সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ওয়াশিংটন: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) আবারও দাবি করেছেন যে, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত থামিয়ে দিতে তিনি শুল্কনীতি (tariffs) এবং বাণিজ্যচাপ ব্যবহার করেছিলেন। Oval Office-এ সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি বলেন, “শুল্কগুলোর গুরুত্ব খুব বেশি। আমরা শুধু কোটির পর কোটির ডলার আয় করি না, আমরা শান্তির পাহারাদার- শুল্কের মাধ্যমেই”। ট্রাম্প আরও বলেন, “ভারত ও পাকিস্তান একেবারেই যুদ্ধ শুরু করেছিল। সাতটি বিমান গুলি করা হয়েছিল। তারা পারমাণবিক শক্তি। আমি ঠিক কি বলেছি, সেটা বলব না, কিন্তু যা বলেছি, ছিল খুব কার্যকর, তারা থেমে গিয়েছিল। এবং সেটা শুল্ক ও বাণিজ্যভিত্তিক ছিল।” ট্রাম্পের এই দাবির উত্তরে ভারত সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনও তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছিল না। যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে ভারতের দৃষ্টি সর্বদাই ছিল যে, এটি ভারতের এবং পাকিস্তানের ডিরেক্টর জেনারেল মিলিটারী অপারেশনস (DGMO) স্তরের আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে হয়েছে, কোনো বাইরের দেশ তা প্রভাবিত করে লালন করে নি।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পাহেলগাঁও ভয়াবহ আতঙ্কবাদী হামলায় ২৬ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন। এই ঘটনায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছলে ভারত অপারেশন সিঁদুর (Operation Sindoor) শুরু করে ৭ মে, পাকিস্তানে অবস্থিত জঙ্গি গোষ্ঠী নাশক কার্যক্রম ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। চার দিনের উত্তেজনার পর, ১০ মে দুই পক্ষ সরাসরি সেনা-স্তরের যোগাযোগ শুরু করে এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) স্পষ্ট করে বলেছেন, “কোনও বিদেশি নেতা ডিসিশন প্রভাবিত করেনি”। এছাড়া, বিদেশ মন্ত্রক এবং বিভিন্ন সূত্র তা রিপিট করেছেন যে, যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া ছিল শুধুই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার মধ্যবর্তী আলোচনা ও সমঝোতা। তারপরও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘটনাটিকে তার দ্বিতীয় মেয়াদে সাতটি “যুদ্ধ” যে তিনি থামিয়েছেন, তার একটি হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, শুল্ক ও বাণিজ্যিক চাপ দিয়ে তিনি ভারত ও পাকিস্তানকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করেছিলেন। তিনি আরও যোগ করেছেন, “যদি আমি শুল্ক ছুঁড়ে মারার ক্ষমতা না রাখতাম, তখন অন্তত চারটি যুদ্ধ এখনও লেগে থাকত; প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যেত।” উল্লেখ্য, ট্রাম্প এর আগেও একই রকম দাবি করেছেন যে, তিনি থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া, কোসমো-সার্বিয়া, কঙ্গো-রোয়ান্ডা, ইজরায়েল-ইরান, মিশর-ইথিওপিয়া ও আর্মেনিয়া, আজারবাইজানের মতো সঙ্কটকেন্দ্রগুলির উত্তেজনাকে নিরসন করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘শান্তির ভূমিকা’ দাবির প্রতি পাল্টা
আমেরিকার এই দাবি ভারতের তরফে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক সূত্র মনে করেন, ট্রাম্পের দাবি “অতিরঞ্জিত” এবং বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিহীন। ভারত সরকার বহুবার জানিয়েছে, শুল্ক বা বাণিজ্য বিষয়ে আলোচনার কোনও অংশ ছিল না। যুদ্ধবিরতির পেছনে একমাত্র ভূমিকা ছিল মিলিটারী কমান্ড স্তরের সরাসরি যোগাযোগ ও আলোচনার। একই সঙ্গে, আমেরিকার মধ্যস্থতা দাবির প্রেক্ষিতে কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই কিছু ধাপে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছিল, তবে তা প্রধান নয়, এবং যা ছিল নিরপেক্ষ পরিমিত এবং যুদ্ধবিরতির মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ভিডি ভ্যান্স (Vice President J.D. Vance) ও মার্কো রুবিও (Marco Rubio) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্ততা প্রয়াসে ভারত ও পাকিস্তানের সামরিক ও কূটনৈতিক নেতাদের কাছে যোগাযোগ করেছিলেন। তবে ভারতের পক্ষ থেকে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুদ্ধবিরতি হয়েছিল “সরল সেনা-স্তরীয় চ্যানেল ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা”-এর মাধ্যমে, বাইরে থেকে চাপ বা বাধ্যবাধকতা দিয়ে নয়।
কেন ট্রাম্প এই দাবি পুনরায় উত্থাপন করছেন?
রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও খ্যাতি : ট্রাম্প প্রগতি হিসেবে দাবি করেন যে, যুদ্ধ রুখে দেওয়া একটি “শান্তি উদ্যোগ” ছিল তাঁর প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য। এই দাবিগুলো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম।
কূটনৈতিক আভাস ও প্রভাব : বিরোধ উস্কে দিয়ে, ট্রাম্প একটি প্রশ্ন তুলে ধরছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে কি শুধু অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক নিমন্ত্রণ নয়, বৃহত্তর ভূ-কৌশলগত ভূমিকা দিতে হবে?
বিপরীতে প্রতিরোধ গড়ে তোলা : ভারতের কঠোর বিরোধী প্রতিক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও, ট্রাম্প এই দাবি পুনরায় তুলে এনে, তিনি আন্তর্জাতিকভাবে “মিডিয়েটর” বা “শান্তির দালাল” হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে চান।
বাণিজ্য ও শুল্ক নীতি সংক্রান্ত রাজনৈতিক বার্তা : ট্রাম্প এই প্রসঙ্গে বারবার শুল্কের কথাটি উল্লেখ করেছেন, “শুল্ক না থাকলে যুদ্ধ হতো” যা তাঁর প্রণোদনার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিকে আন্তর্জাতিকভাবে সাপেক্ষে যুক্ত করার প্রচেষ্টা।
মূল প্রশ্ন হল, এই ধরনের দাবি ভবিষ্যতে কোন প্রভাব ফেলতে পারে কি না?
-
যদি যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আবারও ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা প্রস্তাব করে, তাহলে ভারত ইতিমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে, এমন ধরনের হস্তক্ষেপ গ্রহণ করবে না।
-
পাকিস্তানের সরকার বা সেনাবাহিনী হয়ত ট্রাম্পের দাবিকে সমর্থন করতে পারে, কারণ এতে তাদের কূটনৈতিক অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে শক্তিশালী দেখানো যায়।
-
তবে সংঘাতের গভীরতর কারণ, বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যু, সীমান্ত প্রভাব, স্থানীয় সন্ত্রাসবাদ নেটওয়ার্ক, এগুলো কোনও সাধারণ দাবিই পুরোপুরি মেটাতে পারবে না।
সামগ্রিকভাবে, ট্রাম্পের এই দাবি রাজনৈতিক অভিনয় এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চিত্রের একটি অংশ হলেও, বাস্তবে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার দায়িত্ব ছিল ভারত ও পাকিস্তানের নিজেদের হাতে।
ছবি : প্রতীকী



