পার্বতী কাশ্যপ, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ছোট শহরের সীমাবদ্ধতার গণ্ডি পেরিয়ে এবার বিশ্বমানের সংস্থায় নিজের জায়গা করে নিলেন জলপাইগুড়ি গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (Jalpaiguri Government Engineering College) ছাত্রী তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় (Tania Bandyopadhyay)। মাত্র কয়েক বছরের অধ্যবসায়, স্বপ্ন আর কঠোর পরিশ্রমের জোরে তিনি পেয়েছেন মাইক্রোসফটের (Microsoft) সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি। বার্ষিক বেতন, চমকে যাওয়ার মতো, প্রায় ৫৪ লক্ষ টাকা!
হুগলির (Hooghly) ব্যান্ডেল (Bandel) এলাকার মেয়ে তানিয়া ছোট থেকেই স্বপ্ন দেখতেন টেক দুনিয়ায় বড় কিছু করার। এখন সেই স্বপ্ন বাস্তব। আগামী দিনে তিনি যোগ দেবেন মাইক্রোসফটের হায়দরাবাদ (Hyderabad) অফিসে। এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আনন্দের হাওয়া বইছে কলেজ ক্যাম্পাসে, পরিবারেও উৎসবের আমেজ। তানিয়ার বাবা ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায় (Indranil Bandyopadhyay) একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত, মা সংগীতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Sangeeta Bandyopadhyay) গৃহবধূ। একমাত্র মেয়ের এমন অবিশ্বাস্য কৃতিত্বে গর্বে ভরে উঠেছে গোটা পরিবার। আবেগমিশ্রিত গলায় তানিয়ার মা বলেন, “ও ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী। স্কুল থেকেই ওর স্বপ্ন ছিল বড় কোনও সংস্থায় কাজ করার। আজ ও সেটা করে দেখাল।” তানিয়ার নিজের কথায়, “গুগল (Google) বা মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করাই আমার লক্ষ্য ছিল। শ্রেয়াদি গুগলে চাকরি পেয়েছিলেন, ওর গল্পই আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি ভেবেছিলাম, যদি ও পারেন, আমিও পারব।”
উল্লেখ্য, কয়েক মাস আগেই একই কলেজের ছাত্রী শ্রেয়া সরকার (Shreya Sarkar) গুগলে বছরে ৫৪ লক্ষ টাকার চাকরি পেয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন। আর এবার তানিয়ার এই সাফল্য যেন জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে আরও এক ধাপ উঁচুতে তুলে দিল। কলেজের অধ্যক্ষ (Principal) আনন্দ মুখোপাধ্যায় (Ananda Mukhopadhyay) গর্বের সঙ্গে বলেন, “আমাদের কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এখন শুধু রাজ্যের নয়, দেশের বাইরেও নিজেদের প্রমাণ করছে। তানিয়ার এই অর্জন গোটা উত্তরবঙ্গের (North Bengal) গর্ব।” তানিয়ার কলেজজীবনও ছিল আদর্শ ও অনুপ্রেরণার মতো। প্রথম বর্ষ থেকেই কোডিং ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোডিং প্র্যাকটিস, অনলাইন হ্যাকাথন ও গ্লোবাল প্রজেক্টে অংশগ্রহণ, এই সমস্ত অভিজ্ঞতাই তাঁকে এই উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তিনি জানান, “ইন্টারভিউ প্রক্রিয়াটা ছিল খুব চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু আমি মানসিকভাবে তৈরি ছিলাম। প্রতিটি ধাপকে শেখার সুযোগ হিসেবে নিয়েছিলাম।”
কলেজের শিক্ষকরাও তানিয়ার এই যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক সুদীপ ঘোষ (Sudip Ghosh) বলেন, “তানিয়া পড়াশোনায় যেমন মনোযোগী, তেমনি নতুন প্রযুক্তি শেখার ক্ষেত্রেও দারুণ আগ্রহী। ওর সাফল্য আমাদের সকলের কাছে প্রেরণার।” এই সাফল্যের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হল, জায়গা নয়, মনের ইচ্ছে আর অধ্যবসায়ই নির্ধারণ করে একজন মানুষের উচ্চতা। ছোট শহরের এক সাধারণ মেয়ের গল্প এখন হাজার তরুণ-তরুণীর অনুপ্রেরণার উৎস। মাইক্রোসফটের মতো বিশ্বখ্যাত সংস্থায় ৫৪ লক্ষ টাকার বার্ষিক বেতনের চাকরি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি এক সামাজিক বার্তা, “স্বপ্ন দেখো, চেষ্টা করো, একদিন নিশ্চয়ই সফলতা আসবেই।” তানিয়া নিজের পরবর্তী লক্ষ্য সম্পর্কেও জানান, “আমি চাই ভবিষ্যতে ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে, যেখানে তারা আন্তর্জাতিক টেক ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারে। আমাদের দেশের অনেক প্রতিভা সুযোগের অভাবে পিছিয়ে থাকে। আমি চাই সেই ব্যবধানটা কিছুটা হলেও কমাতে।” এই মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়াতেও তানিয়ার সাফল্যের ঝড় উঠেছে। কলেজের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন, সকলেই শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তাঁকে। তানিয়ার গল্প যেন এক অনুপ্রেরণার পাঠ। তিনি প্রমাণ করেছেন, মেধা থাকলে এবং সেই মেধাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে, ছোট শহর থেকেও পৌঁছানো যায় আন্তর্জাতিক কর্পোরেট জগতে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Water chestnut farming in India | ১২ হাজার টাকায় আয় ৬০ হাজার! ধান ছেড়ে পানিফল চাষে ভাগ্য ঘুরছে মেদিনীপুরের চাষীদের




