সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতা ও জেলা মিলিয়ে রাজ্যের টোটো (Toto) চালক ও যাত্রীদের মধ্যে এখন একটাই আলোচনা, ভাড়া কি বাড়তে চলেছে? পরিবহন দপ্তরের নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে টোটো রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। দিতে হবে ১,০০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি। তার পাশাপাশি মাসে মাসে ১০০ টাকা করে অতিরিক্ত ফি জমা দিতে হবে। এই ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও অসন্তোষ। একদিকে প্রশাসনের কড়া অবস্থান, অন্যদিকে টোটো চালকদের ক্ষোভ, দুই মিলে এখন আতঙ্কের আবহ। রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী (Snehasis Chakraborty) জানিয়েছেন, ‘৩০ নভেম্বরের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন না করলে টোটো বাতিল হবে। কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।’ অন্যদিকে, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) সরাসরি বলছেন, ‘বিধানসভা ভোটের আগে কেউই রেজিস্ট্রেশন করবেন না। এই সিদ্ধান্ত সরকারের টাকা তোলার পরিকল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।’ ফলে প্রশাসন বনাম বিরোধী, দুই তরফের দ্বন্দ্বের মধ্যেই দিশাহারা টোটো চালকেরা।
শহর হোক বা মফসসল, টোটোর দাপট এখন প্রতিটি গলিতে। বিগত ক’য়েক বছরে বাঁকুড়া (Bankura), বর্ধমান (Burdwan), নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া সহ রাজ্যের সব জায়গাতেই টোটোর সংখ্যা বেড়েছে ক’য়েকগুণ। বাঁকুড়া জেলা সদরে এখন প্রায় ৫ হাজার টোটো চলছে। বর্ধমান শহরে প্রতিদিন শহরের বাইরে থেকে গড়ে আরও ৫ হাজার টোটো প্রবেশ করে। অর্থাৎ এক দিনে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি টোটো শহরের রাস্তায় ঘুরছে। অথচ সরকারি রেকর্ডে এখনও টোটোর সংখ্যা মাত্র চার হাজার তিনশো।
টোটো চালকদের কথায়, এই সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে যাত্রী বাড়েনি ততটা। ফলে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এখন নতুন করে বছরে ১,২০০ টাকা ফি দিতে হবে শুনে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বর্ধমানের টোটো চালক সবিতা প্রামানিক (Sabita Paramanik) বললেন, ‘আমরা যাত্রীদের কথা ভেবে আগের ভাড়াতেই চলেছি। কিন্তু এখন খরচ বাড়ছে, রেজিস্ট্রেশন, ফি, বিদ্যুৎ, মেরামতি সব মিলিয়ে টোটো চালিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ভাড়া না বাড়ালে আর উপায় নেই।’ শুধু সবিতা নন, একই সুর আরও অনেক চালকের গলাতেও। কেউ বলছেন, মাসে মাসে ১০০ টাকা দেওয়া মানে বছরে আরও ১,২০০ টাকার বোঝা। আবার কেউ মনে করছেন, সরকার যদি এই টাকা নেয়, তাহলে তার বিনিময়ে পরিষেবা বা সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, যাত্রীদের মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ। অনেকেই বলছেন, ভাড়া এমনিতেই ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এখন যদি আরও বাড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। বর্ধমানের বাসিন্দা তপন ঘোষ বললেন, ‘টোটো এখন আমাদের প্রতিদিনের যাতায়াতের ভরসা। কিন্তু যদি ভাড়া ১০ থেকে ১৫ বা ২০ টাকায় ওঠে, তখন নিম্নবিত্ত মানুষের পক্ষে সেটা মেনে নেওয়া মুশকিল।’ কলকাতার টোটো ভাড়ার চিত্র আরও চমকপ্রদ। অফিস থেকে মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত স্বল্প দূরত্বের জন্য ভাড়া ৫০ টাকা পর্যন্ত। যেখানে একই দূরত্বে বাসে ভাড়া ১০ টাকা। যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, টোটো চালকেরা ইচ্ছেমতো ভাড়া নিচ্ছেন। যদি এখন সরকার নতুন করে রেজিস্ট্রেশন ফি চাপায়, তাহলে সেই খরচ শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই পকেট থেকে উঠবে।এদিকে প্রশাসনের দাবি, রেজিস্ট্রেশনের উদ্দেশ্য হল নিয়ন্ত্রণ আনা। বর্তমানে শহর ও মফসসল এলাকায় টোটো চালকদের উপর কোনও স্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ নেই। কিছু জায়গায় নীল ও সবুজ রঙের টোটো চালুর মাধ্যমে রোটেশন পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল, দিনে এক রঙ, রাতে আরেক। কিন্তু সেই নিয়ম এখন কার্যত ধুলিসাৎ। চালকরাই বলছেন, ‘কোনও নিয়মই আর মানা হয় না। যত খুশি টোটো চলছে। ফলে ভিড়, জ্যাম, ঝামেলা সবই বেড়েছে।’
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক হলেও যদি ভাড়া বৃদ্ধির চাপ যাত্রীদের কাঁধে পড়ে, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে? এক অর্থে এই সিদ্ধান্ত সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করলেও সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়াবে নতুন চাপ।
বর্তমানে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। এখন অনেক চালকই বলছেন, ‘এই খরচে পোষানো মুশকিল। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে ভাড়া ১৫ টাকা না করলে চলবে না।’ ফলে নভেম্বরের পর টোটো ভাড়ার হার যে বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। উল্লেখ্য, পরিবহন দপ্তরের তরফে অবশ্য বলা হয়েছে, রেজিস্ট্রেশন করলে চালকদের আইনি সুরক্ষা, বীমা এবং নির্দিষ্ট পারমিট মিলবে। তবে চালকদের বক্তব্য, ‘আমরা তো প্রতিদিন রাস্তায় নামছি। এখন যদি হঠাৎ এই নিয়ম আসে, তাহলে আগে ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত ছিল।’
এই মুহূর্তে রাজ্যজুড়ে টোটো নিয়ে চলছে চর্চা, তরজা, রাজনীতি। প্রশাসন বলছে ‘নিয়ম না মানলে বাতিল’, বিরোধী বলছে ‘ভোটের আগে কোনও রেজিস্ট্রেশন নয়।’ আর মাঝখানে সাধারণ মানুষ, যাদের যাত্রাপথ এখন প্রশ্নে ঝুলে আছে, ভাড়া কি সত্যিই বাড়বে?
নভেম্বরের শেষ নাগাদ যখন সময়সীমা শেষ হবে, তখনই স্পষ্ট হবে জল কোনদিকে গড়ায়, চালকের পকেট ফাঁকা হবে, না যাত্রীর কাঁধে চাপবে নতুন বোঝা!
ছবি প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Toto registration, e-rickshaw | নিবন্ধন না করলেই টোটো রাস্তায় চলবে না, বিজেপি-তৃণমূল দ্বন্দ্ব




