ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের নতুন অধ্যায়: সের্জিও গরকে স্বাগত জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
সাশ্রয় নিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক | নয়াদিল্লি, ৯ অক্টোবর, ২০২৫
ভারত–মার্কিন সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। শুক্রবার নয়াদিল্লিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সের্জিও গর (Sergio Gor)-সাক্ষাৎ করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)-র সঙ্গে । এই সাক্ষাতের পর থেকেই কূটনৈতিক মহলে জোর আলোচনা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর এক্স (X) পোস্টে লিখেছেন, “মার্কিন রাষ্ট্রদূত মনোনীত সের্জিও গরকে (Ambassador-designate Sergio Gor) স্বাগত জানাতে পেরে আনন্দিত। আমি নিশ্চিত, তাঁর মেয়াদকাল ভারত-মার্কিন ‘Comprehensive Global Strategic Partnership’ আরও মজবুত করবে।”
এই সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ সাড়া ফেলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত মার্কিন সম্পর্ক বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে দুই দেশ শুধু সহযোগী নয়, বরং কৌশলগত অংশীদার। সের্জিও গর সেই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন বলেই মত কূটনৈতিক মহলের। সের্জিও গর নিজে একজন অভিজ্ঞ প্রশাসক ও কূটনীতিক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মার্কিন রাজনীতি, যোগাযোগ কৌশল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। হোয়াইট হাউস থেকে শুরু করে রিপাবলিকান পার্টির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তিনি সামলেছেন। তাঁর নিয়োগকে তাই অনেকেই বলছেন “স্ট্র্যাটেজিক সিগন্যাল” বিশেষত এমন সময়ে যখন ভারত–আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সহযোগিতা চলছে। দুই দেশের মধ্যে ‘Comprehensive Global Strategic Partnership’ শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, সাপ্লাই চেইন সিকিউরিটি, সাইবার ডিফেন্স, এবং ইন্দো–প্যাসিফিক (Indo-Pacific) অঞ্চলে নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রেই দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে কোয়াড (QUAD) গোষ্ঠীর ভূমিকা আরও জোরদার হয়েছে, যেখানে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাশাপাশি থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাজ করছে। ভারতের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, সের্জিও গর-এর আগমন ভারতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনও ভারতকে এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে। সের্জিও গরকে এমন এক সময়ে পাঠানো হয়েছে, যখন বিশ্বরাজনীতি ক্রমেই বহুমুখী হয়ে উঠছে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, চীন তাইওয়ান ইস্যু এর মাঝেও ভারত মার্কিন সম্পর্ক স্থিরভাবে এগোচ্ছে। এক সিনিয়র কূটনৈতিক বিশ্লেষক সাশ্রয় নিউজকে জানান, “সের্জিও গর প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মানুষ। তিনি হোয়াইট হাউসের ভেতরের কাজ জানেন, আবার ভারত সম্পর্কেও অবহিত। তাই তাঁর নিয়োগ একদিকে রাজনৈতিক, অন্যদিকে কৌশলগত। এই সম্পর্ক এখন শুধু ‘ডিপ্লোম্যাটিক টক’ নয়, বরং ‘ডেলিভারি বেসড পার্টনারশিপ’।“ প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বে গত এক দশকে ভারত আমেরিকা সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ‘Make in India’, ‘Digital India’ থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে যৌথ উদ্যোগ সবক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও ভারতকে এশিয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসেবে দেখছে।
ওয়াশিংটনে ভারতীয় দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “সের্জিও গর এমন এক কূটনীতিক যিনি রাজনৈতিক বোঝাপড়ার পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও উদ্যোক্তা মহলকেও ভালোভাবে বোঝেন। তাঁর নেতৃত্বে দুই দেশের ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক আরও গভীর হবে।” ভারত আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্ক বর্তমানে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও নবায়নযোগ্য শক্তি ক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি হস্তান্তর-এর ক্ষেত্রে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে, যা আগামী দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি নির্ধারণ করতে পারে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (MEA) এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, “আমরা আশা করছি, সের্জিও গর ভারত–মার্কিন সম্পর্ককে আরও মানবিক ও জনগণের জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করবেন। শুধু সরকার পর্যায়ের সম্পর্ক নয়, শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্টার্টআপ ও বিজ্ঞানচর্চায়ও দ্বিপাক্ষিক সংযোগ বাড়বে।” বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৫-এর এই সময়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের জন্য শুধু সহযোগী নয়, বরং স্ট্র্যাটেজিক সহযাত্রী (Strategic Allies) হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এই সম্পর্ক নতুন ভারসাম্য আনতে পারে। তবে এই সম্পর্কের মধ্যে এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেমন বাণিজ্য শুল্ক, তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের ভিসা নীতি, এবং চীনের ভূমিকা। কিন্তু দুই দেশের নেতৃত্ব এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন যেখানে পার্থক্যের চেয়ে মিল বেশি। সের্জিও গর এই ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন। সের্জিও গর-এর জীবনী থেকে জানা যায়, তিনি নিজেকে একজন “Bridge Builder” হিসেবে দেখেন অর্থাৎ, দুই ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করাই তাঁর লক্ষ্য। ভারত সফরে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও গবেষণা কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদির এই সাক্ষাৎ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রোটোকল নয়, বরং এটি ভারতের বৈদেশিক নীতির ধারাবাহিকতা ও আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ। বিশ্বমঞ্চে ভারতের ভূমিকা যেমন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও এখন ভারতের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিশ্বশক্তির ভারসাম্য রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা নিতে আগ্রহী। ভারতের তরুণ প্রজন্ম, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম, প্রযুক্তি খাত সবই আজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। সের্জিও গর এই প্রজন্মের ‘নতুন সেতুবন্ধন’ হিসেবে কাজ করতে পারেন বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। তাঁর উপস্থিতি ভারত-মার্কিন সম্পর্কের মানবিক ও সাংস্কৃতিক দিকটিকেও আরও দৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী যখন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে, তখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা শুধু দুই দেশের নয়, বরং গোটা ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সের্জিও গর-এর দায়িত্বপ্রাপ্তি তাই শুধু কূটনৈতিক নয়, একে অনেকেই বলছেন “Symbol of Stability and Strategic Trust”।




