প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ কৌশল নিয়ে নতুন পরিকল্পনায় পথ সাজাতে চলেছে। বলা য়ায় রাজ্য রাজনীতিতে ক্রমশই একটি নতুন বাস্তবতার উদয় হচ্ছে শুধুমাত্র আবেগ, ধর্ম বা ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি দিয়ে আর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক জমি তৈরি সম্ভব হচ্ছে না। ভোটাররা এখন ক্রমশ বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বাস্তব জীবনের সমস্যা ও উন্নয়নমূলক ইস্যু-কে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে যে কয়েকটি ইস্যু মুখ্য হয়ে উঠতে পারে, সেগুলি হল কৃষি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, টেকনোলজি, নারী সুরক্ষা, শিক্ষা সংস্কার ও শিল্পায়ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যুগুলিকে কেন্দ্র করে যদি বিজেপি সুসংগঠিত ও প্রমাণনির্ভর রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে পারে, তবে রাজ্যের রাজনীতিতে একটি বড় ধরণের পালাবদলের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

এর মধ্যে কৃষি গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্কের চাবিকাঠি একটি স্রোত। বাংলার রাজনীতিতে গ্রামীণ জনসংখ্যার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি এই রাজ্যের অর্থনীতির এক অন্যতম স্তম্ভ। কিন্তু আজও বহু কৃষি পরিকাঠামো, বাজারদর, সেচব্যবস্থা ও উৎপাদন ব্যয়ের অসামঞ্জস্য নিয়ে সংগ্রাম করছেন। কৃষক ঋণ, ফসলের ন্যায্য দাম এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতি না হলে তাঁদের জীবনযাত্রা বদলানো সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় স্তরে প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি বা কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের মতো উদ্যোগকে রাজ্যে কার্যকরভাবে প্রয়োগ ও প্রচার করতে পারলে বিজেপি গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্কে শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষক সংগঠনগুলির সঙ্গে বাস্তব সংলাপ ও গ্রামে গ্রামে প্রশিক্ষণ শিবির এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। এই পরিকল্পনা বিজেপির গ্রামীণ কৃষি ভোটের এক বিরল পথ হতে পারে।
অন্যদিকে কর্মসংস্থান যুব সমাজের আশা ও হতাশা কারণ গুলি দেখে নতুন ভাবে নিজেদের সঠিক পর্যালোচনা করে এগিয়ে যেতে হবে। এই রাজ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এখন একটি গুরুতর রাজনৈতিক ইস্যু। স্নাতক ও উচ্চশিক্ষিত যুবকদের মধ্যে চাকরির অভাব এবং সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্নীতি নিয়ে ক্ষোভ স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী শিল্প না থাকায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত। এই পরিস্থিতিতে বিজেপি যদি স্পষ্ট কর্মসংস্থান রূপরেখা, যেমন ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য কর ছাড়, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরির পরিকল্পনা, এবং বেসরকারি খাতে দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের রাস্তাগুলি তুলে ধরতে পারে, তবে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রমাণযোগ্য নীতি ও সময়সীমাসহ বাস্তব রোডম্যাপ থাকলে এই ইস্যুটি নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে আগামী বিধানসভা ভোটের মূল ভিত্তি ।
আবার বলা যেতে পারে স্বাস্থ্য কোভিড পরবর্তী সময়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সারা বিশ্বে। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কোভিড পরিস্থিতিতে আতঙ্কের আভা দেখা দিয়েছিল। এই মহামারি রাজ্যকে টলিয়ে দিয়েছিল। কারণ উন্নত স্বাস্থ ব্যবস্থা না থাকা। ফলে কোভিড মহামারির সময় রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শহরাঞ্চলে কিছু পরিকাঠামো থাকলেও, গ্রামীণ ও অজপাড়া গাঁয়ে এখনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অভাব, চিকিৎসক সংকট ও ওষুধের অপ্রাপ্যতা একটি বড় সমস্যা। বিজেপি যদি জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন, বেসরকারি ও সরকারি অংশীদারিত্বে আধুনিক হাসপাতাল তৈরি, ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীদের নেটওয়ার্ক গঠন-এর মতো পরিকল্পনা জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারে, তবে স্বাস্থ্য ইস্যুতে একটি বিকল্প রাজনৈতিক আখ্যান তৈরি সম্ভব বলে মনে করছে ওয়াকিবহালমহল।
আবার টেকনোলজি নতুন প্রজন্মের উন্নয়নের চাবিকাঠি। ডিজিটাল ইন্ডিয়া অভিযানের আওতায় দেশজুড়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসার ঘটলেও, রাজ্যে এখনো অনেক ক্ষেত্রে ই-গভর্ন্যান্স ও ডিজিটাল অবকাঠামো দুর্বল। ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা, স্কুলে প্রযুক্তি শিক্ষার অভাব ও প্রশাসনিক কর্ম প্রযুক্তি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, একটি কাজের সমাধান হতে মানুষকে একাধিক দিন ঘুরতে হয় এটাও যেমন কারণ, আবার সুস্থ জীবনের পথে যেতে প্রশাসনিক মহলের প্রতি মানুষের সর্বাধিক কাজ থেকে ফলে মানুষ দ্রুত সমাধান চাই এই ডিজিট্যাল সমস্যার যুগে। প্রযুক্তিকে শিক্ষা, প্রশাসন ও শিল্পক্ষেত্রে আধুনিকায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে বিজেপি একটি প্রগতিশীল, উন্নয়নমুখী ইমেজ গড়ে তুলতে পারে। বিশেষত তরুণ প্রজন্ম ও শহুরে মধ্যবিত্ত ভোটারদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে।
আমাদের নারী সুরক্ষা সামাজিক আস্থার প্রশ্ন হয়ে যায়। রাজ্যে নারী সুরক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। নারীর উপর অপরাধ, বিচারপ্রক্রিয়ার বিলম্ব, এবং প্রশাসনিক গাফিলতির বিরুদ্ধে তীব্র জনরোষ তৈরি হয়েছে। বিজেপি যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থান, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া, ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার রূপরেখা জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারে, তবে নারী ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব বিস্তার সম্ভব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারী ভোটাররা অনেক সময় ‘নিরাপত্তা’ ইস্যুতে দল বেছে নেন, যা ভোটের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

আমরা সকলেই জানি যে, শিক্ষা সংস্কার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষা রাজ্যের ঐতিহ্যের অংশ হলেও বর্তমানে স্কুল ও উচ্চশিক্ষায় মান ও অবকাঠামোর ঘাটতি প্রকট। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, পাঠ্যক্রমের আধুনিকীকরণের অভাব, ও বেসরকারি শিক্ষার ব্যয়বৃদ্ধি সমাজের বিভিন্ন স্তরে ক্ষোভ তৈরি করছে। বিজেপি যদি স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, আধুনিক পাঠ্যক্রম, ও ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার নিয়ে বাস্তবসম্মত সংস্কার প্রস্তাব দেয়, তাহলে শিক্ষা ইস্যুতে তারা একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে উঠে আসতে পারে।
শিল্পায়ন দীর্ঘস্থায়ী সমৃদ্ধির পথ গড়ে তুলতে হবে। রাজ্যের শিল্পায়ন প্রায় দুই দশক ধরে স্থবির অবস্থায় রয়েছে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের পর শিল্প-নীতিতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা আজও কাটেনি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, স্থায়ী শিল্পাঞ্চল তৈরি, পরিবেশ ও ভূমি নীতিতে স্বচ্ছতা আনা। এই তিনটি দিকেই সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারলে বিজেপি রাজ্যের অর্থনীতিতে একটি নতুন বার্তা দিতে পারে। শিল্পায়নের সঙ্গে কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়ন স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ইস্যু।
বাস্তব ইস্যু-কেন্দ্রিক রাজনীতি, বিজেপির সম্ভাবনার রাস্তা। রাজ্যের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আবেগ, দলীয় আনুগত্য ও নেতানির্ভরতায় আবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। শিক্ষিত ও তথ্যসচেতন ভোটাররা এখন জানতে চাইছেন “কে কী করবে, কবে করবে, কীভাবে করবে”। এই প্রেক্ষাপটে কৃষি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, নারী সুরক্ষা, শিক্ষা সংস্কার ও শিল্পায়ন এই সাতটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিজেপি যদি বাস্তবভিত্তিক, প্রমাণযোগ্য ও স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে পারে, তবে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। রাজনীতি এখন ধীরে ধীরে ফিরে আসছে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ইস্যুতে। আগামী নির্বাচনে এই বাস্তবধর্মী ইস্যুগুলিই নির্ধারণ করবে কোন শক্তি জনআস্থার আসনে আসীন হবে, আর কে পিছিয়ে পড়বে।
ছবি: সংগৃহীত



