সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : আবারও শুরু হতে চলেছে সুন্দরবনের (Sundarbans) বাঘ গণনা। ডিসেম্বর থেকেই পশ্চিমবঙ্গ বন দফতর (West Bengal Forest Department) শুরু করতে চলেছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার (Royal Bengal Tiger) গণনার কাজ। এবার এই অভিযান আগের চেয়ে আরও আধুনিক, আরও ব্যাপক। কারণ, বন দফতর সূত্রে খবর, সুন্দরবনের জঙ্গলজুড়ে বসানো হবে মোট ১,৪৮৪টি ট্র্যাপ ক্যামেরা (Camera Traps), যার নজরদারিতে প্রায় ৪,১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ঢেকে ফেলা হবে। এই ক্যামেরাগুলির মাধ্যমে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বাঘের ছবি সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হবে, যা থেকে জানা যাবে শুধু তাদের সংখ্যা নয়, চলাফেরার ধরন, আচরণ ও শিকার করার অভ্যাস সম্পর্কেও। বন দফতর জানিয়েছে, ২৬ নভেম্বর থেকেই শুরু হবে ক্যামেরা বসানোর কাজ, যা ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে পূর্ণ গতিতে শুরু হবে।
বন দফতরের এক আধিকারিক বলেন, “এ বার শুধুমাত্র বাঘ গণনাই নয়, আমরা পর্যবেক্ষণ করব বাঘের আচরণ, তাদের খাদ্যচক্র ও শিকারের উপস্থিতি। সুন্দরবনকে আরও ভালভাবে বুঝতে এই তথ্যগুলো অত্যন্ত জরুরি।” উল্লেখ্য যে, প্রায়২৫০ জন বনকর্মী (Forest Staff) এই অভিযানে যুক্ত থাকবেন। ইতিমধ্যেই তাঁদের প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ হয়েছে, কোন এলাকায় কীভাবে ক্যামেরা বসাতে হবে, কীভাবে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে, সেই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। ক্যামেরাগুলি এমনভাবে বসানো হবে যাতে বাঘ চলাচলের সম্ভাব্য পথ ও জলাশয়ের ধার, দুই জায়গাই ধরা পড়ে।

২০২৩ সালের শেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, সুন্দরবনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ছিল ৯৬। বন দফতরের আধিকারিকদের অনুমান, এ বছর সেই সংখ্যা বেড়ে ১০০ ছুঁতে বা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই আশাবাদের পেছনে রয়েছে বিগত বছরগুলিতে খাদ্যসংস্থান ও জঙ্গলের ইকোসিস্টেমে ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু, এই গণনা শুধুমাত্র সংখ্যাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বন দফতর এবার বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে সুন্দরবনের খাদ্যচক্রের স্থিতিশীলতা (Food Chain Stability) বিশ্লেষণে। অর্থাৎ, হরিণ (Deer), বুনো শুয়োর (Wild Boar) এবং অন্যান্য শিকার প্রাণীর সংখ্যা কেমন, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। অনেক সময় বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে খাদ্যাভাবের কারণে। সেই অনুমান যাচাই করতেই এ বছর নজর দেওয়া হচ্ছে খাদ্যের জোগান ও প্রাকৃতিক শিকারের প্রাচুর্যের দিকে।।বন দফতরের মুখ্য বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ দেবাশিস সরকার (Debasish Sarkar) বলেন, “যখনই খাদ্যসংস্থান কমে, বাঘ মানুষ-ঘেঁষা এলাকায় চলে আসে। এই শুমারির তথ্য আমাদের জানাবে, জঙ্গলে খাদ্যশৃঙ্খল কতটা ভারসাম্যপূর্ণ।”
এইবারের ব্যাঘ্রশুমারি আরও ডিজিটালভাবে হবে। বন দফতর তৈরি করেছে একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ (Mobile Application), যার মাধ্যমে সমস্ত তথ্য কেন্দ্রীভূতভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হবে। ক্যামেরা ট্র্যাপ থেকে প্রাপ্ত ছবি, পায়ের ছাপ (Pugmark) এবং অন্যান্য চিহ্নের তথ্য এই অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি ডেটা সেন্টারে পাঠানো হবে।বন দফতরের এক সিনিয়র অফিসার জানান, “এটি শুধু বাঘের সংখ্যা জানার প্রকল্প নয়। আমরা চাইছি, সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে।”
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন, ইউনেস্কো (UNESCO) ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান। এখানেই বাস করে বিশ্বের সবচেয়ে সুদর্শন ও ভয়ংকর প্রজাতির বাঘ, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change), নদীভাঙন ও মানুষের আগ্রাসনে এই অরণ্যের ভারসাম্য ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে। ফলে, বাঘের নিরাপত্তা ও সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের এই ব্যাঘ্রশুমারি প্রকৃত অর্থে হবে “পরিবেশের স্বাস্থ্য পরীক্ষা।” কারণ, বাঘ হল ইকোসিস্টেমের সর্বোচ্চ স্তরের প্রাণী। বাঘ বাঁচলে জঙ্গল বাঁচে, আর জঙ্গল বাঁচলে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত থাকে। বন দফতরও আশা করছে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকেই এই নতুন ব্যাঘ্রশুমারির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ করা সম্ভব হবে। সেই রিপোর্টে শুধু বাঘের সংখ্যা নয়, প্রতিটি বাঘের চলাচলের রূপরেখা, খাদ্যাভ্যাস, এমনকি তাদের প্রজনন-সংক্রান্ত তথ্যও থাকবে। পরিবেশবিদ সায়ন দত্ত (Sayan Dutta) বলেন, “সুন্দরবনের বাঘ মানেই বিশ্বের নজর। তাই এই শুমারি শুধু ভারতের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ বার প্রযুক্তি ও মাঠ পর্যবেক্ষণের যুগল প্রয়াসে আমরা আরও নির্ভুল তথ্য পাব।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে চলা এই ব্যাঘ্রশুমারি শুধুমাত্র একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্যের এক নতুন নথি হতে চলেছে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Chingri Kalia Recipe | চিংড়ি মাছের কালিয়া : রুই নয়, আজ ঘরেই উপভোগ করুন এই ৫ মিনিটের রাজকীয় স্বাদ




