সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পটনা: আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার যুগে দাঁড়িয়ে এমন ঘটনা যেন বিশ্বাস করাই কঠিন। কিন্তু বাস্তবেই তা ঘটেছে বিহারের (Bihar) ভাগলপুর (Bhagalpur) জেলায়। সন্তান প্রসবের সময় একজন যুবতী প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসকের মারাত্মক গাফিলতিতে। অভিযোগ, কোনও প্রশিক্ষিত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ নয়, একজন হাতুড়ে চিকিৎসক ইউটিউব (YouTube) দেখে অস্ত্রোপচার করছিলেন। সেই অস্ত্রোপচারের সময়ই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় প্রসূতির। যদিও সদ্যোজাত শিশুটি বেঁচে রয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে ভাগলপুর জেলার কাহালগাঁও (Kahalgaon) এলাকায় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। সূত্রের খবর, মৃত প্রসূতি ঝাড়খণ্ডের (Jharkhand) বাসিন্দা। স্বামী পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে অন্য রাজ্যে কাজ করেন। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তিনি মায়ের বাড়িতেই ছিলেন। প্রসব যন্ত্রণা শুরু হলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে নিকটবর্তী ওই বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যান। সেখানেই শুরু হয় মর্মান্তিক ঘটনার। পরিবারের অভিযোগ, ক্লিনিকে কোনও যোগ্য চিকিৎসক বা আধুনিক চিকিৎসা পরিকাঠামো ছিল না। তথাকথিত চিকিৎসক প্রসূতিকে দেখেই জানান, ‘এখনই অস্ত্রোপচার করতে হবে’। আতঙ্কিত পরিবারের সম্মতি নিয়ে তিনি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার শুরু করেন। কিন্তু অস্ত্রোপচারের সময় দেখা যায়, ওই চিকিৎসক মোবাইলে ইউটিউব ভিডিও দেখে দেখে অপারেশন করছেন। পরিবারের দাবি, ‘চিকিৎসকের হাতে কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি সম্পূর্ণভাবে ইউটিউবের উপর নির্ভর করে অস্ত্রোপচার শুরু করেন’।
এই অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিক অস্ত্রোপচারের ফল ভয়াবহ হয়। অস্ত্রোপচারের মধ্যেই প্রসূতির অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো কোনও জরুরি ব্যবস্থা, রক্তের বন্দোবস্ত বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। কিছুক্ষণের মধ্যেই অস্ত্রোপচার টেবিলেই মৃত্যু হয় ওই যুবতীর। তবে সৌভাগ্যবশত, সদ্যোজাত শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়।অভিযোগ আরও গুরুতর। প্রসূতির মৃত্যুর পরও হাতুড়ে চিকিৎসক নিজের দোষ স্বীকার করেননি। বরং পরিবারের সদস্যদের বলা হয়, ‘রোগীর অবস্থা খারাপ, দ্রুত অন্য হাসপাতালে নিয়ে যান’। এই কথা বলেই ক্লিনিক বন্ধ করে অভিযুক্ত চিকিৎসক ও তাঁর সহযোগীরা পালিয়ে যান বলে অভিযোগ। পরিবারের এক সদস্যের কথায়, ‘যদি শুরুতেই সত্যি কথা বলা হত বা সময়মতো রেফার করা হত, তাহলে হয়তো মেয়েটাকে বাঁচানো যেত’।
প্রসূতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ পরিবারের সদস্যরা মৃতদেহ রাস্তায় রেখে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও এই বিক্ষোভে সামিল হন। তাঁদের অভিযোগ, ওই বেসরকারি ক্লিনিকে আগেও এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাহালগাঁও থানার (Kahalgaon Police Station) পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় এবং তদন্ত শুরু করে।স্থানীয়দের দাবি, অবৈধভাবে চলা এই ধরনের ক্লিনিকগুলির জন্যই বারবার সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। একজন স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, ‘এই ক্লিনিকে আগেও রোগীর অবস্থা খারাপ হয়েছে। কিন্তু গরিব মানুষ বাধ্য হয়ে এখানেই চিকিৎসা করায়। প্রশাসন যদি আগেই ব্যবস্থা নিত, আজ এই প্রাণহানি হত না’। বিক্ষোভকারীরা অভিযুক্ত হাতুড়ে চিকিৎসকের দ্রুত গ্রেফতার এবং ক্লিনিক স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে (Statewide) ফের প্রশ্ন উঠেছে বেসরকারি নার্সিংহোম ও ক্লিনিকগুলির মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় কীভাবে হাতুড়ে চিকিৎসকরা দিনের পর দিন দাপটের সঙ্গে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন চিকিৎসক মহলও। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ইউটিউব বা অনলাইন ভিডিও কোনওভাবেই চিকিৎসা শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না। প্রশিক্ষণহীন হাতে অস্ত্রোপচার মানেই মৃত্যুকে ডেকে আনা’। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর বিহার স্বাস্থ্য দফতর (Bihar Health Department) -এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অবৈধ ক্লিনিক চিহ্নিতকরণ, নিয়মিত পরিদর্শন এবং লাইসেন্সবিহীন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হওয়ার বার্তা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা, জটিল প্রসব বা অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র স্বীকৃত হাসপাতাল ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের উপরই ভরসা করা উচিত। উল্লেখ্য, এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। ইউটিউব দেখে অস্ত্রোপচারের মতো ঘটনা প্রমাণ করে দেয়, সামান্য গাফিলতি আর প্রশাসনিক উদাসীনতা কীভাবে একটি তরতাজা প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। এখন দেখার, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কত দ্রুত এবং কতটা কঠোর পদক্ষেপ নেয়।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Nawada witch hunting, Bihar mob lynching | ডাইনি অপবাদে রক্তাক্ত বিহার, শিশুর অসুস্থতার অজুহাতে একই পরিবারের তিন মহিলার উপর নৃশংস হামলা




