বিনীত শর্মা ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লি: ভারতকে অনেকেই এখনও দরিদ্র, বেকারত্ব ও অনাহারের দেশ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। অথচ, এই দেশেই রয়েছে এমন এক গ্রাম, যা বিশ্বের অর্থনীতিবিদদেরও চমকে দিয়েছে। গুজরাটের (Gujarat) কচ্ছ (Kutch) জেলার ছোট্ট এক গ্রাম: মধপর (Madhapar) এখন “বিশ্বের সবচেয়ে ধনী গ্রাম” হিসেবে পরিচিত।
গ্রামের প্রতিটি গলিতে ছড়িয়ে রয়েছে ঐতিহ্য, আত্মত্যাগ ও আর্থিক শৃঙ্খলার অনন্য ইতিহাস। সরকারি ও ব্যাঙ্ক সূত্র মারফৎ জানা গিয়েছে, এই গ্রামের মাত্র ৯২,০০০ বাসিন্দার ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিটের অঙ্ক ছাড়িয়েছে ₹৫,০০০ কোটি টাকারও বেশি। এটা শুধু একটা সংখ্যা নয়, ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন মুখ। একদিকে শহুরে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব, অন্যদিকে মধপরের এই উত্থান ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
বিদেশে ছড়িয়ে থাকা গ্রামের সাফল্য

মধপর গ্রামের প্রায় ১,২০০ পরিবার আজ আফ্রিকা (Africa) ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। কেনিয়া (Kenya), উগান্ডা (Uganda), তানজানিয়া (Tanzania) এবং ব্রিটেন (Britain)-এর মতো দেশে তাঁরা ব্যবসা, চাকরি ও উদ্যোক্তা হিসেবে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত। বিদেশে উপার্জিত অর্থের বড় অংশই তাঁরা পাঠান নিজেদের গ্রামে। এই রেমিট্যান্স (Remittance) -এর ওপর দাঁড়িয়েই তৈরি হয়েছে মধপরের আর্থিক ভিত্তি। বিশ্বব্যাংকের (World Bank) ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারত মোট ১১১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গুজরাট থেকেই এসেছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, “গুজরাটিদের উদ্যোক্তা মানসিকতা ও বিদেশে বিস্তৃত নেটওয়ার্কই মধপরের আর্থিক সাফল্যের মূলে।”
Follow : https://x.com/sasrayanews?s=09
সাধারণ গ্রাম, অসাধারণ অর্থনীতি
সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হল, এই গ্রামের ধনসম্পদের বাহ্যিক প্রকাশ প্রায় নেই। নেই কোনও বিলাসবহুল অট্টালিকা বা প্রাসাদ। মধপরের প্রতিটি বাড়ি সাধারণ, মাটির গন্ধে ভরা। একজন স্থানীয় বাসিন্দা রামজি ভাট (Ramji Bhatt) বলেন, “আমরা ধনকে প্রদর্শনের জন্য নয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও সমাজের কল্যাণে জমাই।” অন্যদিকে, এখানে এখন ১৭টি ব্যাঙ্ক শাখা রয়েছে: স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (SBI), আইসিআইসিআই (ICICI), এইচডিএফসি (HDFC), অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক (Axis Bank) ইত্যাদি সবাই অফিস খুলেছে এই ছোট্ট গ্রামে। মধপর এখন এক অর্থে একটি “রুরাল ফাইনান্স হাব (Rural Finance Hub)” হয়ে উঠেছে।
গৌরবময় ইতিহাস
শুধু অর্থনীতি নয়, দেশপ্রেমেও উজ্জ্বল মধপরের নাম। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানি বিমান হামলায় যখন ভারতীয় বিমান ঘাঁটি ধ্বংস হয়েছিল, তখন এই গ্রামের প্রায় ৩০০ মহিলা মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিমানবন্দরটি পুনর্নির্মাণ করেন। তাঁদের সেই অবদান ভারতের পাল্টা আক্রমণকে সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ২০১৫ সালে ভারত সরকার সেই ঘটনার স্মৃতিতে এখানে একটি যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ (War Memorial) নির্মাণ করে।
শিক্ষায় ও উন্নয়নে অগ্রগামী
১৮৮৪ সালে মধপরে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম সরকারি ছেলেদের স্কুল। ১৯০০ সালে গড়ে ওঠে মেয়েদের বিদ্যালয়। এখন এখানে আধুনিক স্কুল, হাসপাতাল, লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। গ্রামের প্রতিটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে স্থানীয় সমিতির মাধ্যমে। এছাড়াও, মধপরের গ্রামোন্নয়ন সমিতি (Madhapar Village Development Trust) নিয়মিত বৃত্তি দেয় উচ্চশিক্ষার জন্য।

গ্রামটি কেন বিশেষ
১. প্রতিটি পরিবার ব্যাংকে সঞ্চয় রাখে।
২️. গ্রামের সমস্ত রাস্তাঘাট পাকা ও পরিচ্ছন্ন।
৩️. গ্রামবাসীরা সরকারি সুবিধার উপর নির্ভর না করে স্বনির্ভর ব্যবস্থায় বিশ্বাসী।
৪️.সামাজিক সংহতি ও ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ হিসেবে মধপর গোটা রাজ্যে আদর্শ।
একজন প্রবীণ গ্রামবাসী দিলীপভাই ঠাকর (Dilipbhai Thakkar) বলেন, “আমাদের গ্রামের মূলমন্ত্র পরিশ্রম, সংযম ও শিক্ষা। এই তিন জিনিসই আমাদের এত দূর এনেছে।”
পর্যটনের নতুন গন্তব্য
ভুজ (Bhuj) শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মধপর। গুজরাট ভ্রমণে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এখন এই গ্রামে ভিড় জমাচ্ছেন। এখানকার সাধারণ চেহারার পেছনে লুকিয়ে থাকা ধনসম্পদ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনেকেরই কৌতূহল বাড়িয়েছে।
পর্যটন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, শিগগিরই এখানে ‘হেরিটেজ ভিলেজ ট্যুর (Heritage Village Tour)’ চালু হতে চলেছে, যাতে মধপরের ইতিহাস কাছ থেকে দেখা যায়।
অর্থনীতিবিদ ড. নীতিন দেসাই (Dr. Nitin Desai) বলেন, “মধপর প্রমাণ করেছে যে ভারতের গ্রামীণ সমাজে আর্থিক শৃঙ্খলা ও সংযম থাকলে, শহরের চেয়েও বেশি উন্নয়ন সম্ভব।” অন্যদিকে গুজরাট সরকারের এক আধিকারিক বলেন, “আমরা মধপর মডেল (Madhapar Model) সারা রাজ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই। এটি গ্রামীণ আত্মনির্ভর ভারতের দৃষ্টান্ত।”
বিশ্বের কাছে অনুপ্রেরণা
আজ যখন পৃথিবীর বহু দেশ মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় জর্জরিত, তখন মধপরের মতো একটি গ্রাম আত্মনির্ভর ভারতের (Atmanirbhar Bharat) প্রকৃত দৃষ্টান্ত। এখানকার মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছেন, উন্নয়ন মানে শুধু শহুরে ঝলমলেই নয়, সমাজ, শিক্ষা, দেশপ্রেম ও অর্থনৈতিক সচেতনতার সঠিক সমন্বয়।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী




