সোমনাথ আচার্য ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : দুর্গাপুজো শেষ হতেই বাঙালিরা যে উৎসবের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন, সেটি হল ধন-সম্পদের দেবী মহালক্ষ্মীর আরাধনা। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় এই পুজো, যা পরিচিত “কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো” (Kojagari Lakshmi Puja) নামে। বিজয়া দশমীর আবেগ শেষ না হতেই বাঙালির ঘরে ঘরে সাজতে শুরু করে আলপনা, ধান-দূর্বা ও পদ্মফুলের আয়োজন। কিন্তু এ বছর এক বিশেষ বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, পূর্ণিমা তিথি দুই দিনে বিস্তৃত থাকায় অনেকেই প্রশ্ন করছেন, ২০২৫ সালে লক্ষ্মীপুজো আসলে কবে? ৬ অক্টোবর নাকি ৭ অক্টোবর? জ্যোতিষশাস্ত্র ও পঞ্জিকা অনুযায়ী এই প্রশ্নের উত্তর এবার স্পষ্ট।
২০২৫ সালের কোজাগরী পূর্ণিমা তিথি শুরু হবে ৬ অক্টোবর সকাল ১১টা ২৪ মিনিটে এবং শেষ হবে ৭ অক্টোবর সকাল ৯টা ৩৩ মিনিটে। শাস্ত্রমতে, পূর্ণিমা তিথি যদি রাতে বেশি সময় ধরে থাকে, তবে সেই রাতেই পূজা করা হয়। তাই এ বছর ৬ অক্টোবর, সোমবার,ই হবে মহালক্ষ্মীর পূজার শ্রেষ্ঠ দিন। সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিট থেকে রাত ১১টার মধ্যে পূজার শুভ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। পঞ্জিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “পূর্ণিমা তিথির মূল মাহাত্ম্য থাকে নিশীথে। তাই ৬ অক্টোবর রাতেই কোজাগরী ব্রত পালিত হবে।” অন্যদিকে, কোজাগরী শব্দের উৎসও বেশ আকর্ষণীয়। সংস্কৃত শব্দ “Ko Jagrati?” অর্থাৎ “কে জেগে আছো?” এই প্রশ্ন থেকেই এর নামকরণ। বিশ্বাস করা হয়, এই রাতে দেবী লক্ষ্মী স্বর্গ থেকে নেমে আসেন এবং মানুষের ঘরে ঘরে ঘুরে দেখেন কারা তাঁর আরাধনায় জেগে আছেন। যারা এই রাতে জেগে থেকে উপাসনা করেন, তাঁদের ঘরে ধন-সম্পদের অভাব হয় না। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ছাড়াও দেশের নানা প্রান্তে এই রাতে মহিলারা লক্ষ্মী মন্ত্র জপ করেন, ধানের আঁটি, চাল, কলা ও নারকেল দিয়ে আরাধনা করেন। পুরাণকথা অনুযায়ী, কোজাগরী পূর্ণিমা শুধুমাত্র লক্ষ্মীপূজা নয়, দেবী ও বিষ্ণুর মিলনের প্রতীকও বটে। এই রাতে চাঁদের আলোয় ভিজে ওঠা পৃথিবীকে স্বয়ং দেবী লক্ষ্মী তাঁর কৃপায় ভরিয়ে দেন। এজন্যই বাংলার প্রত্যেক পরিবারে পূর্ণিমার এই রাত বিশেষ ভক্তিভরে পালিত হয়।
গ্রামের দিকে এখনও এই পুজোর আলাদা আবহ আছে। সন্ধ্যা নামলেই বাড়ির উঠোনে আঁকা হয় অতি যত্নে আলপনা, কলসীতে জলে ভরা হয়, আর ধূপ-ধুনোর গন্ধে ভরে ওঠে চারদিক। শহরে যদিও পুজো এখন ব্যস্ত জীবনের কারণে কিছুটা সহজ হয়ে এসেছে, কিন্তু আচারবিধি ও ভক্তি কমেনি একফোঁটাও। এক ভক্ত জানিয়েছেন, “কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দেবীকে ডাকতে ডাকতে আমরা সারারাত জেগে থাকি। বিশ্বাস করি, মা যদি আমাদের ঘরে প্রবেশ করেন, তাহলে সংসারে সুখ-শান্তি বজায় থাকবে।”

এ বছর পুজো সোমবার পড়ায় আরও শুভ মনে করছেন অনেকেই। সোমবার আবার ভগবান শিবের দিন। শাস্ত্রকারদের মতে, শিব-লক্ষ্মীর একসঙ্গে পূজা হলে সংসারে শান্তি ও সমৃদ্ধি দ্বিগুণ হয়। তাই ৬ অক্টোবরের রাত বাঙালির কাছে শুধু পূর্ণিমা নয়, এক মহামুহূর্ত হয়ে উঠবে। তবে একাংশ ৭ অক্টোবরকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ পূর্ণিমা তিথি সেই দিন সকাল পর্যন্ত রয়েছে। অনেক পুরোহিত তাই বলছেন, “যাঁরা চান, তাঁরা ৭ অক্টোবর ভোরবেলা সহজ আচারবিধিতে দেবীর পুজো সম্পন্ন করতে পারেন।” যদিও প্রচলিত নিয়ম মেনে মূল পুজো ৬ অক্টোবর রাতেই অনুষ্ঠিত হবে।
কোজাগরী পূর্ণিমা আবার বাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। শরতের মাঠ তখন ধান শীষে ভরে উঠছে। কৃষক সমাজ বিশ্বাস করেন, লক্ষ্মীর কৃপায়ই ধানের শস্য ভালো হয়। তাই তাঁরা ধানের আঁটি দিয়ে লক্ষ্মী আরাধনা করেন, যাতে বছরের অন্নভাণ্ডার পূর্ণ থাকে। প্রসঙ্গত, আজকের দিনে শহুরে ছন্দে হয়তো কৃষি নির্ভরতা নেই, কিন্তু কোজাগরীর মাহাত্ম্য অটুট। ব্যাংক থেকে অফিস, শিল্প থেকে ব্যবসা, সব ক্ষেত্রেই আর্থিক সমৃদ্ধি কামনায় মানুষ দেবীকে আহ্বান জানান। পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলোয় দেবীকে ভক্তিভরে প্রণাম করার যে আবহ বাংলার সংস্কৃতিতে তৈরি হয়েছে, তা যুগে যুগে অপরিবর্তিত থেকেছে। তাই বিভ্রান্তি কাটিয়ে এবার নিশ্চিত হওয়া গেল, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো (Kojagari Lakshmi Puja 2025) অনুষ্ঠিত হবে সোমবার, ৬ অক্টোবর। সেই রাতেই বাংলার প্রতিটি ঘর দেবীর আলোয় আলোকিত হবে, ভক্তিমন্ত্রে মুখরিত হবে চারপাশ। বিজয়ার আবেগ মিলিয়ে গিয়ে নতুন করে শুরু হবে সমৃদ্ধি আর শান্তির প্রার্থনা।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : Mahalaya 2026, Durga Puja Dates | দুর্গাপুজো ২০২৬: কবে মহালয়া, কবে ষষ্ঠী থেকে দশমী : দেখে নিন আগামী বছরের নির্ঘণ্ট



