সংবেদন শীল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : নতুন বছরের শুরুতেই যে তিথিটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল থাকে, তা হল মকর সংক্রান্তি (Makar Sankranti 2026)। প্রতি বছরই প্রশ্ন ওঠে, মকর সংক্রান্তি ১৪ জানুয়ারি, না কি ১৫ জানুয়ারি? ২০২৬ সালে এই নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ধর্মানুরাগীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকার (Bisuddha Siddhanta Panjika) জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব বলছে, ২০২৬ সালে মকর সংক্রান্তি পড়ছে ১৪ জানুয়ারি, বুধবার, অর্থাৎ ২৯ পৌষে। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, প্রতিটি মাসের শেষ দিনকে সংক্রান্তি বলা হয়। তবে জ্যোতিষশাস্ত্রের ভাষায় সংক্রান্তি মানে শুধুই মাসের শেষ নয়, সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন। এই রাশি পরিবর্তনের মুহূর্তকেই প্রকৃত সংক্রান্তি ধরা হয়। পৌষ মাসের শেষে সূর্য ধনু রাশি ত্যাগ করে দশম রাশি মকরে প্রবেশ করে। এই কারণেই পৌষ সংক্রান্তি ‘মকর সংক্রান্তি’ নামে পরিচিত।
জ্যোতির্বিদ্যার নিরিখে, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ভারতীয় সময় বেলা ৩টা ৭ মিনিটে রবি (সূর্য) মকর রাশিতে প্রবেশ করবে। এই নির্দিষ্ট মুহূর্ত থেকেই সূর্যের উত্তরায়ণ স্পষ্টভাবে শুরু হয় বলে ধরা হয়। উত্তরায়ণকালকে শাস্ত্রে অত্যন্ত পুণ্যকাল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, এই সময় দেবলোকের দ্বার উন্মুক্ত থাকে এবং মানুষের সাধনা ও দানের ফল বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে, মকর সংক্রান্তির গুরুত্ব শুধু সূর্যের রাশি পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরাণ মতে, এই তিথিতেই গঙ্গাদেবীর (Ganga) আবির্ভাব ঘটে। সেই কারণে মকর সংক্রান্তিকে গঙ্গাদেবীর আবির্ভাব তিথিও বলা হয়। এই উপলক্ষেই প্রতি বছর গঙ্গাসাগরে (Gangasagar) বসে ঐতিহ্যবাহী সাগরমেলা। লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী সাগরসঙ্গমে স্নান করে ব্রহ্মার (Brahma) মানসপুত্র কপিলমুনির (Kapil Muni / Kapila Muni) আশ্রমে পুজো দেন। শাস্ত্র মতে, ‘সাগরে স্নান, কপিলে দান’ করলে জীবনের পাপক্ষয় হয় এবং মোক্ষলাভের পথ প্রশস্ত হয়।
কিন্তু, সকলের পক্ষে গঙ্গাসাগর যাত্রা সম্ভব নয়। শাস্ত্র এই ক্ষেত্রেও বিকল্প পথ দেখিয়েছে। গঙ্গাসাগরে যেতে না পারলে ভক্তিভরে গঙ্গা বা নিকটবর্তী যে কোনও পবিত্র নদীতে স্নান করলেও সমান পুণ্যলাভ হয় বলে ধর্মবিশ্বাস। অনেকেই বাড়িতে জলভরা পাত্রে গঙ্গাজল মিশিয়ে স্নান করেন অথবা সূর্যের উদ্দেশে অর্ঘ্য প্রদান করেন। ২০২৬ সালের মকর সংক্রান্তিতে পুণ্যস্নান ও ধর্মীয় আচার পালনের জন্য একাধিক শুভ যোগ রয়েছে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, এই দিনে অমৃতযোগ ও মাহেন্দ্রযোগ বিশেষভাবে ফলদায়ী বলে বিবেচিত হচ্ছে। অমৃতযোগের সময়সূচী অনুযায়ী, সকাল ৭টা ৬ মিনিটের মধ্যে প্রথম পুণ্যক্ষণ রয়েছে। এরপর আবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিট থেকে ৮টা ৩২ মিনিট পর্যন্ত অমৃতযোগ কার্যকর। তৃতীয় দফায় সকাল ১০টা ৪০ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিট পর্যন্ত এই শুভ সময় পাওয়া যাবে। সন্ধ্যায় ৬টা থেকে ৬টা ৫২ মিনিট পর্যন্ত এবং পুনরায় রাত ৮টা ৪০ মিনিট থেকে রাত ৩টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত অমৃতযোগ বলবৎ থাকবে। মাহেন্দ্রযোগও এই দিনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সকাল ৭টা ৭ মিনিট থেকে ৭টা ৪৯ মিনিট পর্যন্ত এবং দুপুর ১টা ৩৩ মিনিট থেকে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত মাহেন্দ্রযোগ রয়েছে। জ্যোতিষ মতে, এই সময় পুণ্যস্নান, দানধ্যান ও সূর্যোপাসনা করলে সৌভাগ্য বৃদ্ধি পায়।
মকর সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে বাংলার ঘরে ঘরে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। পিঠে-পুলির গন্ধে মুখরিত হয়ে ওঠে গ্রাম থেকে শহর। চালের গুঁড়ো, গুড়, নারকেল দিয়ে তৈরি নানান রকমের পিঠে এই দিনের বিশেষ আকর্ষণ। বহু পরিবারে বাস্তুপুজো করা হয় এবং নতুন ফসলের জন্য প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। কোথাও কোথাও টুসুপুজোর মতো আঞ্চলিক উৎসবও পালিত হয়।
কিন্তু, ২০২৬ সালে মকর সংক্রান্তি নিয়ে বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকার মতে, ১৪ জানুয়ারিই প্রকৃত মকর সংক্রান্তি। সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হবে পুণ্যকাল। এই দিনে সঠিক সময়ে স্নান, দান ও সূর্যোপাসনা করলে ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনে শুভ ফল লাভ করা সম্ভব।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Gangasagar Holy Dip Security | গঙ্গাসাগর পুণ্যস্নান ২০২৬: অগ্নিকাণ্ডের পর কড়া নিরাপত্তা, প্রশাসনের বাড়তি সতর্কতা




