সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ দীঘা : বাড়ির দেওয়ালে নতুন ক্যালেন্ডার ঝোলানোর আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। বছরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে উৎসবের আমেজে মেতেছে গোটা রাজ্য। সেই আবহেই পর্যটকদের ঢেউ আছড়ে পড়েছে পূর্ব মেদিনীপুরের সৈকতশহর দীঘায় (Digha)। বড়দিন (Christmas) পেরতেই ভিড় বাড়ছিল, তবে শুক্রবার সকাল থেকে মানুষের ঢল নামল ওল্ড দীঘা (Old Digha) ও নিউ দীঘায় (New Digha)। আগাম বুকিংয়ের জেরে এখন হোটেল পেতে তিলধারণের জায়গা নেই। হোটেল মালিক থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, এ বার দিঘা পর্যটনের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড তৈরি হতে চলেছে।
দীঘা-শঙ্করপুর হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (Digha-Shankarpur Hoteliers Association) যুগ্ম সম্পাদক বিপ্রদাস চট্টোপাধ্যায় (Biprodas Chattopadhyay) জানান, ‘২৬ ডিসেম্বর থেকে আগামী ১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি হোটেলের বুকিং সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। হাতে গোনা যে ক’টি ঘর ফাঁকা আছে, সেগুলির জন্য পর্যটকদের মধ্যে কার্যত প্রতিযোগিতা চলছে।’ তাঁর দাবি, ভিড় হলেও পরিষেবা দিতে কোনও সমস্যা হবে না। বিপ্রদাস বাবুর কথায়, ‘পর্যটকদের সুবিধার্থে এখন ওল্ড ও নিউ দীঘা মিলিয়ে প্রায় ৮০০টি হোটেল পরিষেবা দিচ্ছে। গত কয়েক বছরে একাধিক আধুনিক, ঝাঁ-চকচকে হোটেল তৈরি হয়েছে। ফলে আগের মতো শেষ মুহূর্তে এসে ঘর না পাওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমেছে।’ তিনি আরও জানান, শুক্রবার সকাল থেকেই দিঘার রাস্তায় দূরপাল্লার বাস ও প্রাইভেট গাড়ির লম্বা সারি চোখে পড়েছে। পাশাপাশি ট্রেনেও প্রচুর পর্যটক দিঘামুখো হয়েছেন।
বর্ষবরণের আগে দীঘায় ভিড় নতুন কিছু নয়। তবে এ বছর ভিড় বাড়ার পিছনে অতিরিক্ত কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্তরা। এক দিকে, বর্ষশেষ উপলক্ষে বিশেষ উৎসবের আয়োজন, অন্য দিকে গত আট মাসে দীঘার পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত হয়েছে নতুন আকর্ষণ, জগন্নাথ ধাম (Jagannath Dham)। এই মন্দিরকেন্দ্রিক পর্যটনও দীঘায় ভিড় বাড়াতে বড় ভূমিকা নিয়েছে।
জানা গিয়েছে, দীঘা-শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদ (Digha-Shankarpur Development Authority) এবং হোটেল মালিক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এ বার সৈকতশহরে আয়োজন করা হয়েছে ‘বিচ ফেস্টিভ্যাল’ (Beach Festival)। বড়দিন থেকেই শহরজুড়ে উৎসবের রোশনাই চোখে পড়ছে। ওল্ড ও নিউ দীঘার হোটেলগুলির পাশাপাশি আলোকমালায় সেজে উঠেছে জগন্নাথ ধাম চত্বর ও সংলগ্ন রাস্তাঘাট। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ থাকছে ৩১ ডিসেম্বরের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। উদ্যোক্তাদের দাবি, ওই রাতে ‘অলিম্পিকের কায়দায়’ প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে বিশাল বাজি প্রদর্শনী হবে। অভিনবত্ব আনতে সমুদ্রের বুকে একটি ভাসমান জেটি থেকে পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন বাজি’র (Green Fireworks) প্রদর্শনীর পরিকল্পনা করা হয়েছে। শব্দ ও দূষণ কমাতে এই ধরনের বাজির ব্যবহারই বিশেষ চমক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ফলে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটকদের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
অন্য দিকে, উপচে পড়া ভিড় সামলাতে প্রশাসনও প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মিতুনকুমার দে (Mithunkumar De) জানিয়েছেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য দীঘা জুড়ে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে।’ তাঁর কথায়, যানজট এড়াতে বড় বাস ও ভারী গাড়িগুলিকে ওল্ড দীঘায় না ঢুকিয়ে বাইপাস দিয়ে নিউ দিঘার দিকে পাঠানো হচ্ছে। সাতটি পৃথক পার্কিং জোন নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে সমস্যা না হয়। শুধু যান চলাচল নয়, সৈকত এলাকায় নিরাপত্তা বাড়াতেও অতিরিক্ত পুলিশ ও সিভিক ভলান্টিয়ার মোতায়েন করা হয়েছে। সমুদ্র-স্নানে যাতে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য লাইফগার্ডদেরও সতর্ক করা হয়েছে। প্রশাসনের এক আধিকারিকের কথায়, ‘উৎসবের আনন্দ যেন কোনও অপ্রীতিকর ঘটনায় মাটি না হয়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।’
ভিড়ের সুযোগ নিয়ে পর্যটকদের ঠকানো না হয়, সে দিকেও কড়া নজর রাখা হচ্ছে। বিপ্রদাস চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘দীঘার কোনও হোটেল যাতে অতিরিক্ত ভাড়া না নেয়, সে বিষয়ে আমরা বিশেষ ভাবে সতর্ক।’ এ জন্য নির্ধারিত হোটেল ভাড়ার তালিকা-সহ একটি পুস্তিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘কোনও হোটেল বা ব্যবসায়ী বাড়তি টাকা নিলে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কয়েক জন অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য দিঘার বদনাম হোক, তা আমরা কোনও ভাবেই হতে দেব না।’
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে প্রশাসনও। জেলা প্রশাসনের এক কর্তা জানান, পর্যটকদের কাছ থেকে কোনও অভিযোগ এলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হেল্পলাইন নম্বর চালু রাখা হয়েছে, যাতে পর্যটকেরা দ্রুত সাহায্য পান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বর্ষশেষে দিঘা যেন উৎসবের রঙে আরও ঝলমলে। সমুদ্রের গর্জন, আলোর রোশনাই, বিচ ফেস্টিভ্যাল, জগন্নাথ ধাম, সব কিছু মিলিয়ে পর্যটকদের কাছে দীঘা এখন শুধু সমুদ্রসৈকত নয়, তা এক পূর্ণাঙ্গ উৎসবের গন্তব্য। ব্যবসায়ী মহলের আশা, এই পর্যটক-জোয়ার নতুন বছরের প্রথম দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে এবং দীঘা পর্যটনের ইতিহাসে এ বছর এক নতুন অধ্যায় লিখবে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Manali | মানালি: পাহাড়ি রূপকথার পাতায় ছুটি কাটানোর ঠিকানা



