সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সাম্প্রতিক বিশৃঙ্খলা ও বিতর্কের প্রেক্ষিতে রাজ্য রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস (Aroop Biswas) -এর পাঠানো পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের দায়িত্ব অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া হবে না। আপাতত এই দফতর নিজের হাতেই রাখবেন মুখ্যমন্ত্রী।
মঙ্গলবার নবান্নে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। যুবভারতী কাণ্ডে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যেই এই ইস্তফা গ্রহণ করা হল। মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের মন্ত্রী হিসেবে এখন থেকে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি নিজেই। তবে মন্ত্রিসভায় অরূপ বিশ্বাস থাকছেন এবং বিদ্যুৎ দফতরের দায়িত্ব তিনি আগের মতোই সামলাবেন। সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে অরূপ বিশ্বাস লিখেছিলেন, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তারা যাতে ‘নিরপেক্ষভাবে’ কাজ করতে পারে, সেই স্বার্থেই তিনি ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকে অব্যাহতি চান। তাঁর মতে, তদন্ত চলাকালীন দফতরের দায়িত্বে থাকলে অযাচিত বিতর্ক তৈরি হতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে ইস্তফা গ্রহণ করেন এবং চিঠিতে অরূপের ‘আবেগ ও সদিচ্ছা’-র প্রশংসা করেন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, ‘তিনি একেবারেই সঠিক। যতক্ষণ না নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ এই দফতর আমি নিজেই দেখব।’

এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অরূপ বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের দায়িত্বে ছিলেন। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বিশ্বখ্যাত ফুটবল তারকা লিয়োনেল মেসি (Lionel Messi) -এর অনুষ্ঠানে ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলার পর থেকেই তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। অনুষ্ঠানের সময় মেসিকে কাছ থেকে দেখতে না পেয়ে দর্শকদের একাংশ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। মেসি মাঠ ছাড়ার পরেই শুরু হয় ভাঙচুর। সেই সময়ের কিছু ছবি ও ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় মেসির খুব কাছাকাছি ছিলেন তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। এই দৃশ্য ঘিরেই ক্ষোভ বাড়তে থাকে ফুটবলপ্রেমী জনতার মধ্যে।
ক্রমে সেই সমালোচনা শুধু মাঠের গ্যালারিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, রাজনৈতিক মহল ও প্রশাসনের অন্দরেও তা আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। দলের অন্দরেই প্রশ্ন ওঠে, ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এই ধরনের পরিস্থিতি কী ভাবে তৈরি হল। তখন থেকেই জল্পনা শুরু হয়, অরূপ বিশ্বাসকে কি ক্রীড়া দফতর থেকে সরানো হবে, নাকি তিনি নিজেই পদত্যাগ করবেন। এই আবহেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটি সোমবার রাতে নবান্নে প্রাথমিক রিপোর্ট ও সুপারিশ জমা দেয়। রিপোর্ট পাওয়ার পরই প্রশাসনিক স্তরে একের পর এক কড়া পদক্ষেপ করা হয়। রাজ্য পুলিশের ডিজিপি রাজীব কুমারকে (Rajeev Kumar) শো কজ নোটিস পাঠানো হয়। একই সঙ্গে বিধাননগর পুলিশের কমিশনার মুকেশ কুমারকেও (Mukesh Kumar) শো কজ করা হয়েছে। শনিবারের ঘটনায় কেন এই ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হল, তার ব্যাখ্যা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিতে বলা হয়েছে তাঁদের।
শুধু তাই নয়, বিধাননগর পুলিশের ডিসি অনীশ সরকার (Anish Sarkar)-এর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত চলাকালীন তাঁকে সাময়িক ভাবে সাসপেন্ড করা হয়েছে। ক্রীড়া ও যুব বিষয়ক দফতরের প্রধান সচিব রাজেশ কুমার সিংহকেও (Rajesh Kumar Singh) শো কজ করা হয়েছে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সিইও দেবকুমার নন্দনকে (Devkumar Nandan) পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ (Manoj Pant)-এর দফতরের তরফে এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, যুবভারতী কাণ্ডের তদন্তের জন্য বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট (Special Investigation Team – SIT) গঠন করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, তদন্তে কোনও রকম পক্ষপাতিত্ব করা হবে না এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অরূপ বিশ্বাসের ইস্তফা গ্রহণ করে এবং নিজে ক্রীড়া দফতরের দায়িত্ব হাতে রেখে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, এই ঘটনার দায় এড়ানো হবে না এবং তদন্তে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেও এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা চলছে। উল্লেখ্য, যুবভারতী কাণ্ডে রাজ্য প্রশাসনের কড়া অবস্থান ও ক্রীড়া দফতরে নেতৃত্বের এই পরিবর্তন রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট কী আসে, তার দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Lionel Messi India Visit | মেসির ৩৫ মিনিটের নিখুঁত ম্যাজিক: দিল্লির অভিজ্ঞতায় আবারও শিক্ষা কলকাতার জন্য, ফুটবলপ্রেমে অনন্য দৃষ্টান্ত রাজধানীতে




