সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে নতুন ইতিহাস গড়ার হাতছানি ছিল। কোচ হিসেবে প্রথম মরসুমেই প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসকে (Pretoria Capitals) ফাইনালে তুলে এনে চমক দিয়েছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly)। কিন্তু শেষ হাসি হাসতে পারলেন না ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। ফাইনালের মঞ্চে ডেওয়াল্ড ব্রেভিসের (Dewald Brevis) দুরন্ত শতরান সত্ত্বেও ট্রফি হাতছাড়া হল প্রিটোরিয়ার। দক্ষিণ আফ্রিকার টি-টোয়েন্টি লিগ এসএ২০ (SA20)-এ টানা তৃতীয় বার চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস গড়ল আইপিএলের (IPL) আর এক ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি সানরাইজার্স হায়দরাবাদের মালিকানাধীন দল সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপ (Sunrisers Eastern Cape)।
এই ফাইনাল শুধু একটি ম্যাচ ছিল না, ছিল একাধিক গল্পের সমাহার। এক দিকে কোচ সৌরভের নতুন ইনিংস, অন্যদিকে সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপের ট্রফিজয়ের হ্যাটট্রিকের হাতছানি। শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা, ঠান্ডা মাথা আর চাপ সামলানোর ক্ষমতাই পার্থক্য গড়ে দিল। ফাইনালে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালস। শুরুটা কিন্তু একেবারেই স্বস্তির ছিল না। সানরাইজার্সের পেস আক্রমণে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় সৌরভের দল। বিশেষ করে মার্কো জানসেন (Marco Jansen) যেন একাই ভেঙে দেন প্রিটোরিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ। চার ওভারে মাত্র ১০ রান দিয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন এই বাঁহাতি পেসার। তাঁর দাপটে একের পর এক ব্যাটার সাজঘরে ফিরতে থাকেন।
এই ধসের মধ্যেও একাই দাঁড়িয়ে লড়াই চালান ডেওয়াল্ড ব্রেভিস। দক্ষিণ আফ্রিকার তরুণ তারকা যেন ফাইনালের মঞ্চে নিজের জাত চিনিয়ে দিলেন। ৫৬ বলে ১০১ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলেন তিনি। তাঁর ব্যাট থেকে আসে একের পর এক বাউন্ডারি ও ছক্কা। স্ট্রাইক রেট ছিল ১৮০-এরও বেশি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ব্রেভিস ছাড়া আর কেউ বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ব্রাইস পারসন্স (Bryce Parsons) করেন ৩০ রান, যা ছাড়া উল্লেখ করার মতো অবদান ছিল না অন্য কারও। ২০ ওভার শেষে ৭ উইকেট হারিয়ে প্রিটোরিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ১৫৮ রান। ফাইনালের জন্য এই রান যে খুব একটা নিরাপদ নয়, তা তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই সহজ পথে এগোয়নি সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপও। প্রিটোরিয়ার বোলাররা চেষ্টা করেছিলেন ম্যাচে ফেরার। মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট পড়ে যাওয়ায় এক সময় মনে হচ্ছিল, শেষ ওভার পর্যন্ত গড়াতে পারে ম্যাচ। চাপ বাড়ছিল দুই দলের উপরেই। দর্শকদের উত্তেজনাও তখন তুঙ্গে। ঠিক সেই সময় দায়িত্ব নেন ম্যাথু ব্রিৎজ়কি (Matthew Breetzke) এবং অধিনায়ক ট্রিস্টান স্টাবস (Tristan Stubbs)। দু’জনেই ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলাতে থাকেন। এক দিকে ব্রিৎজ়কি খেলেন দায়িত্বশীল ইনিংস, অন্য দিকে স্টাবস ধীরে ধীরে হাত খুলতে শুরু করেন। দু’জনের জুটিতেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। ব্রিৎজ়কি অপরাজিত থাকেন ৬৮ রানে, আর অধিনায়ক স্টাবস ৬৩ রানে ম্যাচ শেষ করেন। শেষ ওভারে দরকার ছিল ৯ রান। নাটকীয়তার জন্য প্রস্তুত ছিল ফাইনাল। কিন্তু নাটক জমতে দিলেন না ট্রিস্টান স্টাবস। শেষ ওভারের প্রথম দুই বলেই দু’টি বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচের ইতি টেনে দেন তিনি। চার বল বাকি থাকতেই ৬ উইকেটে জয় নিশ্চিত করে সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপ। মাঠে তখন উল্লাস, গ্যালারিতে আনন্দোচ্ছ্বাস, আর প্রিটোরিয়ার ডাগআউটে নীরব হতাশা।
এই নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগে তৃতীয় বার চ্যাম্পিয়ন হল সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপ। টানা তিন বার ট্রফি জিতে তারা নিজেদের আধিপত্য আরও এক বার প্রমাণ করল। অন্য দিকে প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসের জন্য এটি যেন দুঃখের পুনরাবৃত্তি। দু’বার এসএ২০ ফাইনালে উঠেও দু’বারই রানার্স আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হল তাদের। কিন্তু, ট্রফি না জিতলেও সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের কোচিং যাত্রা যে ব্যর্থ বলা যাবে না, তা মানছেন ক্রিকেট মহলের অনেকেই। প্রথম বার কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে দলকে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া নিঃসন্দেহে বড় কৃতিত্ব। প্রিটোরিয়ার খেলায় শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা আর লড়াই করার মানসিকতা স্পষ্ট ছিল গোটা টুর্নামেন্ট জুড়েই। ফাইনালে একটুর জন্য ট্রফি হাতছাড়া হলেও সৌরভ দেখিয়ে দিলেন, কোচ হিসেবেও তিনি দীর্ঘ রেসের ঘোড়া। এসএ২০-এর এই ফাইনাল আবারও প্রমাণ করল, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এক জন তারকার শতরানও দলকে জেতাতে নাও পারে, যদি বাকি অংশ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন না আসে। একই সঙ্গে বোঝাল, চাপের মুহূর্তে অধিনায়কত্ব আর জুটির গুরুত্ব কতটা। ব্রেভিসের ইনিংস স্মরণীয় হয়ে থাকবে, কিন্তু ট্রফি উঠল স্টাবসদের হাতেই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sourav Ganguly : সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়: এক লড়াকু অধিনায়কের কাহিনি




