পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লি : ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেট লড়াই মানেই আবেগ, ইতিহাস আর বিদ্যুতায়িত পরিবেশ। খেলার রোমাঞ্চ ছাড়াও দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এই ম্যাচগুলোকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা শুধু ক্রিকেট নয়, একটি বৈশ্বিক দর্শনীয় ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এশিয়া কাপ ২০২৫ (Asia Cup 2025) পর্বের উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনাগুলির পর, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই দ্বন্দ্ব কমানোর দাবি উঠেছে।
সবকিছুর সূচনা হয় পাহেলগাঁও হামলা (Pahalgam attack)-এর পর থেকে, যেখানে ২৬ জন ভারতীয় সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারান। ঘটনার পর ভারতীয় দল পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকার করে প্রতিবাদ জানায়। পাকিস্তানি বোলার হারিস রউফ (Haris Rauf) এবং আরও কয়েকজন খেলোয়াড় মাঠে একাধিক প্ররোচনামূলক আচরণ করেন, যা উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়।
এশিয়া কাপের ওই ঘটনার পর ক্রিকেট মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এক প্রশ্ন, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ কি আদৌ চালিয়ে যাওয়া উচিত? অনেকেই বলেন, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই ম্যাচগুলো বাতিল করা হোক, যাতে কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হয়। কিন্তু ক্রিকেট জগতে এই বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (BCCI) এক সিনিয়র কর্মকর্তা দৈনিক জাগরণে (Dainik Jagran) দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেন, “সবাই কথা বলা সহজ, কিন্তু এটা কি বাস্তবে সম্ভব? স্পনসর ও সম্প্রচারকরা কি এতে রাজি হবে?” তিনি আরও যোগ করেন, “আজকের দিনে যদি কোনো বড় দল—শুধু ভারত নয়, টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ায়, তাহলে স্পনসর পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।” অর্থাৎ, ক্রিকেটের অর্থনীতি এবং স্পনসরশিপ চুক্তি এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ বাদ দেওয়ার পথে প্রধান অন্তরায়।
মাইকেল আথারটনের (Michael Atherton) সমালোচনা
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও বিশ্লেষক মাইকেল আথারটন (Michael Atherton) সরাসরি আইসিসি (ICC)-কে আক্রমণ করে বলেন, “ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা হচ্ছে। এক সময় ক্রিকেট ছিল কূটনীতির সেতুবন্ধন, এখন তা পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার মঞ্চে।” তিনি ইঙ্গিত দেন, আইসিসি ও বিভিন্ন ক্রিকেট বোর্ড এই ম্যাচগুলোকে শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকে, যা খেলার মৌলিক চেতনাকে দুর্বল করছে। তবে আথারটনের বক্তব্যে কিছুটা বাস্তবতার ছোঁয়াও রয়েছে—কারণ ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন চুক্তি, সম্প্রচার অধিকার, এবং বিশাল দর্শকসংখ্যা।
এশিয়া কাপ ট্রফি বিতর্ক
এশিয়া কাপ শেষ হওয়ার পরেও আরেকটি বিতর্ক উঠে আসে, ভারত এখনো পর্যন্ত এশিয়া কাপ ট্রফি গ্রহণ করেনি। রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রফিটি এখনও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (ACC) দুবাই সদর দপ্তরে রয়েছে। পাকিস্তানের ক্রীড়া মন্ত্রী এবং পিসিবি চেয়ারম্যান মোহসিন নকভি (Mohsin Naqvi) দাবি করেছেন, তিনি ট্রফিটি হাতে দেবেন কেবল তখনই, যখন ভারতীয় অধিনায়ক সুর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav) নিজে দুবাই গিয়ে সেটি নেবেন। উল্লেখ্য, নকভি এশিয়া কাপ চলাকালে একাধিক বিতর্কিত পোস্ট করেছিলেন, যা ভারতীয় খেলোয়াড় ও ভক্তদের ক্ষোভের কারণ হয়। ভারতীয় বোর্ড সেই কারণেই ট্রফি গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে।
উল্লেখ্য, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ কেবল একটি ক্রিকেট প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, এটি এখন এক রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত। প্রতিটি বল, প্রতিটি রান যেন দুই দেশের জনমতের প্রতিফলন। কিন্তু এর পেছনে যে বিশাল অর্থনৈতিক কাঠামো কাজ করে, তা উপেক্ষা করা কঠিন। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচই আইসিসির মোট বিজ্ঞাপন আয়ের প্রায় ৬০% পর্যন্ত অবদান রেখেছে। শুধুমাত্র একটিমাত্র ম্যাচ থেকেই সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলো শতকোটি টাকার রাজস্ব অর্জন করে। এই প্রেক্ষাপটে, কোনও বোর্ডই এমন আর্থিক সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। বিসিসিআই কর্মকর্তার মন্তব্য সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন, “একটা বড় দল সরে গেলে, পুরো টুর্নামেন্টের আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়বে।”
ক্রিকেটপ্রেমীরা দুইভাগে বিভক্ত। একপক্ষ মনে করে, রাজনীতি ও কূটনীতির বিরোধ মাঠে টেনে আনা উচিত নয়; খেলাধুলা শান্তির বার্তা দেয়। অন্যদিকে, অনেকেই মনে করেন, যখন সীমান্তে রক্ত ঝরছে, তখন খেলোয়াড়দের হাত মেলানো এক প্রকার ভণ্ডামি। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই আইসিসি ও বিসিসিআই-কে ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে। আইসিসির শীর্ষকর্তারা ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা ‘দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের’ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না, তবে আইসিসি টুর্নামেন্টে দলগুলো অংশ নিতে বাধ্য।
ভারত ও পাকিস্তান ২০১২ সালের পর থেকে কোনও দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলেনি। কেবলমাত্র বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এবং এশিয়া কাপ-এর মতো বহুপাক্ষিক টুর্নামেন্টেই তারা মুখোমুখি হয়। তবে এই ম্যাচগুলোই আইসিসির জন্য সোনার ডিম দেওয়া হাঁস। বিশ্বব্যাপী টিআরপি রেকর্ড ভাঙে প্রতিবার, স্পনসররা বাড়তি দর দেয়, আর সামাজিক মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ ম্যাচে চোখ রাখে। এই কারণেই বিসিসিআই কর্মকর্তার মন্তব্যটি শুধু আর্থিক বাস্তবতাই নয়, ক্রিকেট প্রশাসনের কৌশলগত বাধ্যবাধকতাও তুলে ধরে।
এশিয়া কাপের বিতর্ক এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা হয়ত সাময়িকভাবে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে ক্রিকেটের ভাষা শেষ পর্যন্ত খেলারই ভাষা। যতদিন দর্শক, স্পনসর, সম্প্রচারক এবং বোর্ডের আর্থিক স্বার্থ একসূত্রে গাঁথা থাকবে— ততদিন পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের উত্তাপ কমবে না। একজন ভারতীয় বিশ্লেষক বলেন, “যতই রাজনীতি হোক, ভারত-পাক ম্যাচ মানে ক্রিকেটের উৎসব। তা হঠাৎ করে বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়।” উল্লেখ্য, মাঠের ভেতর যতটা সংঘাত, তার চেয়েও বড় লড়াই এখন মাঠের বাইরে, অর্থনীতি, কূটনীতি, এবং জনমতের মিশ্র এক সমীকরণে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India vs Pakistan Women’s World Cup 2025: হরমনপ্রীতদের দাপুটে জয়, পাকিস্তানকে হারাল ৮৮ রানে



