সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে (Parliament Winter Session) বিরোধীদের প্রবল বিক্ষোভ ও হইচই উপেক্ষা করেই লোকসভায় ধ্বনি ভোটে পাশ হয়ে গেল ‘বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন বিল’, সংক্ষেপে যাকে বলা হচ্ছে ‘জিরামজি’ (JIRAMJI) বিল। সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু (Kiren Rijiju) আগেই দাবি করেছিলেন, বিরোধী বাধা সত্ত্বেও এই বিল পাশ করানো হবে। বৃহস্পতিবার ঠিক তেমনটাই বাস্তবে ঘটল। বিল পাশের পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা (Om Birla) গোটা দিনের জন্য অধিবেশন মুলতুবি ঘোষণা করেন। ধ্বনি ভোটে পাশ হওয়া এই বিল কার্যত দেশের গ্রামীণ কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। লোকসভা পেরিয়ে এবার বিলটি রাজ্যসভায় যাবে। সেখানে অনুমোদন মিললে এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পর এটি আইনে পরিণত হবে। সেই সঙ্গেই বহু চর্চিত ও এক দশকের বেশি পুরনো মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ রোজগার নিশ্চয়তা প্রকল্প বা মনরেগা (MGNREGA) কার্যত তার বর্তমান রূপে আর থাকবে না, এমনটাই আশঙ্কা বিরোধীদের একাংশের। এই ‘নাম বদল’ এবং কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়েই রাজনৈতিক তরজা সবচেয়ে তীব্র আকার নিয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার পরিকল্পিত ভাবেই মনরেগা থেকে মহাত্মা গান্ধীর নাম সরিয়ে ইতিহাস মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই বিতর্কে সরাসরি মুখ খুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। বৃহস্পতিবার কলকাতায় আয়োজিত প্রথম ‘বিজনেস কনক্লেভ’ থেকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগে তিনি বলেন, ‘১০০ দিনের কাজ থেকে গান্ধীজির নাম সরানো হয়েছে। জাতির জনককে ভুলে যাচ্ছেন? ভাবা যায়!’ তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্র সরকার ইতিহাস বদলানোর রাজনীতি করছে, কিন্তু রাজ্য তা করবে না। সেই কারণেই তিনি রাজ্যের কর্মশ্রী প্রকল্পকে মহাত্মা গান্ধীর নামে উৎসর্গ করার ঘোষণাও করেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের পাশাপাশি কংগ্রেসও ‘জিরামজি’ বিলের কড়া সমালোচনা করেছে। কংগ্রেস সাংসদ জয় প্রকাশ (Jai Prakash) দাবি করেন, ‘জাতির জনকের নাম মুছে দেওয়ার এই রাজনীতি দেশের গণতান্ত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। এটি স্বাধীন ভারতের অন্যতম বড় অপরাধ।’ তাঁর আরও অভিযোগ, নতুন বিলে কেন্দ্র রাজ্যগুলির উপর অতিরিক্ত আর্থিক দায় চাপানোর চেষ্টা করছে।বিরোধীদের মতে, মনরেগা প্রকল্পে যেখানে আর্থিক দায়ের মূল অংশ বহন করত কেন্দ্র, সেখানে ‘জিরামজি’ বিলে সেই কাঠামো বদলে দেওয়া হয়েছে। নতুন বিলে বলা হয়েছে, বিশেষ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বাদে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে ৬০:৪০ অনুপাতে অর্থের দায়িত্ব নিতে হবে। অর্থাৎ, কেন্দ্র ৬০ শতাংশ দেবে, বাকি ৪০ শতাংশ দিতে হবে রাজ্যকে। বিরোধীদের অভিযোগ, আর্থিকভাবে দুর্বল রাজ্যগুলির পক্ষে এই অতিরিক্ত বোঝা বহন করা কঠিন হয়ে উঠবে।
যদিও কেন্দ্রের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারের বক্তব্য, এই নতুন বিল গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করবে। মনরেগার তুলনায় ‘জিরামজি’ বিলে কাজের দিনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। যেখানে মনরেগায় বছরে ন্যূনতম ১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা ছিল, সেখানে নতুন বিলে তা বাড়িয়ে ১২৫ দিন করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এতে গ্রামীণ মানুষের আয় বাড়বে এবং আজীবিকা সুরক্ষিত হবে। সরকারি সূত্রের মতে, ‘জিরামজি’ কেবল কাজের দিন বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ পরিকাঠামো, স্থানীয় দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্বনির্ভরতার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে। কেন্দ্রের যুক্তি, বদলে যাওয়া অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পুরনো কাঠামো ধরে রাখা সম্ভব নয়, তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রকল্পে পরিবর্তন আনা জরুরি। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে, যদি প্রকল্পের লক্ষ্য একই থাকে, তাহলে কেন মনরেগার নাম বদলাতে হবে? কেন মহাত্মা গান্ধীর নাম বাদ দেওয়া হল? তাদের মতে, এটি নিছকই প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, তা রাজনৈতিক ও আদর্শগত সিদ্ধান্ত। এই কারণেই সংসদে বিল পাশের সময় বিরোধীদের প্রবল প্রতিবাদ দেখা যায়। একাধিক বিরোধী সাংসদ ওয়েলে নেমে স্লোগান দেন, যার জেরে লোকসভার কাজকর্ম বারবার ব্যাহত হয়।
রাজনৈতিক একাংশ মনে করছেন, ‘জিরামজি’ বিল ঘিরে বিতর্ক আগামী দিনে আরও তীব্র হবে, বিশেষ করে রাজ্যসভায় আলোচনার সময়। একই সঙ্গে এই বিল রাজ্য-কেন্দ্র সম্পর্কেও নতুন টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে। কারণ অর্থনৈতিক দায় ভাগাভাগির বিষয়টি অনেক রাজ্যের কাছেই স্পর্শকাতর। উল্লেখ্য, সংসদে শীতকালীন অধিবেশনে পাশ হওয়া ‘জিরামজি’ বিল গ্রামীণ রোজগার, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে এক বড় সংঘাতের সূচনা করেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এখন দেখার, রাজ্যসভায় এই বিল কীভাবে এগোয় এবং শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হলে তার বাস্তব প্রভাব গ্রামীণ ভারতের উপর ঠিক কতটা পড়ে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Abhijit Gangopadhyay reaction, Primary teacher recruitment scam |ডিভিশন বেঞ্চের রায় প্রশ্নের মুখে? প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ বললেন, ‘২৬ হাজারও তো বহু বছর চাকরি করেছে, তা হলে কি সেই রায় ভুল?’



