সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ফের একবার কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়ালেন। এবার নিশানায় জিএসটি (GST)। উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে তিনি বলেন, “জিএসটি মেনে নেওয়া বড় ব্লান্ডার হয়েছিল!” তাঁর কথায়, দেশের অভিন্ন কর কাঠামোকে সমর্থন করা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি বড় রাজনৈতিক ভুল ছিল, কারণ কেন্দ্র রাজ্যের প্রাপ্য অর্থ আটকে রেখে বৈষম্য তৈরি করেছে। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো মমতা নিজেই স্বীকার করলেন যে, জিএসটি সমর্থনের সিদ্ধান্তটি ছিল একপ্রকার ‘রাজনৈতিক ভুল’। তিনি বলেন, “আমরা সহযোগিতামূলক ফেডারেল কাঠামোর ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই জিএসটি মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে এটা বড় ব্লান্ডার ছিল। রাজ্যের প্রাপ্য টাকা পাচ্ছে না, অথচ কেন্দ্র অন্য রাজ্যে বিলিয়ে দিচ্ছে।”
মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য উত্তরকন্যা প্রশাসনিক ভবনের বৈঠক থেকেই উঠে আসে। উত্তরবঙ্গে সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে ত্রাণ ও পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনার সময়েই তিনি কেন্দ্রের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, “অন্য রাজ্যকে টাকা দিচ্ছে, বিজেপি (BJP) শাসিত রাজ্যগুলিতে সব খরচ করছে। কিন্তু বাংলার ভাগের টাকা দিচ্ছে না। উল্টে আমাদের রাজ্য থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে চলে গিয়েছে কেন্দ্র।” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও জানান, জিএসটি চালুর সময়ে রাজ্যের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র (Amit Mitra) তাঁকে কাঠামোটি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বোঝান। তার পরেই তৃণমূল (Trinamool Congress) প্রথম রাজনৈতিক দল হিসাবে জিএসটি সমর্থন করে। তিনি বলেন, “আমরা কেন্দ্রের সঙ্গে সহযোগিতার ভাবনায় সায় দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ দেখছি রাজ্যের প্রাপ্য অর্থ আটকে রেখে কেন্দ্র রাজনীতির খেলায় মেতে উঠেছে। এটা ন্যায়সঙ্গত নয়।”
রাজনৈতিক মহলের অনেকের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য সময়োচিত এবং রাজনৈতিকভাবে কৌশলগত। এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “১৯৯৬ সালে জ্যোতি বসু (Jyoti Basu) ‘হিস্টোরিক্যাল ব্লান্ডার’ বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রিত্ব প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তকে। আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একই শব্দ ‘ব্লান্ডার’ ব্যবহার করলেন নিজের একসময়কার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পর্যালোচনায়। এটা প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।”
উল্লেখ্য যে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির টাকা আটকে রাখার অভিযোগ তোলায় তৃণমূল সরকার সরব। ১০০ দিনের কাজ (MGNREGA), প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (PM Awas Yojana), গ্রাম সড়ক যোজনা (PMGSY) এবং জল জীবন মিশন (Jal Jeevan Mission) -এর মতো প্রকল্পগুলিতে রাজ্যের প্রাপ্য অর্থ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রাজ্যের।মমতা বলেন, “১০০ দিনের কাজের টাকা না দেওয়ায় আমরা রাজ্যের তহবিল থেকেই ৫৯ লক্ষ মানুষের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়েছি। কেন্দ্রের দায় থাকা সত্ত্বেও জনগণের স্বার্থে রাজ্য নিজের দায়িত্ব নিয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “উত্তরবঙ্গে এত বড় বিপর্যয়ের পরেও কেন্দ্র একটা টাকাও দেয়নি। সব আমাদের করতে হয়েছে। এটা কেবল রাজ্যের প্রতি অবিচার নয়, ফেডারেল কাঠামোরও অপমান।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, লোকসভা নির্বাচনের আগে এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। মমতা বোঝাতে চাইছেন, তাঁর সরকার সবসময় দেশের ঐক্যবদ্ধ অর্থনৈতিক কাঠামোর পক্ষে ছিল, কিন্তু কেন্দ্র সেই আস্থার প্রতিদান দেয়নি। একই সঙ্গে, তিনি রাজ্যের অর্থনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধারের দাবি আরও জোরালোভাবে তুললেন।অর্থনীতিবিদ অর্পিতা মুখার্জি বলেন, “জিএসটি চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল কর কাঠামোর ঐক্য ও স্বচ্ছতা আনা। কিন্তু যদি রাজ্যগুলির রাজস্ব ভাগ অনিয়মিত হয়, তাহলে ফেডারেল অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই হতাশার প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে।” আবার, রাজনৈতিক মহলে অনেকেই মনে করছেন, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে এই মন্তব্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বয়ে এনেছে। এটি তৃণমূলের দাবি, “বাংলা বঞ্চিত” এর এক নতুন রূপ।
এদিকে, কেন্দ্রীয় সরকার সূত্রের দাবি, রাজ্যগুলিকে তাদের প্রাপ্য অনুযায়ীই অর্থ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাংলার দাবি যে পুরোপুরি অমূলক নয়, তা অস্বীকার করতেও রাজি নয় কেন্দ্রীয় অর্থনীতি বিশ্লেষক মহল। কারণ, গত কয়েক বছরে একাধিক রাজ্যই জিএসটি ক্ষতিপূরণের অর্থ বিলম্বিতভাবে পেয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের “জিএসটি মেনে নেওয়া বড় ব্লান্ডার” মন্তব্যে ফের একবার উষ্ণ হল কেন্দ্র-বাংলা সম্পর্ক। রাজনৈতিক দিক থেকে এটি রাজ্য সরকারের বঞ্চনার বয়ানকে আরও জোরালো করল বলেই মনে করছে বিশ্লেষক মহল।
ছবি : সংগৃহীত




