sneezing good or bad omen in India | শুভ কাজের আগে হাঁচি অশুভ না কি শুভ সংকেত? শাস্ত্র, সংস্কার আর বিজ্ঞানের দ্বন্দ্বে সত্যের খোঁজ

SHARE:

শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ঘর থেকে বেরনোর ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎ হাঁচি বাঙালি সমাজে এমন অভিজ্ঞতা নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কেউ সঙ্গে সঙ্গে থমকে যান, কেউ জল খেয়ে আবার যাত্রা শুরু করেন, কেউ আবার বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়ে এগিয়ে যান। তবে প্রশ্ন একটাই, শুভ কাজের আগে হাঁচি দেওয়া কী সত্যিই অশুভ? নাকি এটি নিছকই একটি শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ঢুকে পড়তে হয় শাস্ত্র, লোকসংস্কার ও আধুনিক বিজ্ঞানের জটিল অথচ কৌতূহলোদ্দীপক জগতে।

আরও পড়ুন : Olive Oil for Skin Care | সরাসরি নাকি মিশিয়ে? ত্বকের যত্নে অলিভ অয়েল ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি জানলে চমকপ্রদ ফল মিলবেই

ভারতীয় লোকসংস্কারে হাঁচি বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘শকুন’ বা লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত। শকুন শাস্ত্র (Shakun Shastra) অনুযায়ী, হাঁচি শুধু একটি শারীরিক ক্রিয়া নয়, বরং ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহনকারী একধরনের সংকেত। তবে এই শাস্ত্র স্পষ্টভাবে বলে, সব হাঁচিই অশুভ নয়। হাঁচির সময়, সংখ্যা, পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকার ওপরেই নির্ভর করে তার ফলাফল। শাস্ত্র অনুযায়ী, কোনও শুভ বা গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেরনোর সময় সামনে কেউ হাঁচি দিলে তা সাধারণত বাধার লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এটি ইঙ্গিত দেয় যে পরিকল্পিত কাজে বিলম্ব, সমস্যা বা ব্যর্থতা আসতে পারে। তাই প্রাচীনকাল থেকেই পরামর্শ দেওয়া হয়, এই পরিস্থিতিতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা, জল পান করা কিংবা দু’মিনিট থেমে আবার যাত্রা শুরু করা শ্রেয়। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই সামান্য বিরতিই অশুভ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।

তবে হাঁচির অশুভ দিক শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। শকুন শাস্ত্র অনুযায়ী, কোনও বিতণ্ডা বা তর্কের মাঝখানে হাঁচি পড়লে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, সেই মুহূর্তে কথা বন্ধ না করলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে যেতে পারে। আবার গৃহস্থালির কাজের ক্ষেত্রেও হাঁচিকে লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। যেমন, কোনো মহিলা দুধ ফোটানোর সময় হাঁচি দিলে তা পরিবারের কারও অসুস্থতার পূর্বাভাস বলে মনে করা হয়। যদিও আধুনিক দৃষ্টিতে এই বিশ্বাসগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দুর্বল, তবু যুগের পর যুগ ধরে এই সংস্কার সমাজে প্রোথিত হয়ে রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, হাঁচি মানেই যে অশুভ শাস্ত্র তা কিন্তু একেবারেই মানে না। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে হাঁচিকে অত্যন্ত শুভ লক্ষণ হিসেবেও দেখা হয়। শকুন শাস্ত্র বলছে, কোনও শুভ বা মাঙ্গলিক কাজের উদ্দেশ্যে বেরনোর সময় পরপর দু’বার হাঁচি দেওয়া অত্যন্ত শুভ। এটি সেই কাজের সাফল্য এবং আকস্মিক ধনলাভের সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে। আবার ওষুধ খাওয়ার সময় যদি কেউ হাঁচি দেয়, লোকবিশ্বাস অনুযায়ী ধরে নেওয়া হয় যে রোগী খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

বাজারে কেনাকাটার সময় হাঁচি দেওয়াও শাস্ত্র মতে শুভ। বলা হয়, সেই মুহূর্তে যে জিনিসটি কেনা হচ্ছে, ভবিষ্যতে তা থেকে সুখ, লাভ বা উপকার পাওয়া যাবে। তাই অনেক জায়গায় দেখা যায়, কেউ বাজারে হাঁচি দিলে আশপাশের মানুষ হেসে বলেন, ‘ভাল জিনিস নিচ্ছেন নিশ্চয়ই!’ এই বিশ্বাসগুলিই প্রমাণ করে, হাঁচি নিয়ে ভারতীয় সংস্কারের দৃষ্টিভঙ্গি একপাক্ষিক নয়; বরং বহুমাত্রিক। তবে প্রশ্ন ওঠে, এই সব ব্যাখ্যার বাস্তব ভিত্তি কতটা? এখানেই প্রবেশ করে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান। চিকিৎসকদের মতে, হাঁচি হল শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। নাকের ভেতরে ধুলো, ধোঁয়া, জীবাণু বা অ্যালার্জেন প্রবেশ করলে স্নায়ুতন্ত্র ফুসফুস থেকে সজোরে বাতাস বের করে দেয়, যাতে সেই ক্ষতিকারক কণাগুলো শরীরের বাইরে চলে যায়। অর্থাৎ, হাঁচি কোনও অশুভ সংকেত নয়, বরং শরীরের আত্মরক্ষার একটি জরুরি প্রক্রিয়া।

বিজ্ঞান বলছে, হাঁচির সঙ্গে ভবিষ্যৎ বা সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্যের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। তবে মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, বিশ্বাসের প্রভাব মানবমনে গভীর। কেউ যদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে হাঁচি অশুভ, তবে সেই বিশ্বাস থেকেই তাঁর মনে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে, যা বাস্তব সিদ্ধান্ত ও আচরণকে প্রভাবিত করে। আবার কেউ যদি হাঁচিকে শুভ লক্ষণ মনে করেন, তবে তাঁর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যেতে পারে, যা কাজের সাফল্যেও ভূমিকা রাখে। এই জায়গাতেই শাস্ত্র ও বিজ্ঞানের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সেতুবন্ধন তৈরি হয়। শাস্ত্র হাঁচিকে ব্যাখ্যা করে প্রতীকী অর্থে, আর বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে শারীরিক প্রক্রিয়ায়। দু’টির লক্ষ্য আলাদা হলেও, দু’টিই মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। উল্লেখ্য যে, শুভ কাজের আগে হাঁচি দেওয়া মানেই অশুভ, এই ধারণা একেবারেই চূড়ান্ত নয়। সময়, পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপরেই এর অর্থ নির্ভর করে। তবে একটি বিষয়ে শাস্ত্র ও বিজ্ঞান দু’পক্ষই একমত, যদি বারবার হাঁচি হয়, সঙ্গে নাক দিয়ে জল পড়া, শ্বাসকষ্ট বা জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে তা অবহেলা না করে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ সংস্কার যতই থাকুক, স্বাস্থ্যের বিকল্প নেই।

ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Botox trend, Koel Mallick, beauty standards | বোটক্সের ভিড়ে স্বাভাবিকতার কথা : সৌন্দর্যের তৈরি মাপকাঠিকে প্রশ্ন করলেন কোয়েল মল্লিক

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন