শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : বছরভর সুস্থ থাকতে ফল ও সবজি খাওয়া যেমন জরুরি, ঠিক তেমনই তা নিরাপদভাবে খাওয়াও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু জানেন কি, আপনার নিয়মিত রান্নার ঝুড়িতে থাকা কিছু সবজিই হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী? চিকিৎসকদের মতে, বেশ কিছু সাধারণ শাকসবজির মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভয়ঙ্কর ফিতেকৃমি বা টেপওয়ার্ম (Tapeworm) যা একবার শরীরে ঢুকলে সোজা পৌঁছে যেতে পারে মস্তিষ্কে, এবং কুরে কুরে খেয়ে ফেলতে পারে ব্রেনের টিস্যু।নয়ডার মেট্রো হাসপাতালের সিনিয়র নিউরোলজিস্ট ডাঃ নীরজ কুমার (Dr. Neeraj Kumar) জানান, “মানুষ সাধারণত ফিতাকৃমিকে পেটের কৃমি মনে করেন, কিন্তু তা মস্তিষ্কেও পৌঁছতে পারে। এটি ‘Neurocysticercosis’ নামের এক ভয়ংকর অসুখ তৈরি করে, যা পক্ষাঘাত, খিঁচুনি এমনকী মৃত্যুর কারণ হতে পারে।” এই মারাত্মক কৃমিগুলো সাধারণত দূষিত মাটি, জল বা সার ব্যবহারের মাধ্যমে সবজির মধ্যে ঢুকে পড়ে। অপরিষ্কারভাবে ধোয়া বা অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা সবজি থেকেই এগুলো সহজে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন, নিচের সাতটি সবজি খাওয়ার আগে না ধুলে বিপদ অনিবার্য।
ঝিঙে (Ridge Gourd) : ঝিঙেতে প্রায়ই দেখা যায় ক্ষুদ্র সাদা রঙের কৃমি, যা এক সপ্তাহের মধ্যেই এক ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়ে যেতে পারে। এই পরজীবী শরীরে ঢুকলে সোজা ব্রেনে পৌঁছে যায়। তাই ঝিঙে কাটার পর কৃমিযুক্ত অংশ সরিয়ে ফেলুন এবং ভালোভাবে ধুয়ে তবেই রান্না করুন।
ফুলকপি (Cauliflower) : ফুলকপি এমন এক সবজি যেখানে ফিতাকৃমি বা অন্যান্য কীটের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। খালি চোখে দেখা না গেলেও, ভুল করে এই কৃমিগুলো শরীরে ঢুকলে তা লিভার, পেশি এবং মস্তিষ্কে ভয়ঙ্কর সংক্রমণ ঘটাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ফুলকপি রান্নার আগে গরম জলে ভিজিয়ে রাখুন এবং ভাপিয়ে নিন, তবেই খান।
বাঁধাকপি (Cabbage): বাঁধাকপি ফিতাকৃমির অন্যতম আশ্রয়স্থল। ঠিকভাবে না ধুলে এর পাতার ফাঁকে থাকা ডিম শরীরে ঢুকে পড়ে। পেটের ভেতরেই তা ফুটে ওঠে এবং মস্তিষ্কে পৌঁছে যেতে পারে। ডাঃ কুমার বলেন, “কাঁচা বাঁধাকপি খাওয়া সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ। রান্নার আগে গরম জলে ধোয়া আবশ্যক।”
কচু পাতা (Colocasia Leaves) : কচু পাতায় লুকিয়ে থাকে ফিতাকৃমির ডিম, যা শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণ, বমি, পেট ব্যথা এমনকি ব্রেন ইনফেকশন ঘটাতে পারে। বিশেষ করে মান কচু বা কচুর লতি রান্নার আগে পর্যাপ্ত জল দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। কাঁচা বা আধা সিদ্ধ কচু কখনও খাবেন না।
পটল (Pointed Gourd) : পটলের বীজ ও খোসার ফাঁকে অনেক সময় ফিতাকৃমির ডিম থাকে। কৃত্রিম সার ব্যবহারে উৎপাদিত পটলে এই সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেশি। রান্নার আগে পটল ভালোভাবে ধুয়ে নিন, এবং বীজ না খাওয়াই ভাল। না হলে মাথা ব্যথা, পেটের ব্যথা, এমনকি জ্বরও হতে পারে।
ক্যাপসিকাম (Capsicum) : রঙিন ক্যাপসিকামের অভ্যন্তরীণ অংশে ও বীজের মধ্যে থাকতে পারে ফিতেকৃমির ডিম। ঠিকমতো না ধুলে এই ডিম পেটে ঢুকে সংক্রমণ ঘটায়। তাই ক্যাপসিকামের বীজ বার করে ধুয়ে, রান্না করে তবেই খাওয়া উচিত। কাঁচা ক্যাপসিকাম এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
বেগুন (Brinjal / Eggplant) : বেগুন কেটে ভেতরে যদি পোকা দেখা যায়, তা অবিলম্বে ফেলে দিন। কারণ এই ফিতাকৃমি অনেক সময় তাপেও পুরোপুরি মারা যায় না। সংক্রমণ ঘটলে তা স্নায়ুতন্ত্রেও ক্ষতি করতে পারে। ফলে রান্নার আগে ভালোভাবে পরীক্ষা ও পরিষ্কার করা একান্ত প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবজি ধোয়ার সময় শুধু জল নয়, হালকা লবণ বা ভিনেগার মেশানো জলে অন্তত ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখলে এই কৃমিগুলো মরে যায়। পাশাপাশি অল্প আঁচে না রান্না করে সম্পূর্ণ সিদ্ধ করে খাওয়া উচিত। ডাঃ নীরজ কুমার সতর্ক করে বলেন, “প্রতিদিনের খাবারে সামান্য অসতর্কতা মস্তিষ্কের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। একটু যত্নই বড় বিপদ ঠেকাতে পারে।” উল্লেখ্য, সুস্থ থাকতে ফল ও সবজি খাওয়া দরকার, কিন্তু তার আগে অবশ্যই সচেতন থাকা জরুরি। ফিতেকৃমির মতো অদৃশ্য শত্রুরা কেবল পেট নয়, আমাদের মস্তিষ্ককেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই নিয়মিত হাত ধোয়া, সবজি ভালোভাবে পরিষ্কার করা এবং সঠিকভাবে রান্না করাই পারে আমাদের নিরাপদ রাখতে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Balanced Diet, Diet Plan | সুষম আহারের সহজ কৌশল: ৫ ধাপেই স্বাস্থ্যকর জীবনধারার রেসিপি




