সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: বাংলার রাজনীতিতে বাম-কংগ্রেস জোট ঘিরে যে জল্পনা দীর্ঘ দিন ধরে চলছিল, তাতে প্রায় ইতি টানলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার (Subhankar Sarkar)। স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কংগ্রেস একলা চলতেই প্রস্তুত এবং সেই পথেই এগোতে চায়। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, জোট নিয়ে যাঁরা আশাবাদী ছিলেন, তাঁদের জন্য এই বার্তা নিঃসন্দেহে নিরাশার। শনিবার কলকাতায় এক সাংবাদিক বৈঠকে শুভঙ্কর সরকার বলেন, ‘মানুষ চাইছে আমরা একলা লড়াই করি। এখন কংগ্রেসের যে সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে, তাতে একলা চলা সম্ভব। এই অবস্থান আমরা অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি বা এআইসিসি-কে (AICC) জানিয়ে দিয়েছি।’ তাঁর সংযোজন, ‘যখন কোনও রাজনৈতিক দল দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তারা অন্য কোনও শক্তিকে ধরে এগোতে চায়। কিন্তু কংগ্রেস এখন আগের তুলনায় শক্তিশালী। তাই এই মুহূর্তে একলা চলাই আমাদের পক্ষে যুক্তিসংগত।’
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির এই মন্তব্য স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের সঙ্গে জোট করেই লড়েছিল কংগ্রেস। সেই জোটে শরিক ছিল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফ (Indian Secular Front, ISF)। ওই নির্বাচনের মাধ্যমেই রাজ্য রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেছিল আইএসএফ, এবং ভাঙড় কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন নওসাদ সিদ্দিকী (Naushad Siddiqui)। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জোটের ভিত যে আলগা হয়ে এসেছে, তা শুভঙ্করের বক্তব্যেই স্পষ্ট। শুভঙ্কর সরকারের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষের মূল সমস্যা থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ‘এখন রাজ্য সরকার হোক বা কেন্দ্রীয় সরকার, দু’পক্ষই ধর্মীয় মেরুকরণের পথে হাঁটছে। কারণ মানুষের প্রকৃত চাহিদা, চাকরি, খাদ্য, বাসস্থান, আইনশৃঙ্খলা, এই সব বিষয় তুচ্ছ করে দেওয়া হয়েছে। কোনও সরকারই এই চাহিদাগুলি পূরণ করতে পারছে না। তাই মানুষের নজর ঘোরানোর জন্য সংকীর্ণ ধর্মীয় মেরুকরণকে হাতিয়ার করা হচ্ছে।’
এই বক্তব্যের মাধ্যমে শুভঙ্কর সরকার এক দিকে যেমন শাসক তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) এবং কেন্দ্রের বিজেপিকে (Bharatiya Janata Party) একসঙ্গে আক্রমণ করেছেন, তেমনই নিজের দলের আদর্শিক অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন। কংগ্রেস যে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রশ্নে কোনও আপস করতে রাজি নয়, তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। এদিকে বামফ্রন্ট এবং আইএসএফের মধ্যে জোট আলোচনা নতুন করে শুরু হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে জল্পনা আরও বেড়েছিল। সম্প্রতি ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকী বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুকে (Biman Bose) চিঠি দিয়ে জোটের প্রস্তাব দেন বলে জানা যায়। সূত্রের খবর, শনিবার আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে বাম নেতৃত্ব এবং আইএসএফের মধ্যে বৈঠকও হয়েছে। সেখানে আসন সমঝোতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ দাবি করছে।
সেই বৈঠকে কংগ্রেসের কোনও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এই অনুপস্থিতি ঘিরেই জোর চর্চা শুরু হয়, তবে কি কংগ্রেস আদৌ এই জোটে থাকতে আগ্রহী? শনিবার শুভঙ্কর সরকারের বক্তব্য সেই প্রশ্নেরই স্পষ্ট উত্তর দিল। তাঁর কথায়, ‘কংগ্রেস এখন নিজের দু’পায়ে দাঁড়িয়ে চলতে পারে।’ অর্থাৎ বাম বা অন্য কোনও দলের ভরসায় না গিয়ে নিজেদের সংগঠন এবং জনসমর্থনের উপরই ভর করে লড়াই করতে চায় কংগ্রেস। যদিও রাজনীতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে কিছু নেই, সেই কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন শুভঙ্কর। তিনি বলেছেন, ‘রাজনীতির সমীকরণ সব সময়ই সম্ভাবনাময়। পরিস্থিতি অনুযায়ী সমীকরণ বদলাতেই পারে।’ এই বক্তব্যে ভবিষ্যতের জন্য একটি দরজা খোলা রাখলেও, বর্তমান অবস্থানে কংগ্রেস যে জোট রাজনীতিতে আগ্রহী নয়, তা স্পষ্ট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান কংগ্রেসের কাছে এক ধরনের কৌশলগত বার্তাও। দীর্ঘ দিন ধরেই বাংলায় কংগ্রেস দুর্বল, এই ধারণা প্রচলিত ছিল। শুভঙ্করের বক্তব্যে সেই ধারণাকে ভাঙার চেষ্টা স্পষ্ট। তাঁর দাবি অনুযায়ী, কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি আগের তুলনায় বেড়েছে এবং দল নতুন করে নিজেদের জায়গা ফিরে পেতে মরিয়া। অন্য দিকে, বামফ্রন্ট ও আইএসএফ যদি আলাদা জোট গড়ে তোলে, তবে বিরোধী ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে তৃণমূল বা বিজেপির সুবিধা হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে কংগ্রেস নেতৃত্বের মতে, একলা লড়াই করেই মানুষের প্রকৃত সমস্যাগুলিকে সামনে আনা সম্ভব। উল্লেখ্য, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির এই ঘোষণা বাংলার রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিল। জোট রাজনীতির অধ্যায় আপাতত বন্ধ রেখে কংগ্রেস যে নিজের শক্তি যাচাই করতে চাইছে, তা স্পষ্ট। আগামী দিনে এই কৌশল কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India–New Zealand Free Trade Agreement | মাত্র ন’মাসেই ঐতিহাসিক সাফল্য, ভারত–নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে স্বাগত জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী


