সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ইন্দোর : মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর (Indore) শহরের ভগীরথপুরা (Bhagirathpura) এলাকায় দূষিত জল পান করে একের পর এক অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনিক পরিসংখ্যান বনাম স্থানীয় দাবির সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে। সরকারি হিসাবে যেখানে মৃত্যুসংখ্যা সাত বা ছয় বলে জানানো হচ্ছে, সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, এই সংখ্যাটি তার চেয়ে অনেক বেশি। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই বুধবার মুখ খুললেন মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব (Mohan Yadav)। তাঁর বক্তব্য, ‘একটি প্রাণহানিও আমাদের কাছে অসীম যন্ত্রণার। তাই আমরা সংখ্যার খাতায় ঢুকি না; মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের অগ্রাধিকার।’ মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটি জীবন হারানো মানেই আমাদের কাছে অপূরণীয় ক্ষতি। সে কারণেই আমরা পরিসংখ্যান নিয়ে তর্কে যাই না। প্রশাসন তার নিজস্ব নিয়ম মেনে কাজ করে, এটা আলাদা বিষয়। সাধারণত যেখানে ময়নাতদন্ত হয়েছে, সেগুলিকেই সরকারি নথিতে ধরা হয়।’ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি একদিকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কথা স্বীকার করেছেন, অন্যদিকে মানবিক অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন।
তবে ঘটনাকে ঘিরে ধোঁয়াশা কাটছে না। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসনের তরফে ১৮ জন মৃতের পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দেওয়া হয়। অথচ একই সঙ্গে সরকারি নথিতে মৃত্যুসংখ্যা সাতেই আটকে রাখা হয়েছে। এই দ্বৈত বার্তাই প্রশ্ন তুলছে, তবে প্রকৃত সংখ্যা কত? স্বাস্থ্য দপ্তরের উচ্চ পদস্থ একজন আধিকারিক জানিয়েছেন, তাঁদের হিসাবে এখনও পর্যন্ত সাতটি মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। আবার অন্য সূত্রে ছয় জনের মৃত্যুর কথাও বলা হচ্ছে। ইন্দোরের মেয়র পুষ্যমিত্র ভরগব (Pushyamitra Bhargava) গত ২ জানুয়ারি জানান, দূষিত জলজনিত ডায়রিয়ার প্রকোপে অন্তত ১০ জন রোগীর মৃত্যুর খবর তাঁর কাছে এসেছে। উল্লেখযোগ্য ভাবে, ইন্দোরকে ‘দেশের সবচেয়ে পরিষ্কার শহর’ হিসেবে বারবার পুরস্কৃত করা হয়েছে। সেই শহরেই এমন জলদূষণের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই চাঞ্চল্য ও ক্ষোভ তৈরি করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি আরও ভয়াবহ। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ডায়রিয়া ও জলদূষণের কারণে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ছয় মাসের এক শিশুও রয়েছে। স্থানীয় এক বাসিন্দার কথায়, ‘সংখ্যা নিয়ে টানাটানি করে কী লাভ? আমাদের পাড়ায় একের পর এক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ আর ফিরলেন না।’ মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব এই প্রসঙ্গে আরও বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। মানুষ যেই হোন না কেন, ত্রাণ ও সহায়তার প্রশ্নে আমরা সংখ্যার দিকে তাকাব না। আমরা সবার পাশে থাকব।’ তাঁর এই মন্তব্যে প্রশাসনের মানবিক অবস্থান তুলে ধরা হলেও, একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন উঠছে।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এ ধরনের ঘটনায় মৃত্যুসংখ্যা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত-ভিত্তিক পদ্ধতি প্রশাসনিক ভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও, বাস্তব পরিস্থিতি অনেক সময় তার বাইরে থাকে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, ‘ডায়রিয়া বা জলবাহিত রোগে অনেক সময় মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নথিভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সরকারি হিসাব ও বাস্তব চিত্রের মধ্যে ফারাক থেকে যায়।’ ইন্দোর প্রশাসন জানিয়েছে, ভগীরথপুরা এলাকায় জল সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু হয়েছে। পাইপলাইনে লিকেজ বা নিকাশির জল মিশে যাওয়ার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি আক্রান্ত পরিবারগুলিকে চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কাজ চলছে।
কিন্তু, বিরোধী দলগুলি এই ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের অভিযোগ, ‘সংখ্যা কম দেখিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’ যদিও সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, ‘যাঁরা প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁদের প্রত্যেকের পাশে প্রশাসন থাকবে।’ তবে, এই ঘটনার সামাজিক প্রভাবও কম নয়। ‘ক্লিন সিটি’ তকমা পাওয়া ইন্দোরে জলদূষণের মতো ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। জল সরবরাহের গুণমান, নিয়মিত পরীক্ষা ও পরিকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। উল্লেখ যে, ইন্দোরের জলদূষণ কাণ্ড প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য নীতি ও মানবিক দায়বদ্ধতার এক বড় পরীক্ষা। মুখ্যমন্ত্রীর ‘সংখ্যার ঊর্ধ্বে মানুষ’ বার্তা স্বস্তি দিলেও, প্রকৃত মৃত্যুসংখ্যা ও দায় নির্ধারণের প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত। আগামী দিনে তদন্তের ফল ও প্রশাসনিক পদক্ষেপই বলবে, এই ঘটিনা থেকে কতটা শিক্ষা নিতে পারল রাজ্য।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Indian Railways non AC coaches, Amrit Bharat Express trains | সাধারণ যাত্রীদের জন্য স্বস্তি : নন-এসি কোচে রেকর্ড উৎপাদন, ৩০টি অমৃত ভারত ট্রেনে জোরদার সাশ্রয়ী যাত্রা, কীভাবে জেনে নিন




