সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পাটনা : বিহারের রাজনীতি ফের গরম। রাজ্যজুড়ে উত্তেজনা, কারণ সোমবার (৬ অক্টোবর, ২০২৫) বিকেল ৪টায় নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India) ঘোষণা করবে বহুল প্রতীক্ষিত বিহার বিধানসভা নির্বাচনের (Bihar Assembly Election 2025) নির্ঘন্ট। সূত্রের খবর, এবার আগের মতো বহু পর্বে নয়, কম সংখ্যক পর্যায়ে নির্বাচন হতে পারে। ২৪৩ আসনবিশিষ্ট বিহার বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২২ নভেম্বর।

নির্বাচনের আগে থেকেই বিহারের রাজনীতিতে উত্তেজনা তুঙ্গে। রবিবার রাতে আরজেডি (RJD) নেতা তেজস্বী যাদবের (Tejashwi Yadav) বাসভবনে বৈঠকে বসেন ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA bloc) -এর জোটসঙ্গীরা। প্রায় রাত পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে ঠিক হয়, আসন ভাগাভাগির ফর্মুলা (Seat-sharing formula) আগামী দু’দিনের মধ্যেই ঘোষণা করা হবে। সূত্রের মতে, জোটের প্রধান লক্ষ্য এনডিএ (NDA) -এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রচার চালানো।
ভোটার তালিকা ‘শুদ্ধ’ করল নির্বাচন কমিশন
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (CEC Gyanesh Kumar) জানান, বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (Special Intensive Revision – SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২২ বছর পর ‘পরিষ্কার’ করা হয়েছে বিহারের ভোটার তালিকা। তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিটি ২৪৩টি কেন্দ্রে একজন ইআরও (Electoral Registration Officer) এবং তাঁদের সহায়তায় ৯০,২০৭ জন বিইএলও (BLO) কাজ করেছেন। এতে ভোটার তালিকা এখন আগের চেয়ে অনেক নির্ভুল হয়েছে।”
বিজেপিতে পবন সিংয়ের (Pawan Singh) প্রত্যাবর্তন: ভোটের আগে কাস্ট কার্ডের খেলা
বিহার নির্বাচনের আগে বিজেপি (BJP) বড় দাও খেলেছে। জনপ্রিয় ভোজপুরি (Bhojpuri) গায়ক-অভিনেতা পবন সিং (Pawan Singh) আবার ফিরেছেন দলে। বছর দেড়েক আগে তাঁর বিতর্কিত গানের কারণে বিজেপি তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) এবং দলের নেতা উপেন্দ্র কুশওহা (Upendra Kushwaha) -এর উপস্থিতিতে বিজেপিতে ফিরে এলেন পবন সিং। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, আরাহ (Arrah) আসন থেকে তাঁকে প্রার্থী করা হতে পারে।
পবন সিংয়ের প্রত্যাবর্তন বিজেপির জন্য শুধু সাংস্কৃতিক নয়, কৌশলগতও। তিনি ভোজপুর জেলার বারহারা (Barhara) এলাকার মানুষ। তাঁর প্রভাব শাহাবাদ (Shahabad) অঞ্চলে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়, যেখানে চারটি জেলা, যথাক্রমে ভোজপুর, বক্সার (Buxar), ক্যামুর (Kaimur) এবং রোহতাস (Rohtas) মিলিয়ে মোট ২২টি বিধানসভা আসন রয়েছে। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে এই অঞ্চলেই বিজেপি কার্যত ভরাডুবি করেছিল। এবার তাঁকে ফেরিয়ে এনে দল চেষ্টা করছে ভোটের সমীকরণ নতুন করে সাজাতে।
বিজেপির কাস্ট সমীকরণ ও কুশওহা ফ্যাক্টর
উপেন্দ্র কুশওহা (Upendra Kushwaha) দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির মুখ্য মিত্র। ২০২৪ সালে নির্বাচনী পরাজয়ের পর তিনি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন, দলের ভেতর থেকেই নাশকতা হয়েছে। এবার পবন সিংয়ের সঙ্গে তাঁর মঞ্চে আসা রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে পুরনো অভিমান ভুলে নতুন ঐক্য। দলের এক নেতা বলেন, “কুশওহার পরাজয়ের জন্য দায়ী ছিল পবন সিংয়ের প্রার্থী হওয়া ও দলের নীরবতা। এবার তাঁদের একসঙ্গে দেখা, বিশেষ করে শাহাবাদ অঞ্চলে, বিজেপির জন্য বড় বার্তা।” দলীয় মহলের মতে, রাজপুত (Rajput)-কুশওহা (Kushwaha) জোট মাগধ (Magadh) অঞ্চলেরও ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে, যেখানে অরঙ্গাবাদ (Aurangabad), রফিগঞ্জ (Rafiganj), ওবরা (Obra) ও নবীনগর (Nabinagar) -এই চারটি আসন রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে কুশওহারা সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন (CPI (M-L) Liberation) -এর ভোটার, এবং ২০২৪ সালেও তাঁরা মহাগঠবন্ধনের সঙ্গেই ছিলেন। তাই বিজেপির কাছে এই জোট বড় কৌশলগত পদক্ষেপ।

অন্যদিকে, পবন সিং ১৯৯৭ সালে তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘ও ধনিয়াওয়ালি’ (O Dhaniyawali) -এর মাধ্যমে গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর জনপ্রিয় গান ‘লাগাবেলু লিপস্টিক’ (Lagabelu Lipstick) এখনও ভোজপুরি শ্রোতাদের কাছে হিট। ‘রংগলি চুনরিয়া তোহরে নাম’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘সত্য’ এবং ‘ক্র্যাক ফাইটার’ ছবিতে তিনি অভিনয় করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে তাঁর জনসভায় বিপুল ভিড় জমেছিল। বিজেপি এই জনপ্রিয়তাকে ভোটের মূল শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। আরজেডি মুখপাত্র সুবোধ কুমার মেহতা (Subodh Kumar Mehta) বলেন, “উপেন্দ্র কুশওহা ২০২০ সালের পর থেকে বাস্তবের মাটিতে নেই। বিজেপির এই সব চমক দিয়ে কোনও লাভ হবে না। আমরা লোকসভায় ভাল ফল করেছি, বিধানসভাতেও করব।”
অন্যদিকে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের (CPI (M-L) Liberation) রাজ্য সম্পাদক কুনাল (Kunal) কটাক্ষ করে বলেন, “উপেন্দ্র কুশওহা ও পবন সিংয়ের আলিঙ্গন যেন ‘ধৃতরাষ্ট্র-ভীম’ (Dhritarashtra-Bheema) -এর মতো। শাহাবাদ অঞ্চলে পবন সিং বেড়ে উঠলে কুশওহার কী লাভ হবে?” তিনি আরও বলেন, “আমরা ২০২৪-এ আরাহ ও কারাকাট (Karakat) দুই লোকসভা আসনে জয়লাভ করেছি, এবং ২০২০-এও ১২টি আসনে ভাল ফল করেছি।”
নির্বাচন-পূর্ব জোটের অঙ্ক ও বিহারের ভবিষ্যৎ
বিহার নির্বাচন সবসময়ই কাস্ট পলিটিক্সের মঞ্চ। বিজেপি পবন সিং ও কুশওহাকে সামনে এনে রাজপুত-কুশওহা সমীকরণে বাজি ধরেছে। অন্যদিকে, মহাগঠবন্ধন (Mahagathbandhan) জোট চাইছে মুসলিম-ইয়াদব-দলিত ভোটব্যাংককে ধরে রাখতে। এদিকে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে এক ত্রিমুখী লড়াই। এনডিএ বনাম ইন্ডিয়া বনাম সিপিআই (এম-এল)। কাস্ট, কারিশমা ও কৌশল এই তিনের লড়াই নির্ধারণ করবে বিহারের ভবিষ্যৎ।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Pinarayi Vijayan | সুপ্রিম কোর্টে অভূতপূর্ব ঘটনা ও কেরালা সিএম পিনারাই বিজয়নের বিরুদ্ধে মামলা খারিজ




