সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: প্রায় তিন বছর পর অবশেষে জেল থেকে মুক্ত হচ্ছেন রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় (Partha Chatterjee)। এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ২০২২ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের পর সোমবার আদালত তাঁর জামিনের নির্দেশ দেয়। এদিন সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রথমে বিচারক জামিন সংক্রান্ত পরবর্তী নির্দেশ স্থগিত রাখলেও, কিছু সময় পরই মুক্তির আদেশ দেন।
পার্থর পাশাপাশি এসএসসি-র প্রাক্তন চেয়ারম্যান সুবীরেশ ভট্টাচার্য (Subires Bhattacharya) -ও মুক্তি পাচ্ছেন বলে বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে। প্রায় তিন বছরের বন্দী-জীবনের পর এই খবর রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন ফেলেছে। যদিও তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) প্রকাশ্যে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলেন, “এটা সম্পূর্ণ আইনের বিষয়। যদি কোনও ব্যক্তি আদালতে জামিনের আবেদন করেন, এবং আদালত যদি মনে করেন তিনি জামিন পাওয়ার যোগ্য, তাহলে আইন অনুযায়ী তিনি জামিন পাবেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা সবসময় বলেছি, আদালত যা বলবে, সেটাই মান্য। বিচারবিভাগের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে।”
কুণালের মন্তব্যে স্পষ্ট, দলের পক্ষ থেকে এই মুহূর্তে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মুক্তি নিয়ে কোনও রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে না। যদিও ২০২২ সালে পার্থর গ্রেফতারি পরেই তিনিই বলেছিলেন, “যদি তদন্তকারী সংস্থা (ED বা Enforcement Directorate) কোর্টে কোনও প্রমাণ বা নথি জমা দেয়, তাহলে দল ব্যবস্থা নেবে।” আজ সেই একই কুণাল বেশ সংযত। অন্যদিকে, তৃণমূল নেতা তথা রাজ্যসভার সাংসদ জগন্নাথ সরকার (Jagannath Sarkar) বলেন, “আমরা বারবার বলেছি, বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে হবে। যদি আদালত মনে করে কারও বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই, তাহলে তিনি মুক্ত হবেন। তবে তদন্তের বিষয়টি এখনও শেষ হয়নি।” বিকাশ ভট্টাচার্য (Bikash Bhattacharya), সিপিএম (CPM) নেতা ও আইনজীবী হিসেবে বলেন, “আদালত জামিন দিয়েছেন মানে এই নয় যে মামলা শেষ হয়ে গেল। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চলবে। তবে আদালতের এই সিদ্ধান্তে বোঝা যাচ্ছে, জামিনের পক্ষে যুক্তি যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল।”
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মুক্তি নিয়ে বিজেপি (BJP) শিবিরে অবশ্য কটাক্ষ শুরু হয়েছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “তৃণমূলের দুর্নীতিবাজ নেতাদের শেষ পর্যন্ত আইন থেকে রেহাই মেলে, এই ধারণা মানুষের মনে আরও দৃঢ় হল। আমরা চাই তদন্ত শেষ হোক দ্রুত, আর দোষী সাব্যস্ত হলে কঠোর শাস্তি হোক।” প্রসঙ্গত, পার্থ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী মন্ত্রী। শিক্ষামন্ত্রিত্বের পাশাপাশি তিনি শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের দায়িত্বও সামলেছেন। এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ইডি (ED) ও সিবিআই (CBI) যৌথ তদন্ত শুরু করার পরই তাঁর নাম আসে বিতর্কের কেন্দ্রে। তাঁর ঘনিষ্ঠ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের (Arpita Mukherjee) বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধার হয়, যা রাজ্যের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এই মামলায় পার্থ চট্টোপাধ্যায় প্রথম থেকেই দাবি করে আসছিলেন, তিনি “চক্রান্তের শিকার”। জেলে থেকেও তাঁর আইনজীবীদের মাধ্যমে বারবার তিনি বলেছেন, “আমি নির্দোষ। আমার বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ নেই।” দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবারের রায় যেন তাঁর জন্য এক ‘অস্থায়ী স্বস্তি’।
রাজনৈতিক সমালোচকদের মতে, পার্থর মুক্তি তৃণমূলের জন্য এক দ্বিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। একদিকে দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করা, অন্যদিকে পার্থর মতো অভিজ্ঞ নেতাকে সামলানো, দু’টি ক্ষেত্রেই ভারসাম্য রাখতে হবে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, জামিন মানে এখনও মামলার নিষ্পত্তি নয়। ইডি ও সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, তদন্তের কিছু দিক এখনও বাকি আছে, বিশেষ করে অর্থের উৎস এবং সম্পত্তি বিনিয়োগের নথিপত্র যাচাইয়ের বিষয়টি। তবে দীর্ঘদিনের বন্দী জীবনের পর পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মুখে এখন একটাই কথা, “আমি আইনের ওপর ভরসা রেখেছিলাম, আজ আইনই আমাকে মুক্তি দিল।” উল্লেখ্য যে, পার্থর মুক্তি রাজনৈতিক মহলে যেমন নতুন প্রশ্ন তুলছে, তেমনই তাঁর আগামী পদক্ষেপ নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তিনি কি আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন? না কি নিজের মতো চুপ থাকবেন? সময়ই বলবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Dengue Cases in West Bengal | তাপমাত্রা কমলেও ভয় কমছে না ডেঙ্গি! রাজ্যে আক্রান্ত ১২ হাজার ছাড়াল, বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা আরও তিন সপ্তাহ বিপদ




