সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ভারতের সভ্যতাগত ইতিহাস ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যে এক ঐতিহাসিক অধ্যায় রচিত হতে চলেছে ৩ জানুয়ারি ২০২৬। দীর্ঘ ১২৭ বছর পর স্বদেশে প্রত্যাবর্তিত পিপরাওয়ার (Piprahwa) পবিত্র বুদ্ধাবশেষ সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে চলেছে সংস্কৃতি মন্ত্রক (Ministry of Culture, Government of India)। রাজধানীর রাই পিথোরা সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই বিশেষ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। সকাল ১১টায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, কূটনীতিক, বৌদ্ধ ভিক্ষু, গবেষক ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। সংস্কৃতি মন্ত্রকের উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে পিপরাওয়া অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত বুদ্ধের পবিত্র অস্থিধাতু, রত্নখচিত ধাতু-পাত্র, অস্থিকলশ এবং মূল্যবান প্রত্নবস্তু একত্রে প্রদর্শিত হবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই সমস্ত অবশেষ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক স্তরে জটিল আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ১৮৯৮ সালের পর এই প্রথম এত বৃহৎ পরিসরে পিপরাওয়ার বুদ্ধাবশেষ একত্রে প্রদর্শিত হতে চলেছে।
‘আলো ও পদ্ম: প্রজ্ঞাবানের পবিত্র অবশেষ’ (Light and Lotus: Relics of the Enlightened One) শীর্ষক এই প্রদর্শনীতে বুদ্ধের জীবন, দর্শন ও বৌদ্ধ শিল্পকলার বিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সময়সীমার ৮০টিরও বেশি মূল্যবান শিল্পকর্ম ও প্রত্নবস্তু এখানে স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীন মূর্তি, পাণ্ডুলিপি, থাংকা চিত্র, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সামগ্রী এবং বিরল প্রত্ননিদর্শন। সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীন বিভিন্ন জাতীয় সংগ্রহশালা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষিত নিদর্শন এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে একত্রিত হয়েছে। এই প্রদর্শনীর তাৎপর্য শুধু ঐতিহাসিক নয়, আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক দিক থেকেও গভীর। বুদ্ধের পবিত্র অবশেষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অশেষ শ্রদ্ধার বস্তু। একই সঙ্গে এটি ভারতের সভ্যতাগত উত্তরাধিকার ও বিশ্বমানবতার প্রতি অহিংসা, করুণা ও প্রজ্ঞার বার্তা বহন করে। সংস্কৃতি মন্ত্রকের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ‘এই প্রদর্শনী শুধু অতীতের নিদর্শন নয়, এটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বুদ্ধের আদর্শকে নতুন করে তুলে ধরার এক প্রয়াস।’
পিপরাওয়ার বুদ্ধাবশেষের আবিষ্কার হয়েছিল ১৮৯৮ সালে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্গত কাপিলাবস্তু অঞ্চলের প্রাচীন স্তূপে খননকার্য চালিয়ে এই পবিত্র অবশেষ উদ্ধার করেন প্রত্নতত্ত্ববিদ উইলিয়াম ক্ল্যাক্সটন পেপ্পে (William Claxton Peppé)। আবিষ্কারের পর বুদ্ধাবশেষের একাংশ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিতরণ করা হয়। এর একটি অংশ সিয়ামের রাজাকে (বর্তমান থাইল্যান্ড) উপহার দেওয়া হয়েছিল, একটি অংশ ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বাকি অংশ কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরে (Indian Museum, Kolkata) সংরক্ষিত থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে পেপ্পে পরিবারের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা বুদ্ধাবশেষ অবশেষে ২০২৫ সালে ভারতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রকের সক্রিয় হস্তক্ষেপ, আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সমর্থন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (Public-Private Partnership) মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ হংকংয়ের সোথেবিজ় (Sotheby’s Hong Kong) নিলামেও সংশ্লিষ্ট বুদ্ধাবশেষের বিক্রি বন্ধ করা হয়।
প্রদর্শনীতে এক বিশেষ আকর্ষণ হল সেই অখণ্ড পাথরের সিন্দুক, যার মধ্যে মূলত রত্নখচিত অবশেষ ও অস্থিধাতু সংরক্ষিত ছিল। এছাড়া ১৯৭২ সালে পিপরাওয়া অঞ্চলে পরিচালিত খননকার্য থেকে প্রাপ্ত ধনসম্পদ, কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরের সংগ্রহ, এবং পেপ্পে পরিবারের কাছ থেকে সদ্য প্রত্যাবর্তিত শিল্পবস্তুও একত্রে প্রদর্শিত হবে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এই সমন্বিত প্রদর্শনী বৌদ্ধ প্রত্নতত্ত্ব গবেষণার ক্ষেত্রেও এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। এই আয়োজন ভারতের বৌদ্ধ ধর্মের জন্মভূমি হিসেবে ভূমিকাকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করবে। একই সঙ্গে বিশ্বদরবারে ভারতের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের অবস্থানকে নতুন করে তুলে ধরবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-এর (Narendra Modi) নেতৃত্বে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতের হারিয়ে যাওয়া প্রত্নসম্পদ ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, পিপরাওয়ার বুদ্ধাবশেষ তার অন্যতম সাফল্য। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ৬৪২টি প্রাচীন শিল্পকর্ম ও প্রত্নবস্তু বিদেশ থেকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক প্রতিনিধি, পূজ্য বৌদ্ধ ভিক্ষু, জ্যেষ্ঠ সরকারি আধিকারিক, গবেষক, ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ এবং শিল্প-সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্টজনেরা। শিক্ষার্থী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্যও এই প্রদর্শনী বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, পিপরাওয়ার পবিত্র বুদ্ধাবশেষের এই প্রদর্শনী শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং ভারতের সভ্যতাগত আত্মপরিচয়, আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার এবং বিশ্বমানবতার প্রতি দায়বদ্ধতার এক শক্তিশালী প্রকাশ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India–New Zealand Free Trade Agreement | মাত্র ন’মাসেই ঐতিহাসিক সাফল্য, ভারত–নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে স্বাগত জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




