তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁরা সময়কে অতিক্রম করে প্রজন্মের পর প্রজন্মের আবেগে বেঁচে থাকেন। রাজেশ খান্না (Rajesh Khanna) সেই বিরল নামগুলির অন্যতম। মঙ্গলবার তাঁর ৮৩তম জন্মবার্ষিকীতে গোটা ভারতীয় সিনেমা জগৎ স্মরণ করল বলিউডের প্রথম সত্যিকারের ‘সুপারস্টার’-কে। রুপোলি পর্দায় তাঁর উপস্থিতি, সংলাপ বলার ভঙ্গি, চোখের ভাষা এবং আবেগের গভীরতা আজও দর্শকদের মনে একই রকম আলোড়ন তোলে।
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে রাজেশ খান্না যে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেছিলেন, তা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এখনও অনন্য। একের পর এক একক নায়ক হিসেবে হিট ছবির রেকর্ড তাঁকে এনে দিয়েছিল অতুলনীয় খ্যাতি। তাঁর নামের আগে ‘সুপারস্টার’ শব্দটি বসে গিয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। সেই সময় দর্শকদের কাছে সিনেমা মানেই ছিল রাজেশ খান্না, আর রাজেশ খান্না মানেই ছিল আবেগ, প্রেম এবং সংবেদনশীলতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। বস্তুত, রাজেশ খান্নার অভিনয়জীবনের সূচনা হয়েছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি। তবে প্রকৃত সাফল্য আসে ‘আরাধনা’ (Aradhana) ছবির মাধ্যমে। এই ছবিতে তাঁর অভিনয়, গান এবং চরিত্রের আবেগ দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। ‘মেরে সপনোঁ কি রানি’ গানটি আজও তাঁর নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ‘আরাধনা’ -এর সাফল্যের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। এরপর একের পর এক কালজয়ী ছবিতে অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে। ‘আনন্দ’ (Anand) ছবিতে তাঁর চরিত্র আজও দর্শকদের চোখে জল এনে দেয়। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনকে উদ্যাপন করার যে বার্তা তিনি দিয়েছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। অমিতাভ বচ্চন (Amitabh Bachchan) -এর সঙ্গে তাঁর অভিনীত এই ছবি মানবিকতার গভীর পাঠ হিসেবে চিহ্নিত।
‘অমর প্রেম’ (Amar Prem), ‘হাতি মেরে সাথী’ (Haathi Mere Saathi), ‘কাটি পতঙ্গ’ (Kati Patang), ‘বাওয়ার্চি’ (Bawarchi) -এর মতো ছবিতে রাজেশ খান্না বারবার প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধুমাত্র রোম্যান্টিক নায়কই নন, বহুমাত্রিক অভিনেতাও। কখনও প্রেমিক, কখনও অসহায় মানুষ, কখনও পরিবারের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়, প্রতিটি চরিত্রেই তিনি নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। রাজেশ খান্নার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর সংবেদনশীলতা। তিনি চোখের ভাষায় কথা বলতেন। অতিনাটকীয়তা নয় সূক্ষ্ম আবেগ দিয়েই তিনি দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছে যেতেন। তাঁর কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং নীরব অভিনয়, সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক সম্পূর্ণ অভিনেতা।
শুধু অভিনয় নয়, রাজেশ খান্নার ব্যক্তিত্বও ছিল চুম্বকসম। তাঁর স্টাইল, চুলের ছাঁট, হাসি সবকিছুই তরুণ প্রজন্ম অনুকরণ করত। সেই সময় নারী অনুরাগীদের উন্মাদনা ছিল অভাবনীয়। চিঠিতে লিপস্টিকের ছাপ, রক্ত দিয়ে লেখা চিঠি এসব কাহিনি আজও জীবন্ত হয়ে আছে। এই উন্মাদনাই তাঁকে ‘সুপারস্টার’ অভিধায় ভূষিত করেছিল। তবে সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর জীবনে ছিল উত্থান-পতন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের রুচি বদলেছে, সিনেমার ধরণ বদলেছে। নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের আগমনে রাজেশ খান্নার কেরিয়ারে কিছুটা ভাটা পড়ে। কিন্তু তাতেও তাঁর জনপ্রিয়তা পুরোপুরি ম্লান হয়নি। বরং চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তিনি নিজের জায়গা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনেও রাজেশ খান্না ছিলেন চর্চার কেন্দ্রে। অভিনেত্রী ডিম্পল কাপাডিয়া (Dimple Kapadia) -এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ, পারিবারিক টানাপড়েন, সবকিছুই সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছিল। তবুও, পর্দার বাইরে যা-ই ঘটুক না কেন, পর্দায় রাজেশ খান্না মানেই ছিল এক অনন্য আকর্ষণ।
রাজেশ খান্নার প্রয়াণের বহু বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর চলচ্চিত্র, গান এবং সংলাপ এখনও সমান জনপ্রিয়। তাঁর ছবি সম্প্রচারিত হলে দর্শক বসে পড়েন। নতুন প্রজন্মের দর্শকরাও ইউটিউব ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাঁর কাজ আবিষ্কার করছে নতুন করে। এটাই তাঁর উত্তরাধিকার। তাঁর ৮৩তম জন্মবার্ষিকীতে রাজেশ খান্নাকে স্মরণ করা মানে শুধুমাত্র এক অভিনেতাকে স্মরণ করা নয়, বরং ভারতীয় সিনেমার একটি স্বর্ণযুগকে ফিরে দেখা। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী, আবেগকে শিল্পে রূপান্তর করেছিলেন। তাঁর অভিনয় আমাদের শিখিয়েছে, নায়ক মানেই শুধু শক্তি নয়, দুর্বলতাও হতে পারে শক্তির উৎস। আসলে, রাজেশ খান্না সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ চিরন্তন নাম। বলিউডের প্রথম সুপারস্টার হিসেবে তাঁর যে উত্তরাধিকার, তা আগামী দিনেও ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। ৮৩ বছরে দাঁড়িয়ে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে একটাই কথা বলা যায়, রাজেশ খান্না ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের হৃদয়ে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Mexico Trade | ‘উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত’ : মেক্সিকোর ৫০% শুল্ক সিদ্ধান্তে কি বাণিজ্য যুদ্ধের পথে ভারত-লাতিন আমেরিকা সম্পর্ক?




