সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ আমতা : হাওড়া জেলার আমতা-জয়পুর এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে গভীর শোকের ছায়া নেমে এল। রবিবার গভীর রাতে জয়পুর থানার অন্তর্গত ঝামটিয়া অঞ্চলের সাউড়িয়া গ্রামের একটি বাড়িতে আচমকাই আগুন লেগে যায়। ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয় একই পরিবারের চার জনের। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন এক নবম শ্রেণির ছাত্রীও। এক রাতের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল একটি গোটা পরিবার। কী ভাবে এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড ঘটল, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ও দমকল বিভাগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতেরা হলেন ভারু দলুই (Varu Dolui, ৮০), তাঁর ছেলে দুধকুমার দলুই (Dudhkumar Dolui, ৪৫), পুত্রবধূ রত্না দলুই (Ratna Dolui, ৩৫) এবং নাতনি শম্পা দলুই (Shampa Dolui, ১৫)। শম্পা স্থানীয় স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ত। দুধকুমারের আরও এক পুত্র রয়েছে, তিনি ভিন্রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করেন। ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে ছিলেন না, ফলে প্রাণে বেঁচে যান।
উল্লেখ্য, রবিবার রাত গভীর হলে পরিবারের চার জনই খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যেই হঠাৎ ঘরের ভিতর থেকে আগুনের আলো এবং ধোঁয়া বেরোতে দেখা যায়। প্রথমে কেউ বিষয়টি বুঝতে না পারলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় ভিতরে আটকে পড়েন চার জনই। আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, তাঁরা কেউই বেরিয়ে আসার সুযোগ পাননি। প্রতিবেশীরা আগুন দেখতে পেয়ে চিৎকার শুরু করেন এবং দ্রুত জয়পুর থানায় খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ দমকল বিভাগে যোগাযোগ করে। আমতা ও উলুবেড়িয়া থেকে দমকলের একাধিক ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। দমকলকর্মীরা আগুন নেভানোর পর ঘরের ভিতর থেকে উদ্ধার হয় একই পরিবারের চার জনের ঝলসানো দেহ।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা গ্রামে শোকের আবহ নেমে আসে। সোমবার সকাল থেকে সাউড়িয়া গ্রামে ভিড় জমাতে শুরু করেন স্থানীয় মানুষ। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না, হাসিখুশি পরিবারটি এক রাতের মধ্যে এমন মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হবে। বিশেষ করে কিশোরী শম্পার মৃত্যু এলাকাবাসীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। প্রতিবেশীদের কথায়, শম্পা পড়াশোনায় ভালো ছিল এবং খুবই শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিল।
পুলিশ সূত্রে খবর, প্রাথমিক ভাবে অগ্নিকাণ্ডের কারণ স্পষ্ট নয়। ঘরে কোনও বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট হয়েছিল কি না, নাকি রান্নার গ্যাস বা প্রদীপ থেকে আগুন লেগেছে, সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘরের ভিতরে থাকা আসবাব, কাঠের কাঠামো এবং দাহ্য সামগ্রীর কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে অনুমান তদন্তকারীদের। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফল হাতে না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য, চার জনের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাওড়া জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। দমকল বিভাগের তরফেও আলাদা করে রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। ঘটনার পর বাড়িটি সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়া হয়েছে, যাতে তদন্তে কোনও সমস্যা না হয়।
এই ঘটনার পর ফের প্রশ্ন উঠছে গ্রামাঞ্চলে অগ্নি-নিরাপত্তা নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেরই অভিযোগ, কাঁচা বা আধা-পাকা বাড়িতে আগুন লাগলে দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ বাড়িতেই আগুন নেভানোর কোনও প্রাথমিক ব্যবস্থা থাকে না। রাতের বেলায় সবাই ঘুমিয়ে পড়লে এমন দুর্ঘটনায় প্রাণরক্ষা কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে।প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। একমাত্র জীবিত সদস্য, যিনি ভিন্রাজ্যে কাজ করেন, তাঁকে খবর দেওয়া হয়েছে। তাঁর ফিরে আসার পর সরকারি সাহায্য এবং ক্ষতিপূরণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।
একটি অসাবধানতা, একটি অজানা মুহূর্তের আগুন আর তাতেই নিভে গেল চারটি জীবন। হাওড়ার আমতা-জয়পুরের এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, তা গ্রামাঞ্চলে নিরাপত্তা ও সচেতনতার অভাবের এক ভয়ংকর ছবি তুলে ধরল। তদন্তে যদি প্রকৃত কারণ উঠে আসে, তবে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Hindu youth murdered in Bangladesh, India reaction on Bangladesh minorities | ঢাকায় হিন্দু যুবক দীপু দাস খুন, কড়া বার্তা দিল ভারত: সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগে দিল্লি




