সম্পাদকীয়
শরতের গন্ধে লক্ষ্মী ও বিজয়ার আভাস মনকে উদ্যোলিত করে।শরতের আকাশটা যেন এক আশ্চর্য ও অলৌকিক চাদরে মোড়া। সাদা তুলোর মতো মেঘ। উজ্জ্বল নীলের গামছায় ঝুলে থাকে ধানক্ষেতের গন্ধ। মাঠের আল বেয়ে ঝুলে পড়ে ধানশীষ। ঘাস ও ধানের পাতায় পাতায় দুলে ওঠে শিশির দানা। একটা ছমছমে ভাব। রাস্তা ঘাট চুপচাপ হয়ে ওঠে। পুজো পেরিয়ে এই সময়টা এক অদ্ভুত শান্তি আর নস্টালজিয়ায় ভরা। নীরব মন। কিছু একটা হারিয়ে ফেলে। এই সময় অনুভব হয়, না গ্রীষ্মের উত্তাপ, না বর্ষার ধূসর বরং যেন এক সোনালি আলোয় ভাসা বিকেল। নদীর ধারে হাঁটলে কাশফুলের ফাঁকে হাওয়া এসে মনে করিয়ে দেয়, উৎসব এখনও শেষ হয়নি। শারদোৎসব মানেই কেবল শুধুই দুর্গাপুজোর উন্মাদনা নয়। দুর্গাপুজোর পরেই ধীরে ধীরে এসে পড়ে লক্ষ্মীপুজো। আর তার সঙ্গে বিজয়ার আবহ। এই সময়টা বাংলার গ্রামেগঞ্জে যেন নতুন করে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ধানক্ষেতগুলোতে তখন দুলছে সোনালি শীষ। বাতাসে ধানগাছের গন্ধ। নদীর ধার ঘেঁষে হালকা কুয়াশা জমতে শুরু করে সন্ধ্যাবেলা। এমন সময়েই পূর্ণিমার চাঁদ মাথায় তুলে আসে লক্ষ্মীপুজোর রাত। প্রকৃতির সাজ লক্ষ্মীপুজো ঠিক যেন শরতের ধ্যানমগ্ন পূর্ণিমা। দুর্গাপুজোর হৈচৈ পেরিয়ে প্রকৃতি একটু থেমে যায়। নিঃশব্দ হয়ে আসে। গাছে গাছে সোনালী পাতা ঝরে পড়ে। হালকা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যায়। পুকুরের জলে শালুক পদ্মফুলের ছায়া দুলে ওঠে। মাটির ঘরে ঘরে তখন ধোয়া ধোয়া গন্ধ। কেউ নারকেল দিয়ে নাড়ু মুড়কি বানাচ্ছে। কেউ ধূপের ধোঁয়ায় সাজাচ্ছে আঙিনা। সন্ধ্যাবেলায় বাড়ির উঠোনে আঁকা আলপনা আর প্রদীপের আলো যেন মাটির গন্ধের সঙ্গে মিশে যায়। গ্রামে গ্রামে কৃষকেরা ধান কাটার কল্পনা শুরু করবে মনে মনে। কাস্তে হাতে মাঠে নামা কৃষক যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক হয়ে যায়। তাদের মুখে আনন্দ কারণ লক্ষ্মীপুজো মানে ধানের দেবীর আগমন, মানে মাঠে ফসল ফলার আশীর্বাদ। লক্ষ্মীপুজো ঐতিহ্য ও অনুভব। লক্ষ্মীপুজোর দিনটা গ্রাম বাংলায় আজও একেবারে আলাদা। সন্ধ্যাবেলা নারকেলপাতা ও কলাপাতায় ঘর সাজানো হয়। মাটির প্রদীপে আলো জ্বলে। আর গৃহিণীরা আঙিনায় সাদা চালের গুঁড়ো দিয়ে আঁকেন সুন্দর আলপনা। আলপনার মধ্যে মাঝখানে থাকে পদ্মফুল, চারপাশে শঙ্খ, চাঁদ, লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। দেখে মনে হয় এ যেন দেবী লক্ষ্মীর আগমনপথ তৈরি। এই দিনে নিরামিষ আহার। কেউ মাংস খায় না। ঘরে ঘরে ভোগ রান্না হয় খিচুড়ি,পায়েশ, মিষ্টি। পূজার সময় পুরোহিত মন্ত্রপাঠ করেন, পরিবারের সবাই প্রণাম জানায় ধনের দেবীকে।

শহরেও আজকাল সেই ঐতিহ্যকে নতুন আঙ্গিকে সাজানো হয় ফ্ল্যাটের বারান্দায় বা ছাদে। ছোট করে প্রদীপ জ্বেলে, ফুল আর আলপনায় মন ভরে। বিজয়া বিদায় আর বন্ধনের সময় লক্ষ্মীপুজোর পরপরই আসে বিজয়া দশমীর স্মৃতি। যদিও দেবীর বিদায় হয়ে গেছে। কিন্তু, বিজয়ার আসল রস আসতে থাকে পুজো শেষে। এই সময়টা যেন এক মিশ্র আবেগ আনন্দ, বিদায়বেদনা, আর গভীর সামাজিক বন্ধন। বিজয়া মানে কেবল ‘শুভ বিজয়া’ বলে প্রণাম নয়! এটা এক আত্মিক মিলনের সময়। প্রতিবেশীরা একে অপরের বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে যান। পায়েস বা নারকেল নাড়ু দিয়ে অতিথিকে আপ্যায়ন করেন। বড়রা ছোটদের আশীর্বাদ করেন। ছোটরা প্রণাম করে। শহরের ব্যস্ত জীবনেও এই ছোট্ট ‘বিজয়া সাক্ষাৎ’ আজও সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখে।শরতের এই সময়টায় প্রকৃতি যেমন ধীরে ধীরে বদলে যায় আকাশে নীলের গভীরতা বাড়ে। বাতাসে হালকা শীতের আভাস আসে। ঠিক তেমনি মানুষের মনেও আসে পরিবর্তনের সুর। পুজোর উন্মাদনা পেরিয়ে এক শান্ত, আত্মমগ্ন আবহ তৈরি হয়।আধুনিক সময়ের প্রেক্ষাপট নজর করলে দেখা যায় আজকের শহুরে জীবনে অনেক কিছু বদলে গেছে। পাড়ার প্যান্ডেল কমে গেছে। অনেকেই বাইরে চলে যান ছুটিতে। ঐতিহ্য যেন ধীরে ধীরে শহরের প্রান্তে সরে যাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্য! প্রকৃতি ঠিকই নিজের সময়মতো আসে চাঁদ উঠে। কাশফুল দোলে। ধানের গন্ধ ভেসে আসে। এই প্রকৃতিই যেন প্রতি বছর মনে করিয়ে দেয় উৎসব আসলে আমাদের ভেতরের একটি অনুভব। যা সময়কে ছুঁয়ে যায়।
আমাদের সমাজে যে সমস্ত শিশু শহরের ফ্ল্যাটে খেলে দুলে। মায়েদের আলপনা আঁকা দেখে। সে-ও জানে লক্ষ্মীপুজোর রাত মানেই কিছুটা নরম আলো। মিষ্টির গন্ধ আর পরিবারের হাসি। বিজয়ার মিষ্টি মুখে আজও থাকে একই স্নেহ, যা এক সময় ঠাকুমা নিজের হাতে বানাতেন। শরতের এই সময়, লক্ষ্মীপুজো আর বিজয়ার মেলবন্ধন আসলে এক জীবনচক্রের প্রতীক। দুর্গাপুজো মানে উল্লাস ও শক্তির উদযাপন, লক্ষ্মীপুজো মানে ধন ও সমৃদ্ধির আহ্বান, আর বিজয়া মানে সম্পর্কের পুনর্নবীকরণ। প্রকৃতি এই সময়টায় যেমন বদলে যায়। আমাদের মনও তেমনি বদলায় ব্যস্ততার শহরেও একটু থেমে যাই। নিঃশব্দে দেখি চাঁদ। শুনি পাড়ার ধূপের গন্ধে মিশে থাকা প্রার্থনার সুর। এই সময়টাই বাঙালির হৃদয়ে প্রতি বছর এক নতুন রঙে ফিরে আসে।🍁
🍂মহামিলনের কথা
যে নাম করে সে অসাধ্য সাধন করতে পারে। তবে আধার ভেদে কার্য্যের ভেদ হয়। নামকে ধরে থাকার ফলে সাধকের দেহকোষ নষ্ট হয়ে যায়। দোষ নাশের সঙ্গে সঙ্গে শক্তির বিকাশ হতে থাকে। নামের কৃপাতে সাধক সিদ্ধ হন—- সাধকের শক্তিতে নয়।
একজন দরিদ্র ব্রাহ্মণ ছিলেন। সংসারে দারুণ কষ্ট। প্রাণপণে অর্থের চেষ্টা করে অকৃতকার্য্য হয়ে মরণের জন্য যখন প্রস্তুত হয়েছেন এমন সময় একজন সিদ্ধপুরুষের দর্শন পেয়ে তাঁকে নিজের দুঃখের কথা জানালে সিদ্ধপুরুষ বললেন—- “আমি তোমার দুঃখ দূর করে দিব, তুমি কাল সকালে এস।” ব্রাহ্মণ সকালে তাঁর নিকট উপস্থিত হলে তিনি তাঁর চাদরে একটি মোড়ক স্বহস্তে বেঁধে দিয়ে বললেন—- “তুমি এই চাদর কাঁধে ফেললেই ইচ্ছামত অন্তরীক্ষে গমন করতে পারবে, জলে স্থলে তোমার অবাধ গতি হবে, তার দ্বারাই তোমার অভাব দূর হয়ে যাবে। কিন্তু সাবধান, কোনদিন এই মোড়কটি খুলো না।” ব্রাহ্মণ অপ্রত্যাশিতভাবে এই সিদ্ধিলাভ করে সেই মহাপুরুষকে প্রণাম করত গৃহে ফিরে এল।

অনন্তর তিনি আকাশমার্গে গমনাগমন করাতে লোকে দেখলো ইনি মহা সিদ্ধপুরুষ। তখন অনেকে তাঁকে আশ্রয় করলো। অর্থাভাব ঘুচে গেল—- তিনি অবস্থাপন্ন হলেন। কতদিন এইভাবে কেটে গেল। সহস্র সহস্র লোক তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে আপনাকে কৃতার্থ মনে করতে লাগলো। একদিন ব্রাহ্মণের ইচ্ছা হল ‘মোড়কে কি বাঁধা আছে খুলে দেখি। মোড়ক খুলে দেখলেন একখন্ড ভূর্জপত্রে আলতা দিয়ে লেখা আছে “রাম”। ব্রাহ্মণ ভাবলেন ও হরি এই “রাম” ভূর্জপত্রে আলতা দিয়ে লিখলে মানুষ জলে স্থলে অন্তরীক্ষে চলতে পারে তা তো জানতাম না। তখন সেই জীর্ণ ভূর্জপত্রে লেখা “রাম” নাম ত্যাগ করে, ভাল ভূর্জপত্রে বড় বড় করে রাম নাম লিখে চাদরে বেঁধে যেমন নদীতে চলতে গেছেন—- ব্যস অমনি ডুবে গেলেন—- উপরে ওঠবার আর শক্তি রইল না। লোকে তাঁকে আর উপর দিয়ে যেতে দেখতে পায় না। ‘এ কি হলো, এ কি হলো’, একটা রব উঠলো।
ব্রাহ্মণ সেই সিদ্ধপুরুষের কাছে গিয়ে জানালেন—- ‘কই আমি তো আর উর্দ্ধে উঠতে পারছি না!’
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—- ‘তুমি কি মোড়ক খুলেছিলে?’
ব্রাহ্মণ বললেন—- হ্যাঁ, একদিন খুলে দেখি একখন্ড ভূর্জপত্রে আলতা দিয়ে “রাম” লেখা রয়েছে। আমি সেই পুরানো ভূর্জপত্র ফেলে দিয়ে নূতন ভূর্জপত্রে আরও ভাল করে বড় বড় অক্ষরে “রাম” লিখে চাদরে বেঁধে রেখেছি, কিন্তু আমি আর উপরে উঠতে পারছি না।
সিদ্ধপুরুষ বললেন—- ‘তোমায় নিষেধ করেছিলাম তথাপি খুলে নিজের দুর্গতিকে বরণ করে নিলে। সেই ভূর্জপত্রে শুধু “রাম” নাম লেখা ছিল না, আমার সারাজীবনের সাধনায় যে রামনামে সিদ্ধ হয়েছিলাম সেই রামনাম তোমাকে উপরে নিয়ে যেতেন। তোমার লেখা রামনামে তা হবে কেন? যাও—- তুমি নিজের অদৃষ্টের ফল ভোগ করগে।” ব্রাহ্মণ দুঃখিত অন্তঃকরণে গৃহে ফিরে গেলেন।
🍁শ্রীশ্রীঠাকুরের উপদেশমূলক গল্প | সূত্র : আনন্দমানন্দকরম, সংকলক : কিঙ্কর শরণানন্দজী
🍁ধারাবাহিক উপন্যাস
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
পর্ব ২ :
পুনর্জন্মের আলো
প্রতিদিনের মতোই টেবিলের ওপর খাবার সাজানো থাকে যথাযথ, পরিপাটি, একদম যেন জীবনের অনুশাসনের প্রতিচ্ছবি। ধোঁয়া ওঠা স্যুপ, সবজির ঝোল, মাছের টুকরো সব কিছু ঠিকঠাক, কোনও অতিরিক্ততা নেই। কিন্তু আজকের দুপুরে, সোমদত্তার চামচ ধরা হাতটা থেমে যায় মাঝপথে। এক মুহূর্তের জন্য, খাবারের বাটির দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়, এই যে খাওয়া, এই যে জীবনের নিয়ম মেনে গলা পর্যন্ত ঠেলে তোলা প্রতিটি গ্রাস, এর পেছনে আসলে কী আছে?
সোমদত্তা চুপ করে তাকিয়ে থাকে। জানে, এমন উত্তরগুলো খোলা জানালার মতো দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। তারপর আস্তে করে বলে, ‘শোন, আমি তো তোকে ছোট থেকে বড় করেছি। তোর শরীরের প্রতিটি বদল, তোর মুখের অভিব্যক্তি, সব আমি চিনে ফেলি। কিছু লুকাচ্ছিস?’
তার ছেলেটা পাশে বসে আছে, চুপচাপ। ঠিক যেমন প্রতিদিন থাকে একটা নির্ধারিত দূরত্বে, একটা নির্ধারিত শব্দহীনতায়। তারা মুখোমুখি, অথচ কত দূরের। সোমদত্তা জানে, ছেলেটা খাচ্ছে শুধু খাওয়ার জন্য, কথা বলছে না কারণ বলার মতো কিছু নেই, অথবা বললেও বুঝবে কে?
সে হঠাৎ করে নিজের দিকে তাকায়,তার চোখ, তার মুখের রেখা, তার এই বসে থাকা চুপচাপ শরীরটাও যেন কারও অভিনীত ভূমিকা। মা, স্ত্রী, মানুষ এই তিনটি পরিচয়ের চাপে সে নিজেকে কোথায় হারিয়ে ফেলেছে কে জানে!
সে ভাবে, কতদিন হয়ে গেল, কারও মুখ চেয়ে হাসেনি। মানে, সত্যিকারের হাসি, যে হাসিতে বুক হালকা হয়ে যায়, চোখে জল চলে আসে, এমন হাসি। এখন যা হাসে, তা যেন ঠোঁটের চামড়ায় আটকে থাকা কৃত্রিম কিছু। এমনকী আজ খাবারের টেবিলেও, সে নিজের মুখে যে কিছুমাত্র ভাব ফুটিয়ে তোলে, তা নিছক এক অভ্যস্ত অনুশীলন। যেন বলছে, ‘আমি ঠিক আছি। জীবনও ঠিকঠাক চলছে।’
কিন্তু সত্যিই কি চলছে?
সে ছেলেকে দেখে। তার খাওয়ার ভঙ্গি এত নিখুঁত, যেন কোনও রোবট। সোমদত্তার মনে হয়, এই ছেলেটিকে সে জন্ম দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাকে বোঝার ভাষাটা কি আদৌ শিখেছে কখনও? না কি সে শুধু বড় করার কাজটাই করেছে, মানুষ করার নয়? তখনই ছেলেটা মুখ তোলে। বলে,
‘আজ মাংসটা একটু কম ঝাল হয়েছে, তাই না?’
সাধারণ একটা কথা। কিন্তু সেই কথার ভেতর একটা নরম আর্তি ছিল, একটি ক্ষীণ আকাঙ্ক্ষা। যেন সে বলছে, ‘মা, একটু কথা বলো তো আমার সঙ্গে।’
সে মুখ তুলে হাসে। জোর করে। উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ, হয়ত আজ একটু কম লঙ্কা পড়েছে।’
কথোপকথন সেখানেই থেমে যায়। আবার নীরবতা নেমে আসে টেবিলজুড়ে। কিন্তু সেই নীরবতা এবার কেমন আলাদা। এক ধরনের ভারী স্ফটিক নীরবতা। যেখানে শব্দ নেই, কিন্তু অনুভব আছে।
সোমদত্তা ভাবে, তার মা-হওয়া কি শুধুই প্রতিদিন তিনবেলা রান্না, ছেলের জন্য জামা গুছিয়ে রাখা, সময়মতো ওষুধ খাওয়ানো? নাকি আরও কিছু থাকার কথা ছিল! যেমন, একসঙ্গে বসে গল্প করা, তার ছেলের চোখে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখা, অথবা এমন এক মুহূর্ত যখন ছেলে হঠাৎ বলে ওঠে, “মা, তোমাকে ভালবাসি।’
কিন্তু সে জানে, সেইসব মুহূর্ত এখন গল্পের মতো। হয়ত আসবেই না। অথবা এসেছে, সে বোঝেনি।
তার মন বলে, এই টেবিলে তারা দুজন শুধু খাচ্ছে না, একে অপরের ভেতরে জমে থাকা নীরবতা গিলছে। প্রতিটি চামচে তারা গিলছে এমন সব প্রশ্ন, যাদের উত্তর জানা নেই কারও।
সোমদত্তা হঠাৎ করে বলে ওঠে, ‘কাল রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম।’
ছেলে চমকে তাকায়, যেন তার মা হঠাৎ করে অন্যরকম কিছু বলেছে, ‘কী দেখলে?’
সে হাসে, এবার একটু সত্যিকারের। বলে, ‘ভালুক ধাওয়া করছিল। আমি দৌড়াচ্ছি আর চিৎকার করছি, কিন্তু কেউ শুনছে না।’
ছেলে হাসে, অমলিন ঠোঁট তার মৃদু সুবাস ছড়িয়ে দেয়। সেই হাসিটা যেন একটা ক্ষণিক বাতাসের মতো ঘরটায় ছড়িয়ে পড়ে।
সোমদত্তা ভাবতে থাকে, হয়ত এইরকমই মুহূর্তের জন্য আমরা বাঁচি। প্রতিদিনের নির্দিষ্টতা, রুটিন, তিক্ততা সব পেরিয়ে হঠাৎ কিছু ক্ষণিক আন্তরিকতা। যেখানে খাবারের টেবিল কেবল খাওয়ার জায়গা নয়, একটা হৃদয়ের যোগাযোগস্থল হয়ে ওঠে। সে নিজেকে বলে, আজকের মতো এতটুকুই যথেষ্ট। হয়ত এই একফোঁটা হাসি থেকেই নতুন দিনের শুরু হবে।
ঘরের কোণে ঝিম ধরা বাতিটা কাঁপা আলো ছড়ায়। দেওয়ালে যেন ছায়ারাও হাঁপাচ্ছে। সে জানে এই নীরবতা, এই আলো-আঁধারির ভেতর লুকিয়ে থাকে প্রশ্নগুলো, যেগুলো উচ্চারিত হয় না, অথচ প্রতিনিয়ত উপস্থিত থাকে।
সে ছেলেকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তুই কি ভাল আছিস?’
ছেলে একটু থামে, চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বলে, ‘ভল তো। কেন?’
‘না মানে, তোর মুখটা কেমন যেন লাগছে আজ। চোখের নিচে কালি পড়েছে, ঠিকমতো ঘুমাস না নাকি?’
ছেলে হালকা হেসে মাথা নাড়ে। ‘না, ঠিক আছি। পড়াশোনার চাপ একটু বেশি।’
সোমদত্তা চুপ করে তাকিয়ে থাকে। জানে, এমন উত্তরগুলো খোলা জানালার মতো দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। তারপর আস্তে করে বলে, ‘শোন, আমি তো তোকে ছোট থেকে বড় করেছি। তোর শরীরের প্রতিটি বদল, তোর মুখের অভিব্যক্তি, সব আমি চিনে ফেলি। কিছু লুকাচ্ছিস?’
ছেলে এবার কিছুক্ষণ চুপ থাকে। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠে এসে তাদের মধ্যকার নীরবতাকে আচ্ছন্ন করে।
‘মা…’ ছেলে অবশেষে বলে ওঠে, ‘আমার একটা প্রশ্ন আছে। জানি, এটা শোনার জন্য তুমি প্রস্তুত না… কিন্তু না জেনে থাকতে পারছি না।’
সোমদত্তার বুকের ভেতর কাঁপুনি উঠে। শিরায় শিরায় যেন স্নায়ু জেগে ওঠে। সেই অচেনা, আশঙ্কাময় প্রশ্নটা কি এবার উচ্চারিত হতে যাচ্ছে?
সে ধীরে বলে, ‘বল, তোর যা বলার।’
ছেলে চোখ নামিয়ে বলে, ‘আমার জন্ম কীভাবে হয়েছে সেটা জানি। বইয়ে পড়ে, ক্লাসে শিখে… কিন্তু আমি জানতে চাই—আমার জন্ম কেন হয়েছিল?’
সোমদত্তা স্তব্ধ। তার কানে যেন শাঁ শাঁ শব্দ। পৃথিবীর সব শব্দ এক মুহূর্তে থেমে গিয়েছে।
‘মানে?’ সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে।
‘মানে… আমি কি চাওয়া সন্তান ছিলাম? না কি দুর্ঘটনা?’
এই প্রশ্নটা এতদিন তার গোপন কুঠুরিতে বন্দী ছিল। আজ সে দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে, তীব্র এক সত্যের ঝাঁঝ নিয়ে। সে উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরায়। বাইরে সন্ধ্যার ছায়া ঘন হচ্ছে। গাছের পাতায় বাতাস খেলছে। সে ভাবে, সত্য বলবে, নাকি সেই পুরনো গল্পটাই শুনিয়ে দেবে,ভালবাসা, স্বপ্ন, আগলে রাখা ভবিষ্যতের কথা? কিন্তু তার ভেতরের মা কাঁপা গলায় বলে ওঠে, ‘তুই জানতে চাস?’
ছেলে মাথা নাড়ে। “হ্যাঁ, সত্যটা। সবকিছু জানার আগে আমি যেন অন্ধকারে ছিলাম। কিন্তু আজ আর অজানায় থেকে পারছি না। আমি জানতে চাই, তুমি আমায় সত্যিই চেয়েছিলে কি না।’
সোমদত্তা চুপ করে। অতীতের ঝাঁপ খুলে গন্ধ এসে পড়ে ঘরে, আত্মসমর্পণের, ভয়ের, এবং অমার্জিত ভালবাসার গন্ধ।
সে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করে, ‘তোর বাবা আর আমি তখনো ঠিক সংসারী হয়ে উঠিনি। আমরা একসঙ্গে থাকতাম, কিন্তু তার ভেতর একটা ফাঁক ছিল সবসময়। ওর কাছে প্রেম মানে ছিল শরীর, আমার কাছে ছিল ছায়ার মতো ঘন কিছু, যা দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।’
‘তুই এলি হঠাৎ করে। আমি বুঝতেই পারিনি প্রথম দিকে। যখন জানলাম, আমি গর্ভবতী, আমি ভয় পেয়েছিলাম, তোর বাবাকে বলেছিলাম। ও তখন বলেছিল, ‘এটা যদি সমস্যা হয়, আমরা মিটিয়ে ফেলব।’ মানে, তোর অস্তিত্ব তখন ওর কাছে ছিল ‘মিটিয়ে ফেলার মতো’ একটা বিষয়।’
ছেলের চোখ বড় হয়ে যায়। ঠোঁট কেঁপে ওঠে। কিন্তু সে কিছু বলে না।
সোমদত্তা গভীর নিঃশ্বাস নেয়।
‘আমি ওর কথা শুনিনি। তোর প্রথম ধুকপুক শুনে আমার মনে হয়েছিল, এই পৃথিবীতে কেউ একজন আমায় নিঃশর্তভাবে চায়। তখনও তুই এক বিন্দু রক্ত, এক কণা প্রাণ। কিন্তু জানিস? আমি প্রথমবার হাসপাতালে আল্ট্রাসাউন্ডে তোর ছবি দেখে কেঁদে ফেলেছিলাম।’
ছেলে ফিসফিস করে বলে, ‘’তুমি কি কখনও… আফসোস করো?’
সোমদত্তা চোখ বন্ধ করে বলে, ‘না। কখনও না। হ্যাঁ, জীবন সহজ ছিল না। আমি চাকরি করেছি, তোকে স্কুলে দিয়েছি, ঘুম ছাড়িয়ে রাত জেগে তোকে গল্প শুনিয়েছি। কিন্তু তোকে পাওয়ার পর আমি বুঝেছি, ভালবাসা মানে শুধু কারও জন্য কাঁদা না, কারও জন্য সমস্ত জীবন লড়াই করাও।’
‘তুই আমার ভয় ছিলি, আবার তুই-ই আমার সাহস। তোর জন্ম হয়ত পরিকল্পিত ছিল না, কিন্তু তুই আমার জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত ভালবাসা।”
ছেলে এবার উঠে এসে মায়ের পাশে বসে। তার চোখে জল। সে বলে, ‘তাহলে তো আমি শুধু গর্ভ থেকে না, তোমার হৃদয় থেকেও জন্ম নিয়েছি, তাই না মা?’
সোমদত্তা হেসে মাথায় হাত রাখে। ‘তুই আমার হৃদয়, তুই আমার সমস্ত চাওয়া। তুই জানিস না, তোর হাসিই আমার দিন শুরু করার প্রার্থনা।’
ছেলে তার কাঁধে মাথা রাখে। ঘরের বাতিটা আরও কোমল হয়ে আসে। রাত নেমে আসে যেন দু’জনকে জড়িয়ে।
সোমদত্তা মনে মনে ভাবে, সব সত্য সবসময় না জানলেও চলত। কিন্তু আজ এই সত্যটা বলার পর সে হালকা লাগছে। যেন বুকের মধ্যে জমে থাকা শত বছরের এক বোঝা নেমে গিয়েছে। আর সে ভাবে, মা হওয়ার মানে শুধু জন্ম দেওয়া নয়, বরং প্রতিদিন নতুন করে সেই সম্পর্ককে সত্য করে তোলা। এবং সে তা করেছে, নিজের সমস্ত ভালবাসা দিয়ে।
রাত অনেক গভীর। জানালার বাইরে হিমেল হাওয়া বইছে। দূরে কোনও কুকুরের ডাক শোনা যায়, যেন নিস্তব্ধতার শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। ঘরের কোণে বসে সোমদত্তা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। তার চোখে আজ দীর্ঘ বছরের ক্লান্তি, আবার আশ্চর্য এক প্রশান্তিও।
ছেলে মুখ তুলে তাকায়, তার চোখে একরাশ প্রশ্ন, আর সেই প্রশ্নে অনুরণিত হয় অনন্ত দিনের না বলা কথাগুলো।
‘মা, আমি কখনও বুঝতে পারিনি… তুমি এতটা একা ছিলে।’
সে হেসে ফেলে। সে হাসি বিষাদের, কিন্তু আত্মবিশ্বাসে পূর্ণ। ‘একাকীত্ব মানে তো সবসময় খারাপ কিছু না, রে। মাঝে মাঝে সেই একাকীত্বই নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জায়গা। তোর জন্মের পর থেকে আমি একা নই। তুই ছিলি, আছিস, থাকবি।’
ছেলে কিছু বলতে চায়, কিন্তু থেমে যায়। তারপর ধীরে বলে, ‘আমি কী তোমার জীবনটাকে আটকে দিয়েছি? তু্মি কি নিজের জন্য কিছু করতে পারলে না আমার জন্য?’
সোমদত্তা এবার চোখ সরিয়ে নেয়। বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ। তারপর বলে, ‘এই প্রশ্নটা বহুবার নিজের কাছেই করেছি জানিস? তোকে খাওয়ানোর জন্য, স্কুলে পাঠানোর জন্য, তোর জ্বর হলে রাত জেগে বসে থাকার জন্য… আমি অনেক কিছু ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস কর, তুই যদি না হতিস, তাহলে এই সব কিছু করেই বা কী করতাম? আমার জীবন তো তবু ফাঁকাই থাকত।’
ছেলে এক হাতে মায়ের হাত ধরে। বলে, ‘তোমার কোনো স্বপ্ন ছিল না, মা?’
সোমদত্তা চোখ বন্ধ করে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ‘ছিল, খুব ছিল। আমি গান গাইতাম, কলেজে সবাই বলত আমার কণ্ঠটা অসাধারণ। ইচ্ছা ছিল সংগীত নিয়েই কিছু করব। রেডিওতে গাইব, মঞ্চে উঠব, মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে গান শোনাব। কিন্তু…’
সে থেমে যায়। ছেলে বলে, ‘কিন্তু?’
‘কিন্তু তখন তো একসময় ভাবলাম, গান করে সংসার চলে না। আর তুই এলি আমার জীবনে, তখন তো গান নয়, দুধ-ডিম, বই-খাতা এইগুলোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।’
ছেলে মাথা নিচু করে ফেলে। ‘আমি চাই না তু্মি আমার জন্য নিজেকে বিসর্জন দাও মা। আজও যদি কিছু করতে চাও, আমি আছি তোমার পাশে।’
সোমদত্তা তার দিকে তাকায়। ‘তুই জানিস, এই কথাটার জন্যই আমি সব সহ্য করেছি এত বছর। জানতাম, কোনও একদিন তুই আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলবি, ‘আমি আছি’। তুই সেই সন্তান, যে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’
ছেলে চুপচাপ মায়ের কোলের কাছে বসে থাকে। বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালায় টুপটাপ শব্দ।
‘তুমি কি বাবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখো মা?’ হঠাৎ প্রশ্ন ছুড়ে দেয় ছেলে।
সোমদত্তা হাসে, তবু সেই হাসিতে একধরনের ফাটল আছে। ‘না রে, অনেক বছর ধরে কথা হয়নি। সে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আমিও তো আর খুঁজে বের করিনি। জানিস, আমি একসময় ভেবেছিলাম, ও হয়ত ফিরে আসবে। তোর হাত ধরে বলবে, ‘চল, আবার একসঙ্গে পথ চলি।’ কিন্তু সে আর হয়নি।’
ছেলে বলে, ‘তুমি কি ওকে এখনও ভালবাসো?’
সোমদত্তা চমকে তাকায় ছেলের দিকে। তারপর ধীরে মাথা নাড়ে। “ভালবাসা… জানি না সেটা ছিল কি না। হয়ত ছিল, হয়ত ছিল না। হয়ত একটা অভ্যাস ছিল। কিন্তু তোকে পাওয়ার পর আমি বুঝেছিলাম, ভালবাসা মানে একটা রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, বরং একটা দায়িত্ব, একরাশ সাহস, একফোঁটা চোখের জল, একটা হাসির তৃপ্তি। তুই-ই তো আমার ভালবাসা।’
ছেলের চোখে জল আসে। সে বলে, ‘আমি তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করতে চাই মা। আবার গাইবে? আমি স্টুডিওতে নিয়ে যাব তোমাকে। আমি জানি তোমার কণ্ঠ এখনও মধুর। তু্মি আবার শুরু কর মা, আমি আছি।’
সোমদত্তা মুচকি হাসে। ‘তুই যদি পাশে থাকিস, তাহলে আবার শুরু করতেই পারি। এখন তো সময় আমার, না?’
ছেলে মাথা নাড়ে। ‘এইবার সময় শুধু তোমার, মা।’
ঘরের বাতিটা টিমটিম করে জ্বলে থাকে। রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়। কিন্তু মা আর ছেলের মাঝে আলো ছড়িয়ে পড়ে—ভালবাসার, স্বীকৃতির, এবং একটুখানি পুনর্জন্মের আলো।🍁 (চলবে)
🍂কবিতা
সুনীতি মুখোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা
ভাবনা বদল
বাস্তবতার অঙ্ক- কষা মানুষেরা
ওঁকে নির্দ্ধিধায় পাগল ভাবতে পারে।
সামনে- পাশে প্রতিপক্ষ- না-থাকা
লুডো খেলতে-খেলতে হারিয়ে দিয়ে
এক মুখ হাসি, বে-হিসাবি হাততালি,
জেতার আনন্দ দু-চোখের তারায়,
হাততালির শব্দে জব্দ নিঃসাড় একাকিত্ব।
কে যেন প্রয়োজন- ছোঁয়া কিছু বলবে বলে
চৌ-কাঠ পার,
প্রতিপক্ষ- না-থাকা সাপ-লুডোয়
সব থেকে বড় মইটায় উঠতে পারার আনন্দে
লাফিয়ে- ওঠা মানুষটাকে দরকারি- কথা- বলা
ফালতু ভেবে থমকে যেতে
পাগল – ভাবা মানুষটার দেরি হয় না।
চেষ্টিত সংযত গাম্ভীর্য মেখে বলেন, ‘এই যে,…
এস… এস…কিছু বলবে?’
হিসাবের অঙ্ক-কষা মানুষটা তখন আর এক পাগল।।
সুনির্মল চক্রবর্তী -এর কবিতাগুচ্ছ

কলেজ স্কোয়ারের বিকেল
কলেজ স্কোয়ারের বিকেলে হালকা আলো
হাতে ধরা পুরনো বই, কফির কাপে হাওয়া।
তোমার চোখে ঢেউ খেলে, ট্রামের মতো ধীর…
আমার বুকের রাস্তায় তখনও তীব্র নীরব শঙ্খধ্বনি।
নন্দনের ধারে ধারে ধোঁয়া উড়ে যায়
সিগারেটের ছাইয়ে লেগে থাকে অমলিন প্রতীক্ষা…
তুমি চলে গেলে, গিয়েছ গন্ধ
কলেজ স্কোয়ারে যেন এখনও বসে আছ, তাই না?
সকাল
শিউলির গন্ধে ভরে যায় ভোর
ঝরা ফুলে পা ফেলে শিশিরে ভিজি।
পৃথিবীর এই সহজ সকাল
আমাকে শেখায় নীরব প্রার্থনার ভাষা।
পাতার ফাঁকে রোদের রেখা…
সময় যেন স্থির হয়ে যায় ক্ষণে।
জীবন, তুমিও তো শিউলির মতো,
ফুটে, ঝরে, রেখে যাও গন্ধ…
অবাক শহরের ছেলেরা
অবাক শহরের ছেলেরা আজও
পোড়া রাস্তায় লিখে চলে চুপচাপ স্লোগান।
ভাঙা দেওয়ালে টাঙানো ভবিষ্যৎ
যেন পুরনো সিনেমার পোস্টারের মতো ফ্যাকাশে।
কিন্তু, তাদের চোখে আগুন জ্বলে
টুকরো ভোরের খোঁজে রাত কাটায়।
এই শহর জানে না
চুপ করে থাকা ছেলেরা একদিন ইতিহাস লেখে।
তোমার চিঠি
তোমার লেখা একটি চিঠি আজও
ড্রয়ারের কোণে হলুদ হয়ে আছে।
সেই কাগজে লেগে আছে গন্ধ
তোমার, আমাদের, না বলা কথার।
রাতে জানালায় হাওয়া লাগে
চিঠির পাতা উল্টে যায় একা
তোমার নামটা পড়ে গেলে- মনে হয়
সময় থেমে গিয়েছিল ঠিক ওই একই জায়গায়!
নদীর মতো
নদী বয়ে যায় নিজের পথে
কখনও ধীর, কখনও উত্তাল…
তাকে কেউ শেখায় না পথ সে জানে সমুদ্র ঠিকানা
আমিও এক নদী
পাহাড় থেকে নেমে আসা ক্লান্ত স্বপ্ন…
জীবনের পাথরে আঘাত খেয়ে
শেষমেশ মিশে যাব বিশালত্বে।
বিকাশ সরকার -এর একটি কবিতা

আবাদ
দুপুরের রোদে তেতে তুমি একাকী কোথায় যাও
বাতাসে কি জলের স্পর্শ? সোঁদা গন্ধ পাচ্ছো আজ বনে?
এই যে এক আলপথ ধরে, তুমি তো আবাদি জমিন
চারাগাছ বলো কবে উঠেছিল খুব সংগোপনে
যাও, আমি তো এক খড়ের গাদায় পোড়া মাটির মানুষ
জলাজঙ্গলে থাকি, আমার শরীরে কত পাঁক
তোমারও তো কষ্ট ছিল জানি, ফুলে ওঠা ঠোঁট
এখন, এতদিন পর, সেসব শোকের কথা তবে থাক
আবাদে আনন্দ ছিল, রোমাঞ্চ ছিল কত দীর্ঘ আলিঙ্গনে
এখন তেতে ওঠা রোদের ভিতর শুধু বাজে দীর্ঘশ্বাস
আমি একা বসে থাকি রোপিত চারার মতো কাত হয়ে
ফলন হলো না, জমিজুড়ে জেগে ওঠে আদিগন্ত ঘাস
তৈমুর খান -এর একটি কবিতা

বিপর্যয়
হ্রদের নীচে পড়ে আছে বিপর্যয়
আমি সেই দহ থেকে উঠে আসি
নিজেকে বিভ্রান্ত মনে হলে
উন্মাদ হয়ে যায় এই পোষ্যভূমি
অরণ্যের মাথা ছুঁয়ে নামে নিসর্গের হাত
চাঁদ তখনও আলোর বিম্ব
জ্যোৎস্নায় মিশে যায় খাদ
রঙিন বালক মাছগুলি
তখনও স্বপ্নে দ্যাখে মাছরাঙা
নিঃশব্দে পেরিয়ে যায় স্বপ্নের চৌকাঠ
আজ কি বাদল আসে ঘোর তমসায়?
অথবা জীবিত ও মৃতদের পাড়ায়
কোনও সোনালি পালক?
প্রপাত ভাসিয়ে দেয় প্রভাতের তীর
রতিকে তরণি দেয় অসহ্য জলাশয়।
পৃথা রায় চৌধুরী -এর একটি কবিতা

ধূসর চিহ্ন ছুঁয়ে
নদীর আলসেয় দাঁড়ালে দূরান্ত থেকে উড়ে আসে
মতি বাইজীর প্রাচীন মসলিন দোপাট্টা।
ঠমকে গমকে ঝিরঝিরে রাস্তাঘাটে মেলা থাকে পছন্দের মেয়েডানা
চিঠি চিঠি চিরকুটে ওড়ে খাঁচা ভাঙ্গা গান
হালকা সুতীবুনোট বিকেল ভরে থাকে দালান-কোঠার
পেঁয়াজ রসুন আমিষ গন্ধে।
সারেঙ্গী থেকে একতারায় পৌঁছোবার বেলায়
রাঙা বাউল মোরাম পেরোতে
আঁকা থাকে শরীরী ভাঁজ… নিষিদ্ধ।
নির্জন ভৈরবী ঠুমরী দ্বীপের বালিকা বসে গায়
“বাবুল মোরা নৈহার ছুটহি যায়…”
বৈদূর্য্য সরকার -এর একটি কবিতা

নেকড়ে জন্ম
দলের সবার আগে বৃদ্ধ ও অশক্ত সদস্যেরা
তারপর সব থেকে লড়াকু ও শক্তিমান অংশ,
এরপর বাচ্চা-কাচ্চাদের দল মায়েদের সাথে
তাদের পেছনে যোদ্ধাদের শক্তসামর্থ্য বাহিনী…
সবার শেষে একাকী দলপতি প্রখর নজরে।
প্রথমদিকে অভিজ্ঞদের গতিতে চলে সবাই
পরের অংশ হঠাৎ বিপদে পড়লে তাদের বাঁচায়,
তরুণরা তারপরে থেকে নিশ্চিত করে আগামী
তাদের রক্ষা করতে একদল যোদ্ধা শশব্যস্ত…
সবাইকে দেখে রাখা দলপতি একটু তফাতে।
কারোর নাম থাকে না, থাকে শুধু জীবনের বীজ
সেটা বাঁচাতে সারাজীবন ঝক্কি পোহানো সবার
নিষ্ঠুর নেকড়েরা দলের কাউকে কামড়ায় না…
এই সংগঠন মানুষের মগজে ঢোকে না বলে
মানুষ আঁধারে আঁচড়ায় শ্বাপদের জিঘাংসায়!
পরাণ মাঝি -এর একটি কবিতা

নগ্ন নির্জনে একা একা
নিজেকে বেঁধে রাখি
অনেক ডাকাডাকি করে ভেতরের পাখি
ও পটলচেরা চোখে রাখতে পারি না চোখ অণুতে অণুতে
নগ্ন নির্জনে একা একা মুখোমুখি হই আরশির আদলে তোমার রুপান্তরে
ভাবি ওই বুঝি এল সে মনোজাতিকা
ছায়া স্থির হলে ফিরে যেতে বড় ইচ্ছে করে ওই মন-মানসী পানসীতে দুদণ্ড বসে সমুদ্রের নীলে ডুবে যাই
বিজয়া ঘোষ -এর একটি কবিতা

চাঁদ
ফুটপাতের উপর বসে আছে এক টুকরো চাঁদ
ভাঙা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ধরা পড়ে তার মুখ
রাতের কলকাতা তখনও ব্যস্ত
কেউ দেখে না সেই নিঃশব্দ আলো
রিকশার চাকায় ঘুরছে সময়
হকারের চোখে ক্লান্ত আগুন
চাঁদটা চুপ করে তাকিয়ে থাকে আকাশে
যেন বলে,
উঠে এসো, পথিক, আলো তো এখানেও আছে।
🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস
সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।
কিশাণগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায়
১৮.
ডাক্তার-এর কান্না তার সহ্য হল না। ওই শ্বেতপাথরের দেবী মূর্তি এই প্রথম নিজের হাতে ডাক্তারের দুই কাঁধে হাত রেখে নিজেই চমকাল। একটু আগে যেমন নিজের পেছনে ডাক্তারের হাতের আঙুলের প্রথম ছোঁয়ায় কেঁপে উঠেছিল শরীর। তেমনি ডাক্তারও কাঁপল এবার। সে মুখ নিচু করে কান্না লুকোচ্ছিল। চানুমতি তার চিবুকে হাত দিয়ে ঠেলে তুলে নিজের ভীত হরিণের চোখের উপরে তার চোখ রাখাল।
মালবাবু বুঝি ফিরে এসেছে। এবার ঘরে ডাক্তারকে দেখে আঁশ বটির এক কোঁপে ধর থেকে মাথা খুলে নেবে।ঘরে টাকা-পয়সার আমদানি আর নানা লোকজন আসে বলে মালবাবু রেলের মোটা দরজা খোদোল করে নিজের মিস্ত্রি দিয়ে আই হোল বসিয়েছিল।
ডাক্তারের চোখের ভেতর কান্না কুলকুল করছে দেখে চানুমতি মাথা ঠিক রাখতে পারল না আর। কান্না তো বাপ-মা-ভাই-বোন দেশ-গাঁ ছেড়ে থাকা চানুমতির নিজের সম্পদ, তা কেন ডাক্তারের চোখে উঁকি দেবে! চানুমতি ডক্তারকে তার নগ্ন, নরম কেঁপে থাকা শরীর দিয়ে জড়িয়ে ধরল। ডাক্তারের দু’টি হাতও তখন সতেরো বছর ধরে জমে থাকা ভালবাসা জানিয়ে দিতে চানুমতীর নগ্ন পিঠের উপরে আকুলতায় উসখুস।
দু’দিক থেকে টনটনে টান গন্নাকাটা বাইয়ের। টাকার মতো ভালোবাসার জিনিস তার কাছে দু’টি নেই। বনবিহারী খবর পেয়েছেন ভোরের দার্জিলিং মেল-এ মালবাবু ছেলের কাছে যাচ্ছেন। ক’য়েকদিন কালিম্পং-এ থাকবেন। অফিস থেকে পাঁচ দিনের আর্নড লিভ নিয়েছেন মালবাবু।
বনবিহারী জানেন সুযোগ নিতে হয় এক্কেবারে প্রথমে। কখন মাঝ পথে ফিরে আসে মালবাবু তা বলা যায় না। কালিম্পং-এর দাজুকে দেওয়া কথা রাখার একটা সুযোগ যখন এসে গেছে ঝট করে নিয়ে নিতে হবে। আজই নিজের ইনোভা টয়োটা নিজে ড্রাইভ করে কালিম্পং পৌঁছাবে। কিন্তু মালবাবুর অবর্তমানে তার বাড়িতে যাওয়া ঠিক হবে না। যদি কোনো ভাবে কোয়াটারের কেউ দেখে ফেলে, আর মালবাবুকে বলে দেয় তো এতদিনের চেষ্টায় মালবাবুর কাছাকাছি আসা, সব কেঁচে যাবে! গন্নাকাটা বাই হল সেফ দূত। ক অক্ষর গোমাংস। তাকে দিয়ে এর আগেও
অনেক কগাজপত্র বনবিহারী মালবাবুকে পাঠিয়েছেন। ফলে গন্নাকাটা বাই-এর আঁচলের খুঁটে বাঁধা পড়েছে বনবিহারী বাবুর চিঠি আর পাঁচশ টাকার নোট।
***
নোট ফেলুদাও দিয়েছেন। ওই পাঁচশ টাকাই। ফেলুদা বলেছে্ন, মালবাবুকে নিয়ে কালিম্পং যাচ্ছেন গন্নাকাটা বাই যেন একটু দেখেশুনে রাখে। চার-পাঁচদিনের তো ধাক্কা। একা থাকবে চানুমতি!
দরজায় লোহার কড়ার খটখট শব্দ শুনে চানুমতির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মালবাবু বুঝি ফিরে এসেছে। এবার ঘরে ডাক্তারকে দেখে আঁশ বটির এক কোঁপে ধর থেকে মাথা খুলে নেবে।
ঘরে টাকা-পয়সার আমদানি আর নানা লোকজন আসে বলে মালবাবু রেলের মোটা দরজা খোদোল করে নিজের মিস্ত্রি দিয়ে আই হোল বসিয়েছিল। চানুমতি খুব তাড়াতাড়ি শাড়ি-ব্লাউজ পড়ে দরজায় এসে আই হোলে চোখ রেখে এক বুক স্বস্তির শ্বাস নিয়ে দরজা খোলে। আর দরজা আগলে দাঁড়ায়, যাতে ঝপ করে গন্নাকাটা বাই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়তে না পারে। বলল, ‘ক্যা সমাচার?’
‘মাইজী সো রহা হ্যায় ক্যায়া?’
‘নহিঁ! মৈ নহিঁ সোয়া! নাহানা মে গিয়া। চান ঘরে সবে গায়ে জল ঢালতে যাচ্ছিলাম। তখন তোমার খটখট। এর পর পুজোপাট আছে তো। আজ মঙ্গলবার। হনুমানজীর পুজো আছে। হনুমান চল্লিশা পড়তে হবে। দেখত দেরি হয়ে গেল।’
একনাগাড়ে অনেকটা বলে ভেতর থেকে ভয়টা ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছে চানুমতি। এখনও বুক ধড়ফড় করছে। একটু শান্ত হয়ে বলে, ‘তুম ক্যা চাহ্তে হো। কোই বাত নহীঁ। বাতাও। তা তুমি কি বলবে বল।’
দরজার দু’দিকে হাত দিয়ে রাখা। বুক একটু যে ঢিবঢিব করছে না, তা নয়। বাইয়ের চোখে যদি ডাক্তার পড়ে যায়, তো কথা নেই আটখানা করে সে পাড়ার বৌ-ঝিদের কানে তুলে দেবে।
‘অ্যায়সা খাস কুছ্ নহীঁ হ্যায়। মালবাবুকা দোস্ত বনবাবু ইয়ে খত ভেজা মালবাবুকে লিয়ে।’ বলতে বলতে বাই আঁচলের খুঁট খুলে চিঠি তুলে দেয় চানুমতির হাতে। তারপর চলে যায়।
‘ঠিক। সানডে মে আনা না ভুলো! বাথরুম মে ঝাড়ু লাগানা হ্যায়।’ চানুমতি বাইয়ের দেওয়া চিঠি নিজের আঁচলে বেঁধে দরজা বন্ধ করে ফিরে এসে দেখে ডাক্তার জামা প্যান্ট পরে নিয়েছে। এমনকী স্টেথস্কোপ্টাও কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছে। যাতে বোঝা যায় সে পেশেন্টকে দেখতে এসেছে। ডাক্তার আদিত্য বিদায় নেবার সময় চানুমতির ঠোঁটে এবার চুমু খেল, তাতে ভালবাসার আশ্লেষ। চানুমতির তৃষিত ঠোঁটের উপর ডাক্তার তার ঠোঁটের পূর্ণ সমর্থন রাখল। ঘরের বাইরে পা রাখার আগে ডাক্তার হ্রস্ব স্বরে বলে, ‘তোমাকে এই নরক থেকেউদ্ধার করবই চানু। তুমি ভেবো না।’ 🍁 (চলবে)

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : মহামিলনের কথা বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।





