‘বাংলায় রাজনৈতিক হিংসার সূত্রপাত তৃণমূলের-বিস্ফোরক দিলীপ ঘোষ, বিজেপির ভবিষ্যৎ নিয়ে উঠল প্রশ্ন’

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ৯ অক্টোবর ২০২৫: বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে ফের চাঞ্চল্য। রাজ্যের রাজনীতিতে ফের বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)। তাঁর দাবি, বাংলায় রাজনৈতিক হিংসার বীজ বপন করেছে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)। এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মারধর, বাধা দেওয়া, সভার অনুমতি না দেওয়া, এসব এখন নিত্যদিনের ঘটনা। আজ তো বিষয়টা আরও বাড়তে বাড়তে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।”

দিলীপবাবুর এই মন্তব্যকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষত এমন সময়ে, যখন বিজেপির সংগঠন রাজ্যে কার্যত কোণঠাসা অবস্থায়, তখন এই মন্তব্য অনেকেই দলের ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক মহলে অনেকে মনে করছেন, দিলীপ ঘোষ শুধু অভিযোগই করেননি, বরং পরোক্ষভাবে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকেও বার্তা দিয়েছেন দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে পুরনো লড়াকু নেতৃত্বকেই ফিরিয়ে আনতে হবে। তাঁর কথায়, “আমাদের দলের কর্মীরা যেখানেই কাজ করতে যাচ্ছেন, তৃণমূলের গুন্ডা বাহিনী বাধা দিচ্ছে। খগেন মুর্মু (Khagen Murmu) আর শংকর ঘোষ (Shankar Ghosh) ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়েছিলেন, সেখানেও তাদের উপর হামলা হয়েছে। এটা কি গণতন্ত্র?” দিলীপবাবুর অভিযোগ, “এই রাজ্যের সমস্ত হিংসাত্মক ঘটনার পিছনে আছে তৃণমূল কংগ্রেস। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই এখন প্রশাসনের চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

রাবণ দহন ঘিরে সংঘাতের অভিযোগ

দিলীপ ঘোষ আরও জানান, এবারের রাবণ দহন অনুষ্ঠান পর্যন্ত রেহাই পায়নি। তাঁর কথায়, “আমাদের জঙ্গলমহলে রাবণ দহন কর্মসূচি হয়, খড়গপুর (Kharagpur) ও আশেপাশের এলাকায়ও হয়। এ বছর তৃণমূলের লোকেরা জোর করে নয়টি জায়গায় রাবণ দহনের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “বাগেশ্বর বাবার (Bageshwar Baba) সভাটাও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) বাতিল করে দিয়েছেন। এখন তো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও রাজনীতির জালে বন্দি।” এই অভিযোগ ঘিরে রাজ্যের সাধারণ মানুষ ও বিশেষ করে জঙ্গলমহল ও উত্তরবঙ্গের (North Bengal) ভোটারদের মধ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন “দুর্গাপূজার পর রামলীলার সময়েও যদি রাবণ দহন বন্ধ হয়, তাহলে ধর্মের স্বাধীনতা কোথায়?”

তৃণমূলের পাল্টা সুর

তৃণমূলের পক্ষ থেকে অবশ্য প্রতিক্রিয়া এসেছে তীব্র ভাষায়। দলের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ (Kunal Ghosh) বলেছেন, “আমরা কোনও রকম হিংসা সমর্থন করি না। বিজেপিরা ফটো সেশনের জন্য গিয়েছিল, লোকেরা রেগে গেছে। প্রশাসন নিজের কাজ করছে।” তৃণমূলের আরেক নেত্রী সায়নি ঘোষ (Sayani Ghosh) বলেন, “ত্রিপুরায় (Tripura) আমাদের অফিস ভাঙা হয়েছে, পুলিশ কিছু করেনি। বাংলার মতো গণতন্ত্র কোনও বিজেপি শাসিত রাজ্যে নেই। দিলীপ ঘোষের মতো বড় নেতার এসব বলে কী লাভ?”

ত্রিপুরার ঘটনায় নতুন তুলনা

উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে বিজেপি এখনও প্রভাবশালী হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংগঠনের ভাঙন নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে দলের ভেতরেও। এই সময়েই দিলীপ ঘোষের এমন মন্তব্য দলীয় নেতৃত্বের ভেতরে চাপ তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দিলীপ ঘোষ একদিকে যেমন তৃণমূলকে কাঠগড়ায় তুলেছেন, অন্যদিকে দলের ভেতরেও পরোক্ষ বার্তা দিয়েছেন তাঁর সময়েই বিজেপি রাজ্যে সবচেয়ে ভালো ফল করেছিল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ১৮টি আসন, ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে ৭৭টি আসন এই দুই সাফল্যের পেছনে সংগঠনের মুখ ছিলেন তিনিই।

দিলীপ ঘোষই বিজেপির ভবিষ্যৎ মুখ

রাজনৈতিক মহলের একাংশের বক্তব্য, দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বে রাজ্য বিজেপি একসময় গ্রামীণ ভোটে প্রবেশ করতে পেরেছিল। তাঁর জনসংযোগ, মাঠপর্যায়ে সরাসরি উপস্থিতি, এবং নির্ভীক রাজনৈতিক ভাষা তাঁকে আলাদা জায়গায় রেখেছিল। এক প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “মোদীর (Narendra Modi) বিকল্প যেমন নেই, তেমনই বাংলায় দিলীপ ঘোষের বিকল্পও এখনও তৈরি হয়নি। বিজেপি যদি ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ভালো ফল চাই, তাহলে দিলীপ ঘোষকে গুরুত্বপূর্ণ পদে ফেরাতে হবে।” দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দিলীপ ঘোষের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পুনর্বহালের আলোচনা চলছে। যদিও এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপির পক্ষ থেকে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। উল্লেখ্য, দিলীপ ঘোষের অভিযোগে নতুন করে ধর্মীয় রাজনীতির বিতর্কও উস্কে উঠেছে। রাবণ দহন বা ধর্মীয় উৎসব বন্ধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অন্যদিকে তৃণমূল এই অভিযোগকে “নিরর্থক প্রোপাগান্ডা” বলেই উড়িয়ে দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও এই প্রসঙ্গে সরাসরি কিছু না বললেও প্রশাসনিক মহল সূত্রে জানা গেছে, সরকার উৎসবের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়তি সতর্কতা নিচ্ছে।

দিলীপ ঘোষের এই প্রকাশ্য আক্রমণ কিন্তু বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বকেও বিব্রত করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এই মন্তব্য দলের ভেতরের হতাশা ও নেতৃত্ব সংকটের প্রতিফলন। এক প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, “দিলীপবাবু স্পষ্ট করে বার্তা দিয়েছেন রাজ্যের নেতৃত্ব দুর্বল হলে, মাঠে লড়াই টিকবে না।” দলীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দিলীপ ঘোষ আবারও রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরেছেন, এবং তাঁর প্রত্যাবর্তন বিজেপির ভবিষ্যৎ রণকৌশল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

ভবিষ্যতের ইঙ্গিত?

রাজনৈতিক মহল মনে করছে, দিলীপ ঘোষের মন্তব্য শুধুমাত্র তৃণমূলের বিরুদ্ধে নয়, বরং বিজেপির ভেতরের পরিবর্তনের সূচনা। তাঁর জনপ্রিয়তা, সরল বক্তব্য, মাঠে লড়াইয়ের মনোভাব তাঁকে এখনো রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী নেতার আসনে রেখেছে। দিলীপ ঘোষের ভাষায়, “বাংলার মানুষ ভয় পায় না। যারা অন্যায় করছে, তাদের বিরুদ্ধে এবার প্রতিবাদ হবে।”

ছবি : সংগৃহীত 

আরও পড়ুন : SIR, West Bengal SIR | নির্বাচন কমিশন জোরদার হতে বলল | ‘এসআইআর প্রস্তুতি সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন করুন’

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন