই।
ভালবাসার দু’জন মানুষ, শুধু মানুষই নয়
আমি বুঝেছি, ভালবাসা মানে
একটি আস্ত ব্রহ্মাণ্ড মানচিত্রে শিল্প জেগে ওঠে
তোমার চোখে একদিন আমি ভবিষ্যৎ দেখেছি
এখন সেখানে কেবল সংবাদপত্রের মতো
ভাঁজ করা নীরবতা।
আমি বিশ্বাস করি, সত্যিকারের টান মিথ্যে হয় না…
প্রেম বেঁচে থাকে একটি নামের ভেতর।
রেহানা বীথি -এর তিনটি কবিতা

বিরোধ
তিনটি বিন্দুতে কেঁপে উঠছে অন্ধকার
কেঁপে উঠছে তিনটি রঙ
সবুজ লাল সাদা
কিংবা সবুজ সাদা লাল
কিংবা লাল সাদা সবুজ…
ভাবনায় খেলছে–
অন্ধকার, ঘুড়ির মতো
অন্ধকার, শিশুর মতো
অন্ধকার, বৃদ্ধের মতো
অন্ধকার, সর্বোপরি মৃত্যুর মতো
এখানে এসেই
কেন যে টেনে দিচ্ছি একটি চাদর
অন্ধকার, যৌবনের মতো নয়?
অথচ অন্ধকারেই তো পূর্ণ যুবতী হচ্ছে
শুভ্র পারিজাত

বেঁচে থাকার শিল্প
কিছুই দেখার নেই। তবু প্রহরের পর প্রহর কেটে যায় পাতা উল্টে উল্টেই। নিদ্রাদেবী চোখের দোপাটি ফুলে বিফল চুমু দিয়ে যায় বার বার।
আমার ঘুম দুঃস্বপ্নের মধ্য উঠোনে দাঁড়ানো।
মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে কামিনী ফুল।
হাত বাড়ালেও ধরতে পারছি না। ধরেও বা কী হবে? কাকে দেব ওই ফুল। কেউ নেই আমাদের। আমাদের কেউ থাকে না। আমরা দুঃখভূক। দুঃখ খেয়ে খেয়ে পাথরের ভার পাকস্থলীতে। এত যে ভার, তবুও দুঃখ ভেবে পাহাড় চূড়ার মেঘেদের ধরে ধরে খেয়ে ফেলি। তারপরও ক্ষিদে মরে না। ভারটুকু পাশে রেখে ক্ষিদে বেঁচে থাকে।

অন্ধত্বের সীমারেখা
দেখতে চেয়েছিলাম
এ-অন্ধত্ব আমাদেরকে কতদূর নিয়ে যায়
তারপর মনে হচ্ছে
অনন্তকাল চোখ পেতে আছি…
কোনও সীমারেখা কি চোখে পড়ছে তোমাদের?
আমার প্রশ্নে দৃষ্টিতে বিভ্রান্তি সবার
ভ্রূ-ভঙ্গিতে অচেনা জলছাপ
বললাম–
চলো, আমরা বরং আরেকটু অপেক্ষা করি
কিংবা, চক্ষু পরীক্ষা করে
অন্ধত্ব ঘোচাই
সোমনাথ আচার্য -এর একটি কবিতা

ভুল ঠিকানা
কে ধীরে ধীরে গিলে খায় অপেক্ষা?
একটি মুখ কাচের ওপর ভাসে।
শ্বাসে জমে অব্যক্ত বাক্য।
হাসির ভাঙা টান দেওয়ালে লেগে থাকে
ছুঁয়ে দিকেই সময় বড় যায়।
এখানে কিছুই নেই
শুধু ভুল ঠিকানায়
ফিরে আসার অভ্যাস।
শ্বেতা বসু চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

স্থিতি
যেমন নদীর পাশে বসে নদী হওয়া যায় না
তবু জলের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়।
দেখছ
শব্দ আসছে না শব্দ ধীরে বসে পড়ছে
পাতার ওপর রোদের মতো।
সব প্রেম তো উচ্চারণের নয়, কখনও দীর্ঘশ্বাস
আমরা দু’জনেই নেই
কিন্তু আলাদা করে টের পাই না।
তোমার হাতের কাছে
আমার হাত থাকলে পৃথিবী উচ্ছ্বল হয়
সময়ও কেমন নিজের গতি কমিয়ে দেয়।
আমি জানি, সব প্রেম
উচ্চারিত হয় না। কিছু প্রেম
দু’টি মানুষের মাঝখানে
একটু জায়গা রেখে চুপচাপ বেঁচে থাকে।
এই অপেক্ষা থাকাটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট
কারণ এখানেই আমি তোমাকে পাই
আর পৃথিবীকে একটু একটু সহনীয় মনে হয়।
হেমন্ত বিশ্বাস -এর একটি কবিতা

বাতাসের কাছে
হে অদৃশ্য বাতাস এখানে শব্দরা ভারী হয়ে গিয়েছে।
তুমি আমার হৃদয়টাকেও উড়িয়ে নিতে পারো না?
পাহাড়ের বুক ছুঁয়ে আসা হিল্লোল
উচ্চতা মানল না
এখানে একটি পাতাও প্রতিবাদের
যদি সে ঝরে পড়তে জানে…
হে আগামী দিনের গান, আমাকে ভাঙো
আমি যাতে আরও সত্য হয়ে উঠি।

🍁ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হল সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী
৪.
সুনয়নাদি
তিথি কফির মগটা হাতে নিয়ে বাইরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ডিসেম্বরের সকালের রূপ প্রত্যক্ষ করছিল। চারিদিক কুয়াশা যেন ধোঁয়া ছুটছে? কেউ কোথাও নেই। মাঝে মাঝে দু’চারটে সবজির ভ্যান বাজারের দিকে যাচ্ছে। কফি খেতে খেতে হঠাৎ কেন যেন মনে হল আজকের এই সকালবেলাটা কেমন একটু অনুভব করবে ।মনে পড়ে শীতকালের ভোরের গ্রামের দৃশ্যের কথা খুব ভোরবেলা উঠতে হত টিউশন পড়ে তারপর স্কুলে যেতে হবে। যার কারণে ভোরের বেলায় ঘাসের উপর যে কুয়াশা পরে তার ওপর যখন সূর্যের আলো এসে পড়ত, কী অপরূপ লাগত। শীতের দিনে উষ্ণতা অনুভব করত। উফ! মনে পড়ে মধু চাচার কথা কত ভোরবেলা এসে গাছ থেকে খেজুরের রস পেড়ে আমাদেরকে বলত, যা যা গ্লাস নিয়ে আয় রস খাবি তো আর আমরা সকলে মিলে কি সুন্দর গ্লাস নিয়ে এসে হাজির হতাম রস খাব বলে রস খেতাম আর পাশের বাড়ির বড় মা আগুন জ্বালতো আগুনে হাত পা সেকে শরীর গরম করে নিতাম।
শহরের চিত্রটা অন্যরকম সেই অনুভূতিটা আর নেই আজ অনুভূতিতে জড়িয়ে আছে শুধুই শহরের কৃত্রিমতা আর হাজারও ব্যস্ততায় হারিয়ে গেছে সকালের দিনগুলো উপভোগ করা।
এর মধ্যে কিউ কিউ আওয়াজ।
শোনো আমাদের ইলিশ মাছ আছে আর চিংড়ি মাছ আছে। আর আলাদা যে ইলিশ মাছ গোটাটা আছে ওটা আপাতত ফ্রীজে বরফের ভেতর ঢুকিয়ে দাও।
—ওটা কেটে আননি?
—না মাসি। ওটা ওর মায়ের জন্য যাবে।
—ও আচ্ছা আচ্ছা।
—আর শোনো, আলাদা প্যাকেটে মিষ্টি আছে ওইগুলো আলাদা প্যাকেট ধরেই ঘরে রেখে দাও ওগুলো নিয়ে যাব।
সকালের দৃশ্য উপভোগ করার ব্যাঘাত ঘটায় শ্বেতাম্বরী।
—কী হল? আজ তো তোমাকে সকাল সকাল আমি দুধ রুটি দিয়ে দিয়েছি। তাহলে আবার কেন কি চাই তোমার? লেজ নাড়তে নাড়তে মহারানী আসলেন। বুঝেছি বিস্কিট বিস্কিট চাই তোমার, তাই না। খুব নেশা বিস্কিট খাওয়ার। চলো।
কী সুন্দর কথা বোঝে, সঙ্গে সঙ্গে চলল। বিস্কিটের কৌটা থেকে পাঁচ-ছয়টা বিস্কিট ওকে দিল। কি সুন্দর চুপটি করে খাচ্ছে। আজকে তো মাসি সুনয়নাকে নিয়ে আসবে। ওদের চায়ের জলটা বসিয়ে দিই মাসি তো দুধ চা খায়। ও আবার কি চা খায় কে জানে। দু’জনার দুধ চায়ের জল তো নিই।
—মাম মাম মাম
—কী হয়েছে বুবুন সোনা?
ও বাবা তোমাকে আদর করছে শ্বেতাম্বরী।
—ওরে বাপরে কত আদর, কত আদর।
—বুবুন সোনা তুমি একটু আদর করে দাও পুচুকে।
কলিং বেলের আওয়াজ ‘হরি হরায়ে নম কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ যাদবায় মাধবায় নমঃ খেলায় নমঃ’
বুবুন সোনা মাসি দিদা এসে গিয়েছে তোমরা দু’জন খেলা কর আমি যাই দরজাটা খুলি কেমন।
—এসো মাসি।
—আয় রে সুনয়না।
—বৌমা এই যে সুনয়না এ তোমার কাজ করবে।
—এসো বসো তোমরা। চা খাও।
—তুমি দুধ চা খাও তো সুনয়নাদি?
আমাকে দিদি বলতে হবে না আমাকে নাম ধরে ডাকলেই হবে।
—বেশ তাই হবে।
—হ্যাঁ খাই।
—এই সুনয়না যদি তোর মনে হয় তুই লিকার খাবি বৌদিকে বলবি। —আমার জন্য শুধু দুধ চা হয়। বৌদিরা সব লিকার চা খায়।
—আচ্ছা তাহলে আমাকে লিকারই দেবেন।
বাহ ভালই হল তিথি মনে মনে ভাবল না হলে দু’বার চা বানাতে হয়। বাব্বা! গায়ের রং খাসা। ঠিক যেন পাকা ধানের রং চোখ দুটো ছোট, লম্বা চুল। নাকটা একটু নেপালি গোছের। খুব আস্তে আস্তে কথা বলে। কথাবার্তা তো শুনে মনে হচ্ছে খারাপ হবে না।
—এই সুনয়না, তুই আমার সঙ্গে আজকে কাজগুলো দেখে নে। তাই এরপরে যেদিন কাজে আসবি তোর সুবিধা হবে।
—মাসি ওকে বুঝিয়ে দাও আসার পর কি কি করতে হবে।
—শোন প্রথম যখন আসবি এসে তুই যদি মনে করিস আগে বাসনপত্র মেজে নিবি তো মেজে নিবি। আর যদি ঘরের কাজ করতে যাস তাহলে বৌদির একটা শাড়ি রাখা থাকবে বাথরুমে শাড়ি চেঞ্জ করে ঘরে ঢুকবি। ঢুকে ঘর দোর মুছে যা যা কাজ করার ঘরের করে নিবি। ঠিক আছে।
—তুমি এসে প্রথমে কি করো?
—আমার তো যখন যে রকম তখন সেরকম সেরকম কাজ করি। যদি দেখি বৌদির তাড়া আছে তাহলে আগে আমি ঘরগুলো মুছে নিই কাপড়টা
ছেড়ে। তারপর আবার বাসন মাজি। কাপড়টা আমি আবার পরে ধুয়ে রেখে দিয়ে যাই। কাপড় কাচা আছে। এবার তুই যেরম বুঝবি সেভাবে কাজ করবি। তবে হ্যাঁ ঘরের কাজ করতে হলে তোমাকে কাপড় ছেড়েই করতে হবে।
—ঠিক আছে।
—আর শোন, বৌমা কিন্তু খুব পরিষ্কার। কাজকম্ম একটু পরিষ্কার করে করবি।
—আচ্ছা ঠিক আছে।
তিথি দেখছে সবকিছুতেই ও আচ্ছা আচ্ছা বলছে অতি ভক্তি আবার চোরের লক্ষণ কি না কে জানে! কাজ না করা অব্দি বোঝা যাবে না, কি হবে।
—আচ্ছা সুনয়না তুমি কি অন্য কোথাও কাজ করো?
ওর হয়ে কাগজি মাসি উত্তর দিল, —এই প্রথম তোমার বাড়িতে।
আচ্ছা ক’টায় আসতে হবে?
এখন স্কুল ছুটি আছে, এখন তুই সাড়ে সাতটায় আসলেও হবে। কিন্তু স্কুল খুলে গেলে সাড়ে সাতটায় আসলে হবে না, কিন্তু আগে আসতে হবে সাড়ে ছটার মধ্যে ঢুকে যাবি।
—এত সকালে!
—হ্যাঁ, যার যেরকম তাকে তো সেভাবেই কাজ করতে হবে।
তিথি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, কথাটা ঠিক মনঃপুত হল না। আচ্ছা কাজগুলো দেখে নিলি তো, তাহলে তুই কী বাড়ি চলে যেতে পারবি? না আমাকে যেতে হবে তোর সাথে?
—কেন তুমি যাবে না?
—না না যাব কি রে আমার তো এখনও অনেক কাজ আছে। বৌদিকে হেল্প করব রান্নাবান্নায়। বুবুন সোনাকে একটু দেখব, ওর কিছু কাজ কর্ম আছে করব।ওকে গল্প শোনাব।
—ও আচ্ছা তাহলে আমি যাই।
—ঠিক আছে আয়। তাহলে ওই কথাই রইল কামাই করিস না যেন। আর বেশি কামাই টামাই করবি না বৌদির স্কুলে যেতে অসুবিধা হবে।
—আচ্ছা ।
—আসছি গো বৌদি।
—হ্যাঁ এসো।
—মাসি …
—হ্যাঁ। বলো বৌমা…
—আমি একটু না মায়ের কাছে যাব ছুটির দিন আছে মাকে একটু দেখে আসি কেমন। মায়ের শরীরটা খারাপ, তুমি তাহলে থেকো।
—কখন যাবে?
—এই তো তোমাদের ছেলে বাজার থেকে আসলেই বেরবো।
–বাবুসোনাকে নিয়ে যাবে?
—ভাবছি, ঠাণ্ডার মধ্যে নিয়ে যাব কিনা!
—তুমি ওকে সামলাতে পারবে?
—হ্যাঁ হ্যাঁ, কেন পারব না। যাও ঘুরে এসো।
—ঠিক আছে। শোনো, তুমি তো জানো কোথায় কী থাকে, খাবার দাবার নিয়ে নিও।
—বাবুসোনার কোন খাবার করতে হবে?
—আমি তো ওর ভাত তরকারি করেছি ওটা খাইয়ে দেবে আর বিকেলের দিকে ওকে একটু ম্যাগি করে দিও। ম্যাগি খুব একটা দিই না, কিন্তু ম্যাগিটা খুব পছন্দ করে আজকে যেহেতু থাকব না ম্যাগি দিয়ে ওকে মন ভোলাতে হবে।
—আচ্ছা ঠিক আছে।
—শোনো, তুমি জলখাবারটা খেয়ে নাও।
—আচ্ছা মাসি ও জল খাবার খাবে তো।
—সেরকম কথা বলে নেবে, জলখাবার হলে তো মাইনের ব্যাপারটা অন্যরকম হবে। আর জল খাবার না খেলে মাইনের ব্যাপারটা অন্যরকম হবে।
—আচ্ছা বেশ।
—আচ্ছা আমি স্নানে যাচ্ছি। তুমি রান্নাঘরটা একটু পরিষ্কার করে নিও।
—আচ্ছা, তুমি যাও না আমি করে নিচ্ছি।
আর বাবু সোনার স্নান?
—আমি দেখছি আমি স্নান করে উঠে যদি সময় থাকে তাহলে করিয়ে দেব, না হলে তুমি ওকে করিয়ে দিও।
—ঠিক আছে।
—আরে বাবা তুমি বালতি নিয়ে কোথায় চললে?
—দোতলার ঘরগুলো মুছে আসি।
শোনো, আজকের তোমাকে ঘর মুছতে হবে না তুমি বরং ঘরগুলো ঝাড় দিয়ে নাও। আর মা তো নেই অসুবিধা নেই।
—সে তো ঘর ঝাঁট দেওয়া হয়ে গেছে।
—ঠিক আছে তাহলে তুমি রান্নাঘর পরিষ্কার করে নাও।
—হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে রাম হরে রাম হরে হরে।
—দেখো কে আবার এসেছে।
—যাই। এই খুলছি। ও ছেলে এসেছে।
—তোমার বৌমার হয়নি?
—স্নানে গেছে।
—মাসি শ্বেতাম্বরীর মাংস আছে আর মাছের মাথা আছে ওগুলো ধুয়ে তাহলে তুমি ফ্রীজে ঢুকিয়ে দাও।
—হ্যাঁ দিচ্ছি।
—আর শোনো আমাদের ইলিশ মাছ আছে আর চিংড়ি মাছ আছে। আর আলাদা যে ইলিশ মাছ গোটাটা আছে ওটা আপাতত ফ্রীজে বরফের ভেতর ঢুকিয়ে দাও।
—ওটা কেটে আননি?
—না মাসি। ওটা ওর মায়ের জন্য যাবে।
—ও আচ্ছা আচ্ছা।
—আর শোনো, আলাদা প্যাকেটে মিষ্টি আছে ওইগুলো আলাদা প্যাকেট ধরেই ঘরে রেখে দাও ওগুলো নিয়ে যাব।
—আরে হল তোমার?
—এই তো হয়েই গেছে।
—গিজারে জল গরম আছে। আমি গিজার অন করে দিচ্ছি।
ঠিক আছে তুমি বেরও।
—এত তাড়া দাও না! বাথরুমে ঢুকলে বিরক্তি লেগে যায়। যখনই ঢুকবো, তখনই তোমার তাড়া।
মাথায় গামছা বেঁধে, গজরাতে গজরাতে বেরল তিথি।
—বাজার থেকে আম এনেছ?
—হ্যাঁ। এনেছি। কাঁচা আম পাওয়া খুব মুশকিল।
—আচ্ছা আমার জামা প্যান্টটা বের করে রেখে দাও।
এ কি হল শ্বেতাম্বরী তুমি এখন বিরক্ত করলে তো হবে না। ওই দেখো বুঝতে পেরে গেছে গো। বাড়ি থাকব না। মাসি, ওকে কিন্তু খাবারটা দিও।
—কিগো…
বাথরুমে নক করল।
—কলের জল জোরে পড়ছে। পবিত্রকে আবার তাড়া দিল।
—কি হল টা কি!
আরে একটু গরম ঠাণ্ডা জল মিশিয়ে দাও তো বালতি করে।
—কেন?
—বুবুনকে স্নানটা করিয়ে যাই।
—মাম মাম আমি স্নান করব না।
—না বাবা, মাসি দিদুনের অসুবিধা হবে, এসো, আমি করিয়ে রেখে যাই।
রৌদ্রে নিয়ে গিয়ে বুবুনকে স্নান করিয়ে দিল পাশে গিয়ে শ্বেতাম্বরী বসে রইল।
—আমার খাবারটা দাও।
—হ্যাঁ দিই।
—মাসি বুবুনকে নিয়ে যাও তো।
রান্নাঘর থেকে খাবারটা এনে পবিত্রকে দিল।
—হ্যাঁ গো, ছানা পেয়েছ?
—হঠাৎ করে বললে হয় বলো, এত সকালবেলা ছানা তো হয় না। সন্ধ্যেবেলা ছানা হয়।
—আসলে মা ছানা খেতে ভালবাসে তো!
—সে তো বুঝতে পারলাম। কিন্তু আমার কিছু করার নেই।
নাও নাও, রেডি হও তাড়াতাড়ি। আবার ফেরার আছে যা ঠাণ্ডা।
ওই দেখো ফোন করছে।
—তোমার ফোনটা কী ভাইব্রেশনে রেখেছ?
—হ্যাঁ।
—কে ফোন করছে?
–তোমার dad… ধরো ফোনটা।
—হ্যালো…
—তোরা বেরোসনি
—এই তো বেরচ্ছি।
—দেখ তোর মা কী বলছে?
—হ্যাঁ মা বলো…
—বলছি, ছেলেকে নিয়ে আসবি না?
—না মা। এত ঠাণ্ডার মধ্যে আর ওকে নিচ্ছি না।
—কতদিন দেখিনা ওকে।
—ঠিক আছে আমি পরে গিয়ে একদিন তোমাকে দেখিয়ে নিয়ে আসব একটু ঠাণ্ডাটা কমুক।
—আচ্ছা তাড়াতাড়ি চলে আয়। এখানে এসে খাবি কিন্তু।
—কেন মা তোমার শরীর খারাপ…
—তাতে কী হয়েছে? পবিত্র আমার হাতের মাংস খেতে কি ভালবাসে
তাড়াতাড়ি আয়।
—ঠিক আছে।
—মায়ের এত শরীর খারাপ তবু তোমার জন্য রান্না করছে। আমি কি করবো বলো?
—উনি বললেন, আমি কি না করতে পারি?
—হ্যাঁ সেইতো। ঠিক আছে, নাও নাও রেডি হয়ে গেছি বেরোও।
ও বাবা ওই দেখো আমার সালোয়ারের ধরে টানছে
পুচু, কি হয়েছে বাবা? আমি তো দিদুনকে দেখতে যাচ্ছি। চলে আসব। এই যে মাসি দুদুন আছে, তোমার খেয়াল রাখবে ঠিক আছে?
—ও বাবা ছাড়ছে না।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে পবিত্র চেঁচাতে শুরু করল,
—এসো গো।
—কী করে যে যাই!
মাসি দুটো বিস্কিট নিয়ে আসো তো দাও ওকে।
এই নাও বিকু বিকু ।
লেজ নাড়তে নাড়তে চলে আসলো।
—মাসি তাহলে আসছি। শোনো, অচেনা লোক আসলে দরজা খুলবে না তুমি দেখে নেবে সেই বুঝে কাজ করবে তুমি তো জানোই। সাবধানে থেকো কিছু অসুবিধে হলে ফোন করো।
—বসেছ ঠিক করে?
হ্যাঁ ভাল করে ঢেকে নাও, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা কিন্তু বাইকে যাচ্ছ!
—আর আমাকে ধরে বসবে।
—কালকে ১ তারিখ কাল থেকে সুনয়নাদি আসবে।
—সে আবার কে?
—আমাদের নতুন কাজের মহিলা।
—ও আচ্ছা।
পবিত্র বাইক স্টার্ট করল তারপর গান ধরল, ‘জিন্দেগি এক সফর হে…’
বাপের বাড়ি যাওয়ার আনন্দে মনের আকাশটা যেন অনেক বেশি পরিষ্কার হয়ে যায় যেন শরতের নীল আকাশে ভেজা তুলোর মতো মেঘের আনাগোনা আর তাতে পানসিতে চেপে মন দুয়ারে পাড়ি দেওয়া। 🍁(চলবে)

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।




