সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ শিলিগুড়ি : পাহাড়ি বর্ষণের থাবায় বদলে গেল শিলিগুড়ির (Siliguri) মানচিত্র। একসময় শীতের পিকনিক মরশুমে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এমএম তরাই (MM Terai) পিকনিক স্পট আজ ইতিহাস। ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিন সপ্তাহ আগে সম্পূর্ণ গ্রাস করেছে বালাসন নদী (Balason River)। এখন সেখানে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর নতুন গতিপথ। স্থানীয়দের সঙ্গে প্রশাসনও হতবাক, কয়েক বছরেই যে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল, এক রাতের প্রাকৃতিক তাণ্ডবে তা আজ নিশ্চিহ্ন।

শিলিগুড়ি মহকুমার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান এই এমএম তরাই পিকনিক স্পট। বাগডোগরা (Bagdogra)-এর পানিঘাটা মোড় থেকে ব্যাংডুবি সেনা ছাউনি হয়ে দুধিয়া (Dudhiyya) যাওয়ার পথে রাস্তার ধারেই ছিল সেই মনোরম জায়গাটি। পাহাড়, চা বাগান আর বালাসনের ঝরঝরে ধারা মিলিয়ে সেখানে তৈরি হয়েছিল এক স্বপ্নরাজ্য। কিন্তু অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে টানা পাহাড়ি বৃষ্টি ও প্রবল জলস্ফীতির জেরে বালাসন নদী তার প্রাকৃতিক গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলে। নদীর সেই নতুন দিকেই এখন প্রবাহিত হচ্ছে জলধারা, গ্রাস করেছে পিকনিক স্পটের সম্পূর্ণ এলাকা। স্থানীয় গ্রামবাসীদের কথায়, কয়েক বছর আগে স্থানীয় উদ্যোগেই গড়ে ওঠে এই পিকনিক স্পট। প্রতি বছর শীতের শুরুতেই আসত পর্যটকদের ঢল। পরিবার, বন্ধু কিংবা স্কুল-কলেজের দল বেঁধে আসা মানুষদের কোলাহলে মুখর থাকত এই এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায় বলেন, “এলাকাটা ছিল একেবারে স্বর্গের মতো। চা বাগানের ঘ্রাণ আর পাহাড়ের হাওয়া মিশে যেত বালাসনের গর্জনে। এখন শুধু নদী আর পাথর।”
এমএম তরাই পিকনিক স্পটটি প্রশাসনিকভাবে পড়ত নকশালবাড়ি (Naxalbari) ব্লকের আপার বাগডোগরা (Upper Bagdogra) গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে। পঞ্চায়েত প্রধান সঞ্জীব সিনহা জানালেন, “পর্যটক ও স্থানীয়দের সুবিধার জন্য আমরা এখানে পানীয় জল, শৌচাগার, শিশুদের খেলার সামগ্রী থেকে শুরু করে ছোট দোকানের ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু নদীর ভয়ঙ্কর স্রোতে এক রাতেই সব শেষ। এখন নদীর হুমকির মুখে রাস্তা, বসতবাড়ি, এমনকী নিকটবর্তী একটি বৌদ্ধগুম্ফাও।” শিলিগুড়ি ডিভিশনের সেচদপ্তরের (Irrigation Department) এক ইঞ্জিনিয়ার জানান, প্রায় ২০০ মিটার জুড়ে নদীর পাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর কথায়, “জরুরি ভিত্তিতে বালির বস্তা, পাথর ও তারজালি ফেলে ভাঙন রোধের কাজ চলছে। আপাতত এলাকা স্থিতিশীল হলেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে শীতের শুকনো মরশুম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ইতিমধ্যে নতুন প্রকল্প পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।”
এদিকে, এমএম তরাইয়ের এই ভয়াবহ পরিণতি স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছে। পর্যটন নির্ভর স্থানীয়রা বলছেন, স্পটটি ঘিরে গড়ে উঠেছিল ছোট ব্যবসা, খাবারের দোকান, গাড়ি ভাড়া, গাইডিং সার্ভিস, চা-বিক্রেতা, এমনকি স্থানীয় হোমস্টে পর্যন্ত। এখন সবই বন্ধ। অনেকে বলছেন, এই বিপর্যয়ের পর যদি প্রশাসন দ্রুত নতুন জায়গা তৈরি না করে, তাহলে বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়বেন। এই প্রেক্ষিতে নতুন করে পিকনিক স্পট তৈরির ভাবনা শুরু করেছে শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ (Siliguri Mahakuma Parishad)। পরিষদের সভাধিপতি অরুণ ঘোষ বলেন, “শীতের আগে নতুন কোনও স্পট তৈরি করতে চাই। নকশালবাড়ি, মাটিগাড়া বা ফাঁসিদেওয়া ব্লকের মধ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত কোনও এলাকা বেছে নেওয়া হবে। তবে নদীর গতিপথ ও নিরাপত্তা খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, “পিকনিক মৌসুম শিলিগুড়ির গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই সময় নষ্ট না করে বিকল্প স্থান খুঁজে তৈরি করতে প্রতিটি পঞ্চায়েত সমিতিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

সেচদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, বালাসনের জলরাশি মহানন্দা (Mahananda) নদীতে মিশেই রাজগঞ্জ (Rajganj)-এর পোড়াঝার (Porajhar) গ্রামেও প্লাবনের সৃষ্টি করেছিল। ৪ অক্টোবরের প্রবল দুর্যোগে মহানন্দার বাঁধের ৩০ মিটার ভেঙে গিয়েছিল। বালাসনের স্রোত ও মহানন্দার জলমিশ্রণে নিম্ন অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলমগ্ন হয়। সেচদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার রাজীব ঘোষ (Rajib Ghosh) জানান, “বাঁধটি আপাতত মেরামত করা হয়েছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য আগামী মাসে নতুনভাবে পুনর্গঠন প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।” উল্লেখ্য, পর্যটকদের মতে, বালাসনের এই ভাঙন শুধুমাত্র একটি পিকনিক স্পট ধ্বংস করেনি, প্রকৃতির ভারসাম্য ও নদী ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও সামনে এনেছে। পরিবেশবিদ সৌরভ দত্ত বলেন, “বালাসন ও মহানন্দা উপত্যকার অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ নদীশাসনের অভাব রয়েছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই নদীর গতিপথ বদলে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বিপজ্জনক হতে পারে।”
এখন প্রশাসনের লক্ষ্য, নদীর তাণ্ডব থামিয়ে মানুষকে নিরাপদ রাখা এবং বিকল্প পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা। এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বললেন, “মএম তরাইয়ের মতো সুন্দর জায়গা আর পাওয়া যাবে না, কিন্তু আশা করি প্রশাসন অন্তত এমন একটা স্থান তৈরি করবে যেখানে মানুষ আবারও আনন্দে ফিরতে পারবে।”
শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের কর্তারা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই নতুন জায়গা নির্ধারণে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শীতের আগেই যদি নতুন পিকনিক স্পট তৈরির কাজ শুরু করা যায়, তবে স্থানীয় মানুষ অন্তত কিছুটা আশার আলো দেখতে পাবেন।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ একুশ-তম কিস্তি)



