সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রাত পোহালেই মহালয়া (Mahalaya)। বাঙালির মনে ভোর ৪টের এই বিশেষ মুহূর্ত শুধু দিনপঞ্জির একটি তারিখ নয়, তা এক গভীর আবেগ। সারাবছর যে দিনটির জন্য অপেক্ষা থাকে, সেটি হল মহালয়া। এদিন দেবীপক্ষের সূচনা। পিতৃপক্ষের সমাপ্তি। এই দিন ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে আকাশবাণী কলকাতা (Akashvani Kolkata) সম্প্রচার করে কালজয়ী ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ (Mahishasura Mardini)। আর সেই সুরে, সেই কণ্ঠে বাঙালি খুঁজে পায় এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ ও শিহরণ।
আবার, মহালয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র -এর (Birendra Krishna Bhadra) কণ্ঠ। তাঁর সুমধুর উচ্চারণে দেবীর আবাহনের স্তোত্র আজও অমর। “মহিষাসুরমর্দিনী” মানেই যেন ভদ্রবাবুর কণ্ঠে পৌরাণিক গাথার জীবন্ত রূপায়ণ। তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সংস্কৃতির অমূল্য প্রতীক। প্রতি বছরই এই দিনে তাঁর অমর কণ্ঠই শোনার জন্য ভোরে রেডিওর পাশে বসে থাকেন অসংখ্য শ্রোতা। অনেকেই বলেন, “ভদ্রবাবুর কণ্ঠ ছাড়া মহালয়া কল্পনা করা যায় না।” উল্লেখ্য, আকাশবাণীতে এবারের মহালয়ার সম্প্রচার হয়। কারণ, এবারএ শোনা যায় ১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক রেকর্ডিং। অর্থাৎ, ভোর ৪টায় বাযে সেই দুষ্প্রাপ্য অডিও রেকর্ড, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় মহিষাসুরমর্দিনীর ভাষ্য ও স্তোত্রপাঠ। প্রায় দেড় ঘণ্টার এই রেকর্ডিং আবারও নিয়ে যাবে বাঙালিকে সময়ের পেছনে, সেই দিনগুলিতে, যখন পরিবার একসঙ্গে বসে রেডিওয় শুনত দেবী আবাহনের আদি বাণী।
প্রসঙ্গত, এই মহিষাসুরমর্দিনী মূলত বাণীকুমার রচিত চিত্রকাব্য। এর সুরারোপ করেছিলেন কিংবদন্তী সংগীতকার পঙ্কজকুমার মল্লিক (Pankaj Kumar Mallick)। আর সেই সুরে ভদ্রবাবুর কণ্ঠ যোগ হয়ে একে পরিণত করেছে এক কালজয়ী ঐতিহ্যে। দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুরের বিনাশের এই পৌরাণিক কাহিনি শুধু ভক্তিমূলক গান বা স্তোত্র নয়, এটি হয়ে উঠেছে বাংলার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ।
নতুন প্রজন্মের অনেকেই টেলিভিশনে মহিষাসুরমর্দিনী দেখতে অভ্যস্ত। তবে এখনও অগণিত মানুষ মনে করেন, টেলিভিশনের চেয়ে রেডিওতে মহিষাসুরমর্দিনী শোনার আনন্দই অন্যরকম। রেডিওর শব্দের সঙ্গে মিশে থাকে স্মৃতির আবেশ, থাকে শৈশবের মহালয়ার সকাল, থাকে পূর্বপুরুষদের ছোঁয়া। অনেকেই জানান, “টিভির দৃশ্যপট যতই আধুনিক হোক, রেডিওর ভোর ৪টার ধ্বনি আজও হৃদয়ে অন্য মাত্রা জাগায়।” আবার, মহালয়ার মাহাত্ম্য কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। এই দিন দেবীপক্ষের সূচনা। সনাতন শাস্ত্রমতে, মহালয়ার দিন শেষ হয় পিতৃপক্ষ, শুরু হয় দেবীপক্ষ। এই দিন থেকেই শুরু হয় দেবীর আবাহন। মর্ত্যলোক ভরে ওঠে উৎসবের আবেশে, ধীরে ধীরে সাজতে থাকে প্যান্ডেল, প্রতিমা, আর ভরে ওঠে বাতাস ঢাকের আওয়াজে। ফুল-ফল-আলোয় রেঙে ওঠে চারপাশ।
এক শ্রোতার কথায়, “শৈশব থেকে অভ্যস্ত, ভোররাতে উঠেই রেডিও অন করা। বাইরে অন্ধকার, জানালার কাঁচে শিশির, আর ঘরের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠ, এটাই মহালয়া।” ঠিক সেই আবেগকেই নতুন করে ছুঁতে চলেছে এ বছরের মহালয়া।তাই বলা যায়, ভোর ৪টাতে গোটা বাংলা আবারও সময়কে পিছিয়ে নিয়ে যায় সেই সোনালি দিনে। রেডিও চালু হতেই ঘরে ঘরে বাজল দেবী দুর্গার আরাধনা, ভদ্রবাবুর কালজয়ী কণ্ঠ। ভোরবেলা চায়ের ধোঁয়া, শিউলি ফুলের গন্ধ আর আকাশবাণীর সুর মিলিয়ে মহালয়া হয়ে ওঠে স্মৃতি, ভক্তি আর আবেগের এক অদ্বিতীয় সংমিশ্রণ।
ছবি: প্রতীকী




