সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: অপরাধ যত ভয়ঙ্করই হোক, ছেলের দিকে তাকিয়ে অনেক সময় মায়েরা দোষ দেখতে পান না, এই সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতাকেই কঠোর ভাষায় সামনে আনল পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট (Punjab and Haryana High Court)। পাঁচ বছরের এক শিশুকন্যাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত যুবককে ৩০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৩০ লক্ষ টাকা জরিমানার নির্দেশ দিয়ে আদালত মন্তব্য করেছে, ‘সোনা ছেলে’ ধারণা বহু ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
২০১৮ সালের নৃশংস এই ঘটনায় সম্প্রতি সাজা ঘোষণা করেছে বিচারপতি অনুপ চিটকারা (Justice Anup Chitkara) ও বিচারপতি সুখবিন্দর কৌর-এর (Justice Sukhvinder Kaur) ডিভিশন বেঞ্চ। রায়ে একদিকে যেমন অপরাধীর কঠোর শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে, নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত অভিযুক্তের মায়ের সাজা মকুব করা হয়েছে। তবে সেই সঙ্গে আদালত সমাজকে একটি গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, মাতৃত্বের অন্ধ আবেগ কি অপরাধকে আড়াল করার ঢাল হয়ে উঠছে? আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিশেষ করে মায়েদের একটি বড় অংশ তাঁদের ছেলেকে সব সময় ‘নির্দোষ’ ভাবতে অভ্যস্ত। ছেলে যে কোনও অপরাধ করলেও সেই বাস্তবতা মানতে তাঁরা প্রস্তুত নন। বিচারপতিরা মন্তব্য করেন, ‘এই প্রবণতা নতুন নয়। এটি আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীর ভাবে প্রোথিত।’
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৩১ মে এই হৃদয়বিদারক ঘটনার সূত্রপাত। অভিযুক্ত যুবক নিহত শিশুটির বাবার অধীনে কাজ করতেন। সেই সূত্রেই শিশুটির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। ঘটনার দিন তিনি কৌশলে পাঁচ বছরের শিশুটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। তখন তাঁর মা বাড়ির বাইরে কাজে গিয়েছিলেন। ফাঁকা বাড়ির সুযোগ নিয়ে অভিযুক্ত শিশুটিকে ধর্ষণ করে এবং পরে রান্নাঘরের ছুরি দিয়ে কুপিয়ে নির্মম ভাবে খুন করে।অপরাধের পরেও থেমে থাকেনি নিষ্ঠুরতা। শিশুটির দেহ চালের একটি বড় কৌটোয় লুকিয়ে রাখা হয়, যাতে কেউ সহজে বুঝতে না পারে। কিছুক্ষণ পরে অভিযুক্তের মা বাড়ি ফেরেন। এদিকে, শিশুটি নিখোঁজ হওয়ায় উদ্বিগ্ন পরিবার ও গ্রামবাসীরা খোঁজ শুরু করেন। সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে তাঁরা অভিযুক্তের বাড়িতে পৌঁছন। সেখানেই ঘটে নাটকীয় ঘটনা। গ্রামবাসীরা বাড়ির ভিতরে ঢুকতে চাইলে অভিযুক্তের মা কার্যত ঢাল হয়ে দাঁড়ান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমার ছেলে নির্দোষ।’ তাঁর দাবি ছিল, ওই বাড়িতে কোনও শিশু নেই এবং তাঁর ছেলে এমন কাজ করতেই পারে না। কিন্তু সন্দেহ আরও গভীর হওয়ায় গ্রামবাসীরা জোর করে ঘরে ঢোকেন। তখনই চালের কৌটো থেকে উদ্ধার হয় শিশুটির ক্ষতবিক্ষত দেহ। এই ঘটনার পর অভিযুক্ত যুবকের পাশাপাশি তাঁর মায়ের বিরুদ্ধেও একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়। অপহরণ, ধর্ষণ, খুন, প্রমাণ লোপাট এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয় দু’জনের বিরুদ্ধেই। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে নিম্ন আদালত অভিযুক্ত যুবককে মৃত্যুদণ্ড এবং তাঁর মাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। সেই রায়কেই চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে আবেদন করেন মা ও ছেলে। দীর্ঘ শুনানির পর উচ্চ আদালত অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে অভিযুক্তকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পাশাপাশি, ৩০ লক্ষ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়, যা নিহত শিশুটির পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু, অভিযুক্তের মায়ের ক্ষেত্রে আদালত ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নেয়। হাই কোর্ট জানায়, তাঁর আচরণ নৈতিক ভাবে প্রশ্নযোগ্য হলেও আইনগত ভাবে তিনি মূল অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। আদালতের মতে, তাঁর ‘একমাত্র দোষ’ ছিল নিজের ‘সোনা ছেলে’কে রক্ষা করার চেষ্টা করে যাওয়া। সেই কারণেই তাঁর সাজা মকুব করা হয়েছে। অন্যদিকে, সাজা মকুব করলেও আদালত তাঁর ভূমিকাকে কোনও ভাবেই সমর্থন করেনি। বিচারপতিরা বলেন, ‘যখন একজন মা জানতে পারেন যে তাঁর ছেলে একটি পাঁচ বছরের শিশুকন্যাকে ধর্ষণ ও খুন করেছে, তখন পুলিশের কাছে খবর দেওয়া বা ন্যায়বিচারের পথে সহযোগিতা করাই হওয়া উচিত ছিল প্রথম দায়িত্ব।’ কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা, ছেলেকে বাঁচানোর তাগিদে সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় সমাজের আয়নায় নিজেদের মুখ দেখার সুযোগ। ‘সোনা ছেলে’ সংস্কৃতি কী ভাবে অপরাধকে আড়াল করে, তার স্পষ্ট উদাহরণ এই পর্যবেক্ষণ। একই সঙ্গে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ-খুনের মতো অপরাধে কঠোর শাস্তির প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে তুলে ধরেছে আদালত। উল্লেখ্য, এই রায় ভবিষ্যতে এমন মামলাগুলিতে সামাজিক মনোভাব বিচার ব্যবস্থার আলোচনায় আরও বেশি গুরুত্ব পাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India MEA reaction, Bangladesh mob lynching | বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন থামছে না, দীপু দাসের পর অমৃত মণ্ডল হত্যায় কড়া বার্তা ভারতের : ‘অবিরাম হিংসা গভীর উদ্বেগের’




