সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত দর্শনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজ্যের এক বিশেষ রূপবদলের সময় আগামী ‘২৬ যা এক নতুন যুগের সূচনা ঘটতে চলেছে। কে হবে এই রাজ্যের মুখ্য মুখ। জনগণ কি চাইছে সমস্ত কিছু নিয়ে রাজনৈতিক কলমে কলম ধরলেন–
দেবব্রত সরকার
(আজ এগারোতম কিস্তি)

পশ্চিমবঙ্গ ভোট রাজনীতির উৎকর্ষ : তৃণমূল, বিজেপি ও বাম-কংগ্রেস শক্তির উৎস, ভোটার চাহিদার মনস্তত্ত্ব
পশ্চিমবঙ্গ ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের দিকে ধাওয়া করছে, আর রাজ্য রাজনীতির গহীন মন্ত্রে রচনা হতে আছে একটি নতুন অধ্যায়। এই রাজ্যে রাজনীতির “কর্কশ যুদ্ধ” কখনওই থামে না। এটি এক বিশেষ মঞ্চ যেখানে রাজনৈতিক শক্তি, জনসংযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আবেগ একসঙ্গে কার্যকর হয়। এই নির্বাচনে তিন প্রধান রাজনৈতিক ধ্রুবক তৃণমূল (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়), বিজেপি এবং বাম-কংগ্রেস (Left + Congress) প্রত্যেকেই নির্ধারণ করতে চাইছে কোথায় তারা দাঁড়াতে পারবে। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব:
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্তির উৎস
- বিজেপির শক্তির কেন্দ্র
- বাম + কংগ্রেসের সীমাবদ্ধতা ও শক্তি
- সাধারণ মানুষ কাকে বেশি সমর্থন করছে, কেন
- মোদি ম্যাজিক ও তার প্রভাব — বিশেষ করে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ ভোটে

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্তির উৎস (তৃণমূল)
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির মুখ, একটি চরিত্রি যিনি রাজ্যের রাজনীতি ও জনসংযোগ ক্ষমতা খুব দক্ষভাবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর শক্তির কিছু মৌলিক উৎস:
লোকসভা : ভোট পরিচিতি : মমতার জনপ্রিয়তা, “দিদি” স্লোগান ও ব্যক্তি ব্র্যান্ড অনেক গভীর। অনেক ভোটার মনে করেন, তিনি মানুষের কাছাকাছি, দুর্নীতি, প্রশাসন, জনসাধারণের রুটি-রুজি বিষয়ে আগ্রহ দেখান। এই ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড অনেক ভোটারকে আবদ্ধ করে রাখে, এমনকী তারা তৃণমূল সরকারের সমালোচনায় হলেও মমতাকে ভুলে পারে না।
ভরণ-পোষণ ও সামাজিক প্রকল্প : তৃণমূল শাসনের সময় বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণ প্রকল্প, খাদ্য, স্বাস্থ্য, গ্যাস, পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (যেমন গ্যাস সংযোগ, খাদ্য নিরাপত্তা, বাড়ি নির্মাণ) ভোটারদের দৃষ্টিতে শক্তি হিসাবে কাজ করেছে। এই প্রকল্পগুলি সরল জনগণের পাশে থাকার বার্তা দেয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কার্যকর প্রভাব ফেলে।
মাঠ স্তরের সংগঠন ও পায়ের তলায় উপস্থিতি : তৃণমূলের জেলা, ব্লক, গ্রাম স্তরে এক শক্তিশালী পার্টি সংগঠন আছে। পুরোনো কাজ, জনপ্রতিনিধি, দলীয় কর্মী শক্তি সবকিছু মমতার ঘনিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণে। প্রতিটি আসনে মাঠ-প্রশাসন ও জনসাধারণের অভিযোগ-সুযোগ দ্রুত তৃণমূলের যোগাযোগেই আসে।
সাংস্কৃতিক ও সত্তার রাজনীতি : বাংলার সাংস্কৃতিক গর্ব, ভাষা, আঞ্চলিক সত্তা মমতা কাজে লাগান। “জয় বাংলা”, “বাংলার মানুষ” এসব প্রতিপাদ্য পশ্চিমবঙ্গের জনমনে কার্যকর। এটি একটি স্থানীয় সত্তার রাজনীতি, যা কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক শ্লোগান থেকে আলাদা অনুভূতি দেয়।
প্রতিরোধ ও লড়াই সাংকেতিক শক্তি : মমতা অনেক সময় কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ, বিরোধ, অপপ্রচার ইত্যাদি দাবি করে রাজ্য-শাসনকে একটি ভবিষ্যতের প্রতিরোধ” অবস্থান তুলে ধরেন। এটি তাঁর সমর্থকদের মধ্যে লড়াকু চেতনা জাগ্রত করে। মমতার লক্ষ্য হল ২০২৬ নির্বাচনে ২১৫+ আসন অর্জন করা। যদিও ২০২১-এ তৃণমূল ২১৩ আসন পায়, সেই ভিত্তিতে তিনি নতুন উচ্চতা চাইছেন।

বিজেপির শক্তির উৎস
বিজেপি আগেই বিভিন্ন রাজ্যে সফলভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তাদের পশ্চিমবঙ্গ অভিযানে কিছু শক্তিশালী ভিত্তি-
জাতীয় নেতৃত্ব ও মোদি ব্র্যান্ড : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) একটি বড় রাজনৈতিক আকর্ষণ। ‘মোদি ম্যাজিক’ নামে পরিচিত তার জনপ্রিয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও আশার প্রতীক। বিশেষ করে উন্নয়ন, পরিষেবা ও স্বদেশ-পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিতে মোদী একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীক। Deccan Herald -এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মোদীর ‘পরিষ্কার ইমেজ’ বিজেপির জন্য এক পরিষ্কার অ্যাসেট।
কেন্দ্রীয় নীতির সুবিধা ও অনুদান : বিজেপি যখন কেন্দ্রশাসন করে, তখন রাজ্যগুলোর জন্য বিভিন্ন সহায়তা-প্যাকেজ, প্রকল্প অনুদান ও কেন্দ্রীয় যোজনাপ্রদান আরও বেশি হয়ে ওঠে। ভোটার স্বভাবতই কেন্দ্রীয় সহযোগিতা ও উন্নয়নের আশায় প্রতিক্রিয়া দেয়।
সাংগঠনিক শক্তি ও হাই-প্রোফাইল প্রচার: RSS ও স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক, প্রচার পীঠ ও ডিজিটাল মিডিয়া সক্ষমতা বিজেপিকে দ্রুত জনমানসে পৌঁছাতে সহায়তা করে। ‘দিদি-দাদা’ যুদ্ধ বিতর্কে BJP–TMC প্রচারে উত্তেজনা বেশি হচ্ছে।
পরিবর্তন এবং বিরোধী ভোটার আকর্ষণ : যদি কোনও ভোটার তৃণমূল শাসনের দুর্বলতা দেখতে পান, তাহলে তারা বিজেপিকে বিকল্প হিসেবে দেখতে পারেন। অবক্ষয়, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও আইন-শৃঙ্খলা সমস্যার বাতাসে বিজেপির ‘পরিবর্তন’ বার্তা প্রচার শক্তিশালী ভিত্তি।
আইডেন্টিটি রাজনীতি ও দলীয় ইমেজ : কেন্দ্রীয় হিন্দুত্ববাদ, জাতীয়তাবাদ, সুরক্ষা, সাংস্কৃতিক রাজনীতি এসব বার্তা BJP ভোটারকে স্পর্শ করে। বিশেষ করে, মাইগ্রেশন, জাতীয় সংহতি, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়গুলি বাংলায় বিজেপি -এর একটি রাজনীতিক ট্রাম্পকার্ড হতে পারে।

বাম + কংগ্রেস: সীমাবদ্ধতা ও কিছু শক্তি
বাম ও কংগ্রেস এককালীন পশ্চিমবঙ্গের শক্তি ছিল। তবে বর্তমানে তাদের কিছু সুখকর শক্তি থাকলেও সীমাবদ্ধতাও প্রচুর।
শক্তি: ঐতিহ্য ও আদর্শভিত্তিক সমর্থক: বাম-চলন ও সমাজবাদমূলক নীতি যা শ্রমিক, কৃষিজীবী ও নিম্নবর্গের কাছে একটি আদর্শ চিহ্ন।
ঐক্য: কংগ্রেস ও বাম জোট রূপে যদি এক সঙ্গে কাজ করে, তাহলে বিরোধী শক্তি হিসেবে পুনরুজ্জীবন ঘটতে পারে।
নির্বাচনী অভিজ্ঞতা: রাজ্য রাজনীতিতে দীর্ঘ ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে, বিভিন্ন আইনপ্রণয়ন, রাজনৈতিক আন্দোলন ও জনসংযোগের দক্ষতা রয়েছে।
সীমাবদ্ধতা: সংগঠন ধ্বংস, কর্মী বিচ্যুতি: অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা দল ত্যাগ করেছেন। দলের মাঠ সংগঠন অনেক দুর্বল।
তরুণ প্রজন্মের অভাব: তরুণ, ডিজিটাল মিডিয়া ও নতুন রাজনীতি দৃষ্টিভঙ্গিতে অপর্যাপ্ত অভ্যুত্থান।দ্বিধান্বিত ইমেজ: অনেক ভোটার মনে করে, বাম ও কংগ্রেস প্রচলিত রাজনৈতিক কৌশলগুলোতে আটকে যায়, বাস্তব অভিলাষ ও পরিবর্তন প্রদর্শনে ব্যর্থ।কেন্দ্রীয় সহযোগিতার অভাব: কেন্দ্রে তারা প্রযোজ্য নীতি বা প্রকল্পের সুযোগ কম পায়, ফলে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ময়দানে জনপ্রিয়তার দিক থেকে পিছিয়ে থাকে।

জনগণ কাকে বেশি চাইছে : মনস্তত্ত্ব ও প্রেক্ষাপট
বর্তমানে ভোটারদের চাহিদা কিছু পরিবর্তিত হয়েছে, তারা শুধুমাত্র নির্বাচনী প্রতিপাদ্য নয়, বাস্তব উন্নয়ন, পরিষেবা, সুযোগ ও নিরাপত্তা চায়। যে দল এই চাহিদা পুরোন করবে, তারা জিতে যেতে পারে। এই সবের দিক থেকে বর্তমান এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। তবে সাংগঠনিক শক্তি তৃণমূলের চেয়ে অনেক দুর্বল, ফলে এই দিকে নজর রাখতে হবে বিজেপির মূল নেতা-নেত্রীদের।
পরিবর্তন ও আকাঙ্ক্ষা: অনেক মানুষ চান একটি নতুন, গতিশীল সরকার, বিশেষ করে তরুণ বা গ্রামের মানুষ উন্নয়ন, চাকরি ও কাজের সুযোগ চান।
আস্থা ও বিশ্বস্ততা: মোদী এর আগে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা ও নীতি পরিবর্তনে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন। যারা পরিবর্তন-আশায় আছেন, ভোগে, তারা BJP -এর হাত ধরে আসতে পারেন।
ভেদাভেদ ও পরিচয় রাজনীতি: বাংলার সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সত্তার রাজনীতি তৃণমূল ও BJP উভয়েরই কেন্দ্রবিন্দু। ভোটাররা এই নিরিখে যে-কোনও দলকে বেশি সাথী হিসেবে দেখতে পারেন যারা তাদের সত্তাকে গড়ে তুলতে চায়।
মিডিয়া ও প্রচারাভিযান: আজকের যুগে মিডিয়া শক্তি ভোটের দিক পরিবর্তন করতে পারে। যা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, তার সুযোগ পায়।যেহেতু তৃণমূল এ রাজ্যে দীর্ঘ শাসন করেছে, বিরোধীরা প্রায়ই অভিযোগ তুলে যে জাল ভোট, প্রশাসনিক দমনে অংশগ্রহণ ইত্যাদি হয়েছে। BJP এই অভিযোগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
মোদী ম্যাজিক আসলে কি?
‘মোদী ম্যাজিক’ একটি রাজনৈতিক প্রচারশব্দ হলেও এর একটি বাস্তব ভিত্তিও আছে। মোদী সরকারের কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ও নীতি যা পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে।
আর্থিক ও অবকাঠামো উন্নয়ন: রেল গতি প্রকল্প, রেল ও সড়ক সংযোগ বৃদ্ধির নীতি, নতুন শিল্প পরিকল্পনা।
বহুবিধ প্রকল্প এবং যোগাযোগ শক্তি: ডিজিটাল ইন্ডিয়া, যোগাযোগ ও সেলুলার অবকাঠামোকে প্রবলভাবে বৃদ্ধি।
বিদেশনীতি ও শোষণী অর্থনৈতিক চেহারা: ভারতকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দৃঢ় করে তোলা, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, ‘নতুন ভারত’ ভাবনায় আত্মবিশ্বাস বাড়ানো।
নিরাপত্তা ও আইন শৃঙ্খলা: ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি, সীমান্ত কসরৎ ও সন্ত্রাস মোকাবিলা এসব ব্যাপারে মোদি সরকারের দৃঢ় অবস্থান ভোটারে আস্থা জাগায়। বিহারে, তিনি নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন এবং ভোটগণনার আগে গত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় প্রচার ও উন্নয়ন প্রকল্পকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। West Bengal -এ BJP ‘দিদি-দাদা’ যুদ্ধ শুরু করেছে, মোদী বজায় রেখেছেন কেন্দ্রীয় আক্রমণ ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের কথাবার্তা। যদিও মোদী ম্যাজিক বাস্তবতা নয়, কিন্তু তাঁর ব্র্যান্ড, কেন্দ্রীয় প্রকল্প ক্ষমতা ও প্রচারণাগত শক্তি মাঝেমধ্যে ‘আধ্যাত্মিক উষ্ণতা’ অবস্থা তৈরি করে, কিছু ভোটারকে বিশ্বাস দেয়।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথ
ভোট রাজনীতিতে কেবল বিকল্প দিক নয়, বাস্তব নীতি, দায়িত্বশীল প্রশাসন ও জনসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধার অপরিহার্য। যদি মমতা, BJP বা বাম-কংগ্রেস কেউ ভোটারের বিশ্বাস ও আপেক্ষিক চাহিদা মেটাতে না পারে, তাদের ভূমিকা ক্ষয় হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের নির্ধারিত ২৯৪ আসন সংক্রান্ত প্রতিযোগিতায় যে দল ১৪৮+ পাবে, সেটিই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে। এই প্রেক্ষিতে, মোদী ম্যাজিক, মমতার স্থানীয় ঘনিষ্ঠতা ও বিজেপির বাহ্যিক শক্তি, সবই মিলিয়ে এক কঠিন লড়াই হবে।ভোটাররা কীই বা চায়! পরিবর্তন, উন্নয়ন, পরিষেবা, সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা। সেই চাহিদার পূরণে যারা সবুজ সংকেত দেবেন, তাদেরই বিজয় সম্ভাবনা বেশি।
(চলবে)
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত




