সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ৩০ অক্টোবর : রাজ্যে ফের চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এনআরসি (NRC) ও এসআইআর (SIR) আতঙ্কে প্রবীণ নাগরিকদের আত্মহত্যার ঘটনাকে ঘিরে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তিনটি পৃথক ঘটনায় আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা, প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে বহুগুণে। তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) অভিযোগ তুলেছে, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি এবং নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত রাজ্যে ভয় ও বিভাজনের বাতাবরণ তৈরি করছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) এক্স (X) হ্যান্ডেলে পোস্ট করে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন কেন্দ্রকে। তিনি লিখেছেন, “বিজেপির (BJP) ভয়, বিভাজন এবং ঘৃণার রাজনীতির করুণ পরিণতি আমরা প্রত্যক্ষ করছি। নির্বাচন কমিশন বাংলায় SIR ঘোষণা করার ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক দুর্ঘটনা ঘটছে। দেশবাসী ভয়ের মধ্যে বাঁচছে, কেন্দ্র তৈরি করছে এক ধরনের সন্ত্রাসের রাজত্ব।” তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক তরজার পারদ দ্রুত বেড়ে উঠেছে।
উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি এলাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি যেন এই আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রদীপ কর (Pradip Kar) নামে ৬৮ বছর বয়সি এক প্রবীণ আত্মঘাতী হন। পরিবারের অভিযোগ, এনআরসি আতঙ্ক এবং ভোটার তালিকার নথিপত্র নিয়ে গভীর উদ্বেগে ছিলেন তিনি। আত্মহত্যার আগে তিনি নাকি প্রতিবেশীদের বলেছিলেন, “আমার নাম যদি বাদ যায়, তাহলে কী হবে? কোথায় যাব?” এমনই দাবি তাঁর আত্মীয়দের। প্রদীপবাবুর মৃত্যুর পর এলাকায় শোক ও ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হয়। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, “এটা কোনও সাধারণ আত্মহত্যা নয়, এটা ভয় ও বিভ্রান্তির রাজনীতির ফল।” তাঁদের দাবি, কেন্দ্রের নীতি মানুষকে এমন অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে প্রবীণরা নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করতেই মৃত্যুর পথ বেছে নিচ্ছেন।
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) বলেন, “যখন মানুষ নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভয় পেতে শুরু করে, তখন বোঝা যায় শাসক দলের রাজনীতি কতটা নিষ্ঠুর হয়েছে। বিজেপি বাংলায় ভয় ছড়ানোর রাজনীতি চালাচ্ছে। এনআরসি ও SIR -এর নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।” অন্যদিকে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মিথ্যা ভয় দেখিয়ে রাজনীতি করতে চাইছেন। SIR বা NRC নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তৃণমূল মানুষের আবেগ নিয়ে খেলছে।”
রাজনৈতিক দোষারোপের মধ্যেই প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। পানিহাটি থানার পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, “ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। কোনও চিরকুট পাওয়া যায়নি।” তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রদীপবাবু দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগে ভুগছিলেন এবং সম্প্রতি ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত খবর দেখেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, রাজ্যের একাধিক জেলায় এনআরসি ও SIR নিয়ে আতঙ্ক বাড়ছে। বিভিন্ন জায়গায় বুথ অফিস ও ব্লক অফিসে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করতে ভিড় বাড়ছে। বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিকদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়েছে, “যদি নাম বাদ পড়ে যায়, তাহলে নাগরিকত্বের প্রমাণ দেব কীভাবে?” এই প্রশ্ন ঘুরছে প্রতিটি মহল্লায়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) তাঁর পোস্টে আরও লেখেন, “আমরা বাংলায় কোনও বিভেদমূলক নীতি মানি না। মানবিকতা ও সংবিধানের মূল আদর্শকে আঘাত করছে কেন্দ্র। আমি সমস্ত মানুষকে আশ্বস্ত করছি, রাজ্যে কেউ নাগরিকত্ব হারাবেন না।” তৃণমূল সূত্রের মতে, রাজ্যজুড়ে এখন প্রশাসনিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। দলীয় পর্যায়ে “বিশ্বাসের বার্তা” পৌঁছে দিতে স্থানীয় প্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রবীণ নাগরিকরা আতঙ্কে না ভোগেন। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরে অভিযোগ, “তৃণমূল ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক সহানুভূতি আদায় করতে চাইছে।” রাজনৈতিক সমালোচকরা বলছেন, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের আগে এই ধরণের সংবেদনশীল ইস্যু কেন্দ্র, রাজ্য সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। একজন বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “SIR ইস্যুটি শুধু প্রশাসনিক নয়, এটি এখন মানসিক ও সামাজিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। জনগণের নিরাপত্তাবোধ নষ্ট হলে রাজনৈতিক বিশ্বাসও ভেঙে পড়ে।”
উল্লেখ্য, এই ঘটনাগুলি ঘিরে প্রশাসনও সতর্ক। স্বরাষ্ট্র দফতর রাজ্যজুড়ে রিপোর্ট তলব করেছে এবং মানসিক পরামর্শ কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। মমতা সরকারের দাবি, রাজ্যে শান্তি ও সামাজিক স্থিতি বজায় রাখাই এখন অগ্রাধিকার। কিন্তু এনআরসি ও SIR আতঙ্কের ছায়া যেন ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ বাইশ-তম কিস্তি)




