সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মালদহ : মালদহ জেলায় এইচআইভি এইডস (HIV Case in Malda) আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই উদ্বেগজনক আকার নিচ্ছে। জেলা স্বাস্থ্য দফতরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, শুধুমাত্র মালদহে মোট ৩১০০ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী বর্তমানে নথিভুক্ত আছেন। তার মধ্যে প্রায় ৩০০ জন নাবালক, বয়স ১৫ বছরের কম। সমগ্র পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সুদীপ্ত ভাদুড়ি (Sudipta Bhattacharya) জানান, এত বড় সংখ্যক অপ্রাপ্তবয়স্ক আক্রান্তের বিষয়টি অত্যন্ত চিন্তার, এবং জরুরি পদক্ষেপ ছাড়া এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
জেলা স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য অনুযায়ী, মালদহের একাধিক গ্রামেই গত কয়েক বছর ধরে কালাজ্বরের প্রকোপে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সেই মৃতদেহ ও রোগীর রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তির শরীরেই এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি ছিল। শুধু কালাজ্বর নয়, যক্ষ্মা বা টিবি আক্রান্ত বহু রোগীর ক্ষেত্রেও একই চিত্র ধরা পড়েছে। অনেক টিবি রোগী পরে এইচআইভি পজিটিভ বলে শনাক্ত হন। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই সংক্রমণের সম্পর্ক এবং পারস্পরিক প্রভাব নিয়ে এখনই গভীর গবেষণা প্রয়োজন।সোমবার জেলা স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়, এইচআইভি প্রতিরোধে এবার থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গঠন করা হয়েছে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি পৃথক দল, যারা শুধুমাত্র এইচআইভি সংক্রান্ত রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ওপর নজর দেবেন। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে বিশেষ মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, গর্ভাবস্থায় মা যদি এইচআইভি আক্রান্ত হন, তাহলে চিকিৎসার অভাবে শিশুর শরীরেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুর মধ্যে সংক্রমণের হার কমাতে বিশেষ মেডিকেল প্রটোকল অনুসরণ করা হবে। নবজাতক এবং অল্পবয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োগ থেকে পর্যবেক্ষণ, সবকিছুই বিশেষজ্ঞ কমিটির তত্ত্বাবধানে করা হবে। তাঁর কথায়, “শুধু রোগীদের সুস্থ রাখা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ করা এখন আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। আগামিদিনে একটি এইডসমুক্ত পৃথিবী গড়াই আমাদের লক্ষ্য।”
স্বাস্থ্য দফতর জানায়, শুধুমাত্র চিকিৎসা ব্যবস্থা নয়, সচেতনতা বাড়াতেও এবার জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর, পঞ্চায়েত, পুরসভা, ব্লক উন্নয়ন দফতর এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে সচেতনতা অভিযান চালানো হবে। বিভিন্ন গ্রাম ও শহরে ট্যাবলো, লিফলেট ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে তথ্যচিত্র দেখিয়ে সতর্ক করা হবে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, মানুষ লাজুকতা বা ভুল ধারণার কারণে পরীক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন না। তাই এবার প্রচারের মূল লক্ষ্য, এইচআইভি বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা ভাঙা, পরীক্ষায় উৎসাহ দেওয়া এবং সুরক্ষিত অভ্যাস গড়ে তোলা।
সুদীপ্ত ভাদুড়ি (Sudipta Bhattacharya) জানান, “সংক্রমণ রুখতে হলে প্রথম শর্ত সচেতনতা। মানুষ যত বুঝবে, তত সতর্ক হবে। এই রোগ সম্পর্কে ভুল তথ্যের জাল ছিঁড়ে ফেলতে হবে।” জেলা স্বাস্থ্য দফতর বিশ্বাস করে, পরিকল্পিত সচেতনতা কর্মসূচি চালানো গেলে সংক্রমণ কমবে।মালদহ জেলার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইচআইভি সংক্রান্ত পরিসংখ্যান যে দিকে এগোচ্ছে, তা একেবারেই আশাব্যঞ্জক নয়। তবে দ্রুত ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত স্ক্রিনিং, সংক্রমিত ব্যক্তির চিকিৎসা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিকে নজরদারির আওতায় আনতে পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষ করে নাবালকদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ কমাতে হবে অগ্রাধিকারভিত্তিতে।
জেলায় ইতিমধ্যেই একাধিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এইচআইভি পরীক্ষার ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকার স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যাতে তাঁরা দ্রুত রোগ শনাক্ত করে হাসপাতালে পাঠাতে পারেন। পাশাপাশি, সমাজের বিভিন্ন স্তরে কাউন্সেলিং চালানোর কথাও ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য দফতর।স্বাস্থ্য দফতরের মতে, এইচআইভি সংক্রমণ নিয়ে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভ্রান্ত ধারণায় বিশ্বাস করে এসেছে। অনেকেই ভাবেন, এইডস হল ‘অচিকিৎসাযোগ্য মৃত্যু-রোগ’। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসায় এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, এবং আক্রান্ত মানুষ দীর্ঘদিন সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে পারেন। তবে শর্ত, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ।
মালদহ জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিশ্বাস করে, জনসচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসা, এই দুই পথেই এইচআইভির বিস্তার থামানো যাবে। জেলার প্রশাসনিক মহল ও চিকিৎসকরা একজোট হয়ে এখন সেই লড়াইয়ে নেমেছেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Waqf Amendment Act News, Samik Bhattacharya Facebook Post | ওয়াকফ আইনে স্বচ্ছতার বার্তা: শমীক ভট্টাচার্যর তোপ তৃণমূলের বিরুদ্ধে




